ঘটনা পেরায় সেই রকম।
ইছাপুরে মিলিটারি নেই?
জে না।
ইছাপুরে মিলিটারি নেই কেন?
আমাদের দেশটা কি বিরাট?
আরেকবাসরে, বিরাট বলে বিরাট!
ঐ বুড়ো ভদ্রলোক এরকম করছেন কেন?
শরীর ভালো না, হাঁপানি।
উনি কি মারা যাচ্ছেন?
আরে না ছোট আখ, কী যেন কম। মিত্যু অত সহজ না। মিত্যু বড়ই কঠিন।
আসমানী এক ঝলক কুদ্দুসের দিকে তাকাল। মৃত্যু সহজ না সে বলছে কীভাবে? সে নিজে কি দেখছে না মৃত্যু কত সহজ হয়ে গেছে! তিনজন মানুষকে ধরে নিয়ে গেল। সুস্থ সবল ভালোমানুষ। ভোরবেলা খবর এলো, মোতালেব সাহেবের ডেডবডি গাঙের পারে পড়ে আছে। অন্য দুটি ডেডবডি পানিতে ভেসে চলে গেছে। মোতালেব সাহেবের শবদেহ উদ্ধার হয় নি। কে আনতে যাবে? সবাই জীবন বাচানোর জন্য ব্যস্ত। তারা পালিয়ে যাচ্ছে। আতঙ্কে সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়েছেন মোতালেব সাহেবের স্ত্রী জাহেদা খানম। তাকে কুদ্দুস এসে বলেছিল, আম্মা, চলেন আপনে আর আমি দুইজনে যাই। লাশটা নিয়া আসি। আপনে সঙ্গে থাকলে মিলিটারি কিছু বলবে না। ইস্ত্রী স্বামীর ডেডবিডি নিতে আসছে এটা অন্য ব্যাপার। মিলিটারি যত খারাপই হউক, এরা মানুষ। এইটা বিবেচনা করব। জাহেদা রাজি হন নি।
নৌকায় তিনি বেশ স্বাভাবিক আছেন। কান্নাকাটি করছেন না। অপরিচিত এক মহিলার কাছ থেকে পান নিয়ে মুখে দিলেন। তার পান খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে, তিনি পান খেয়ে খুব আরাম পাচ্ছেন। মাথা বের করে নদীর পানিতে পিক ফেলছেন। তার কোলে একটা বালিশ। তিনি বালিশ হাতছাড়া করছেন না। বালিশের তুলার ভেতর টাকা এবং সোনার গয়না।
আসমানী অলস চোখে তাকিয়ে আছে। চারদিক এত সুন্দর! মানুষের দুঃখ কষ্টে প্রকৃতির কিছু যায় আসে না। সে তার মতোই থাকে। খালের পানি কী পরিষ্কার! ঝকঝকি করছে। এই সময়ে নদীর পানি ঘোলা থাকে। ভদ্র মাসের দিকে পানি পরিষ্কাব হতে থাকে। এই খালের পানি এত পরিষ্কার কেন? কিছুক্ষণ পরপর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে বিক উড়ে যাচ্ছে। নীল আকাশে বক, উড়ছে–এই দৃশ্যটা এত সুন্দর! দেশ যদি ঠিকঠাক হয়ে যায়, আবার যদি শাহেদের সঙ্গে দেখা হয়, তাহলে শাহেদকে নিয়ে ঠিক এই খাল দিয়ে নৌকাভ্রমণে যেতে হবে। শাহেদের সঙ্গে কি দেখা হবে?
কেশব বাবু উঠে বসেছেন। তার