আমরা দুভাই লুঙি-পাঞ্জাবি পারলাম। মাথায় দিলাম গোল বেতের টুপি। রওনা হলাম সর্ষিনা। যেতে হবে নৌকায়। পথ মোটেই নিরাপদ না। মিলিটারির গানবোট চলাচল করছে। আতঙ্কে অস্থির হয়ে যাত্ৰা। এই নৌকা ভ্ৰমণ মনে হচ্ছে কোনোদিন শেষ হবে না। ইঞ্জিনের বিজবিজ শব্দ হতেই অতি দ্রুত নৌকা কোনো খাড়িতে ঢুকিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। মাঝে মাঝে মাওলানা সাহেব বলেন, বাবারা ডাইনে তাকাবা না। আমরা ডাইনে তাকাই না, কারণ তখন ডানে গলিত মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে।
সর্ষিনার পীর সাহেবের আস্তানা চমৎকার। জায়গাটা নদীর তীরে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। মাদ্রাসার ছাত্রদের থাকার জন্যে বিশাল হোস্টেল। পাড়া গা মতো জায়গায় বিরাট কর্মযজ্ঞ। আর হবে নাই বা কেন! পাকিস্তানের সব রাষ্ট্রপ্রধানই এখানে এসেছেন। কিছু সময় কাটিয়েছেন।
আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে সর্ষিনা পৌঁছলাম বিকেলে। মাদ্রাসার ছাত্ররা দুধে রুটি ছিঁড়ে চিনি মাখিয়ে খেতে দিল। গপগপ করে খেলাম। তাদের যে মিলিটারিরা কিছুই বলছে না–এ জন্যে তাদের মধ্যে আনন্দ ও উল্লাসের সীমা নেই। তাদের কাছেই জানলাম, পিরোজপুরের সঙ্গে সর্ষিনার পীর সাহেবের সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে। ক্যাপ্টেন সাহেব দিনের মধ্যে তিন-চার বার টেলিফোন করেন। অপারেশনে যাবার আগে পীর সাহেবের দোয়া নিয়ে যান। আমরা দুভাই মাদ্রাসায় ভর্তি হতে এসেছি শুনে তারা যথেষ্ট আনন্দ প্ৰকাশ করল। আমরা আমাদের পরিচয় প্ৰকাশ করলাম না।
সঙ্গের মাওলানা সাহেব সন্ধ্যার আগে আগে আমাদের দুজনকে পীর সাহেবের কাছে উপস্থিত করলেন। পীর সাহেব চারদিকে কিছু লোকজন নিয়ে গল্প করছেন। কাছে যাওয়ার সাহস হলো না। শুনলাম, মৌলানা পীর সাহেবকে নিচু গলায় কিছু বলছেন এবং পীর সাহেব রেগে যাচ্ছেন। সব কথা বুঝতে পারছি না। পীর সাহেব বেশিরভাগ কথার জবাবই দিচ্ছেন; উর্দুতে। আমার বাবার প্রসঙ্গে কী কথা যেন বলা হলো; পীর সাহেব বললেন, আমি এই লোকের কথা জানি। বিরাট দেশোদ্রোহী। ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাও যাও, তুমি চলে যাও।
মাওলানা সাহেব আরো নিচু গলায় সম্ভবত আমাদের দুভাই সম্পর্কে কিছু বললেন। পীর সাহেব ভয়ঙ্কর রেগে বললেন–না, না। এদের কেন এখানে এনেছ?
মাওলানা সাহেব আমাদের নিয়ে ফিরে চললেন। কী কথাবার্তা তার হয়েছে। তিনি কিছুই ভেঙে বললেন না। নৌকায় করে ফিরছি এবং প্রার্থনা করছি খুব তাড়াতাড়ি যেন চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। অন্ধকারে মিলিটারিরা গানবোট নিয়ে বের হয় না। খোলা নৌকার পাটাতনে বসে আছি। ভরা জোয়ার, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ মাঝি বলল, দেহেন দেহেন। তোকালাম। দুটি মৃতদেহ ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে; এমন কোনো দৃশ্য নয় যে অবাক বিস্ময়ে দেখতে হবে। খুবই সাধারণ দৃশ্য। রোজই অসংখ্য দেহ নদীতে ভাসতে ভাসতে যায়। শকুনের পাল দেহগুলির উপর বসে বসে বিমোয়। নরমাংসে তাদের এখন আর রুচি নেই। কিন্তু আজকের মৃতদেহ দুটির উপর শকুন বসে নেই। আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। চোখ ফেরাতে পারছি না। সবুজ। সার্ট গায়ে দেয়া ত্রিশ-পঁয়ত্ৰিশ বছরের একজন যুবকের মৃতদেহ। তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে সাত-আট বছরের একটি বালিকা। বালিকার হাতভর্তি লাল কাচের চুড়ি। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে হয়তো পরম নির্ভরতায় এই বালিকা তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।
এখন আমরা বাস করছি স্বাধীন দেশে। স্বাধীন বাংলাদেশ। এই দেশে সবচে সম্মানিত, সবচে বড় পদকটির নাম–স্বাধীনতা পদক। বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মুনীর চৌধুরী, রনদা প্ৰসাদ সাহা, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এই পদক পেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ননছর পর, মহান বিজয় দিবসে রেডিও ও টেলিভিশনের খবরে শুনলাম–স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়েছে সর্ষিনার পীর মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকে।
হায়, এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি?
কাঁদছে আমাদের বাংলাদেশ
ঢাকা শহরে আজ শাহেদের শেষ রাত্রিযাপন।
সে মনস্থির করে ফেলেছে ভোরবেলা কুমিল্লা রওনা হবে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আসমানীর দাদার বাড়ি। শাহেদ সেখানে কখনো যায় নি। তাতে সমস্যা নেই। খুঁজে বের করতে পারবে। আসমানীর দাদা তার গ্রামের প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন। তিনি রেঙ্গুনে ব্যবসা করতেন বলে গ্রামের বাড়ি রেঙ্গুন বাড়ি নামে পরিচিত। আসমানীর দাদার নাম শাহেদের মনে নাই। রেঙ্গুন বাড়ি নাম মনে আছে। শাহেদের ধারণা রেঙ্গুন বাড়িতে উপস্থিত হলেই সে একসঙ্গে সবার দেখা পাবে।
কুমিল্লার পাশেই আগরতলা। এমনও হতে পারে সবাই বাড়িঘর ছেড়ে আগরতলা চলে গেছে। সে-রকম হলে শাহেদও আগরতলা যাবে। শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে দেখবে। এতগুলি মানুষ হারিয়ে যেতে পারে না।
আবার এটাও হতে পারে শাহেদ যেদিন রওনা হবে, সেদিন দুপুরে বা সন্ধ্যায় আসমানীরা এসে উপস্থিত হবে। আসমানী যেন তার খোঁজ পায়, সে ব্যবস্থাও শাহেদ করেছে। বাথরুমের আয়নায় একটা চিঠি বুলিয়ে রেখেছে। চিঠিতে লেখা–
আসমানী,
তুমি যদি এই চিঠি পড়, তাহলে ধরে নিও আমি এখনো নিরাপদে আছি। আমি তোমাদের খোঁজ বের করার চেষ্টায় ঢাকা ছেড়েছি। আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে না। একটা বড় বিপদ বারবার আসে না। কাজেই ধরে নাও আমি নিরাপদেই থাকব। তুমি আমার জন্যে এই বাড়িতেই অপেক্ষা করবে। রান্নাঘরে চাল, ডাল, আটা এবং তেল রেখে দিয়েছি। ডালের কোটা ভালোমতো দেখবে।
