আসমানী বলল, আমরা যাব কোথায়?
কুদ্দুস পানের কৌটা থেকে পান বের করে মুখে দিল। উদাস গলায় বলল, জানি না।
জাহেদা বললেন, কুদ্দুস, সিংধা এখান থেকে কত দূর?
কুদ্দুস নদীর পানিতে থুথু ফেলে বলল, কাছেই।
জাহেদা বললেন, আমাদের সিংধা নিয়া চল। সিংধায় আমার ফুফু-শাশুড়ির বাড়ি।
কুদ্দুস বলল, আইচ্ছা।
জাহেদা আসমানীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আসমানী শোন, সিংধায় তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে না। তুমি আমাদের ঘাড়ে চাপার পর থেকে বিপদ-আপদ শুরু হয়েছে। তাছাড়া সিংধায় এত মানুষ নিয়ে আমি উঠতে পারব না।
আসমানী বিস্মিত হয়ে বলল, আমি কোথায় যাব? জাহেদা তার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। কোলবালিশ নিয়ে ঘুরে বসলেন। তিনি আরেকটা পান মুখে দিয়েছেন। তাঁর মুখভর্তি পানের রস। রুনি বলল, মা উনি আমাদের নিতে চাচ্ছেন না কেন? আসমানী মেয়ের প্রশ্নের জবাব দিল না। তার কাছে জবাব ছিল না। রুনি বলল, আমরা এখন কোথায় যাব মা?
আসমানী অবিকল কুদ্দুসের মতো উদাস গলায় বলল, জানি না।
জাহেদা বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়েছেন। তাকে দেখে মনে হবে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তবে পান খাবার জন্যে মুখ নড়ছে। আসমানী একবার ভাবল বলে, খালাম্মা, আমার শরীরের অবস্থা ভালো না। আমার পেটে সন্তান। আমাকে এইভাবে ফেলে রেখে যাবেন না। তারপরই মনে হলো, কী হবে! তার নিজেরও ঘুম পাচ্ছে। একটা বালিশ থাকলে কিছুক্ষণ ঘুমাত। চিন্তাভাবনাহীন কিছু সময় পার হয়ে যেত ঘুমে ঘুমে।
আয়েশা বেগম নৌকায় বসে আছেন
এসডিপিও ফয়জুর রহমান সাহেবের পুত্রকন্যারা এবং তার স্ত্রী আয়েশা বেগম নৌকায় বসে আছেন।
আয়েশা বেগম রোজা রেখেছেন। স্বামীর মঙ্গলের জন্যে নফল রোজা। মাগরেবের সময় হয়ে গেছে। রোজা ভাঙতে হবে। রোজা ভাঙার কোনো প্রস্তুতি নেই। সামান্য পানিও নেই যে পানি খেয়ে রোজা ভাঙা যায়।
তিনি তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাবলা গ্রামে এক সম্পন্ন বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। এসডিপিও সাহেবের স্ত্রী–সেই হিসেবে বাড়ির লোকজন তাদেরকে খুব আদর-যত্ন করছিলেন। হঠাৎ কী হয়ে গেল, বাড়ির কর্তা খসরু মিয়া (ছদ্মনাম*) আয়েশা বেগমের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমরা আপনাদের এই বাড়িতে রাখতে পারব না। বাড়ি ছাড়তে হবে।
আয়েশা বেগম অবাক হয়ে বললেন, বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব?
বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবেন–সেটা আপনি খুঁজে বের করেন। আমি নৌকা আনায়ে রেখেছি, নৌকায় উঠেন।
আমি আপনাদের অঞ্চল কিছুই চিনি না। বাচ্চাদের নিয়ে আমি যাব কোথায়? আমার বড় বড় দুটা মেয়ে আছে।
আপনি খামাখা সময় নষ্ট করতেছেন। নৌকায় উঠতে বলছি, নৌকায় উঠেন। আমরা খবর পেয়েছি, আপনার স্বামীকে মিলিটারি মেরে ফেলেছে। আপনার দুই ছেলেকে খুঁজতেছে। আপনাকে এখানে বাখলে আমরা সবাই মারা পড়ব।
আয়েশা বেগম বললেন, আজকের রাতটা থাকতে দিন। সকালবেলা আমি যেখানে পারি চলে যাব।
অসম্ভব। নৌকায় উঠেন। সামান্য দয়া করেন। আমরা মহাবিপদে আছি।
সবাই বিপদে আছে, এখন দয়া করাকরির কিছু নাই।
খসরু মিয়ার হুকুমে জিনিসপত্র নৌকায় তোলা হতে লাগল। আয়েশা বেগম তার ছোট মেয়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে নৌকায় উঠলেন। নৌকার মাঝি বলল, আপনারা কোথায় যাবেন? তিনি বললেন, জানি না।
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। নৌকা বরিশালের আঁকাবাঁকা খাল দিয়ে এগুচ্ছে। আয়েশা বেগম কিছুক্ষণ আগে নৌকা থেকে হাত বাড়িয়ে খালের পানি দিয়ে রোজা ভেঙেছেন। নৌকার মাঝি খুবই অস্থির হয়ে গেছে। কোথায় যাবে কেউ বলছে না। সে কিছুক্ষণ পরপর জিজ্ঞেস করছে, পরিষ্কার করেন। কথা পরিষ্কার করেন। আপনেরা যাইবেন কই? এসডিপিও সাহেবের বড় ছেলে বলল, আমরা কোথাও যাব না। নৌকায় নৌকায় ঘুরব।
মাঝি বলল, এইটা কেমন কথা?
বড় ছেলে বলল, এইটাই আসল কথা।
মাঝি ভীত চোখে তাকাচ্ছে, কারণ এই ছেলের হাতে বন্দুক। শুধু এই ছেলের হাতেই যে বন্দুক তা-না, তোর ছোটভাইয়ের হাতেও বন্দুক।
এসডিপিও সাহেবের অস্ত্রশস্ত্রের প্রতি অন্যরকম অনুরাগ ছিল। সরকারি পিস্তল ছাড়াও তার ব্যক্তিগত একটা পিস্তল আছে। দুটা আছে পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল! জীবনের বিরাট দুঃসময়ে এসডিপিও সাহেবের ছেলেমেয়েরা এইসব অস্ত্ৰ হাতে নিয়ে বসে আছে। বরিশাল ডাকাতের দেশ। ডাকাতদের কাছে খবর চলে যাবার কথা যে একটা অসহায় পরিবার নৌকায় ঘুরছে।
নৌকা বড় একটা বাঁক পার হলো আর তখনি দেখা গেল একুশ-বাইশ বছর বয়েসি মাথায় টুপি পরা এক যুবক ছুটতে ছুটতে আসছে। হাত উঁচিয়ে ইশারা করছে নৌকা থামানোর জন্যে। নৌকা থামানো হলো। যুবক বলল, আপনাদের যে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, আমি সেই বাড়ির ছেলেমেয়েদের কোরান শরিফ পড়াই। আপনাদের বিপদ দেখে আমার মন খারাপ হয়েছে। আপনারা কি আমার বাড়িতে উঠবেন? আমার ছোট্ট একটা ঘর আছে। আমি একা থাকি।
আয়েশা বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, উঠব। তাঁর বড় ছেলে বলল, এই লোক যে গভীর রাতে ডাকাত খবর দিয়ে আনবে না বা আমাদের মিলিটারির হাতে ধরিয়ে দেবে না–তার নিশ্চয়তা কী?
আয়েশা বেগম বললেন, একটা লোক আশ্রয় দিতে চাচ্ছে, আল্লাহর নাম নিয়ে তার বাড়িতে উঠ।
সবাইকে নিয়ে রাত দশটার দিকে গভীর জঙ্গলের ভেতর এক বাড়িতে আয়েশা বেগম উঠলেন। স্বামীর মৃত্যু বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারছেন না। উড়া উড়া খবর এসেছে। কেউ নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছে না। তিনি সারা রাত তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে কোরান পাঠ করলেন। তাঁর দুই ছেলে রাইফেলে গুলি ভরে পাহারায় থাকল। ভোরবেলা পাংখাপুলার রশিদ এসে উপস্থিত। তার চোখ লাল, মুখ শুকনা। রশিদকে দেখে আয়েশা বেগম বললেন, তোমার সাহেবের খবর কী? উনি কোথায়?
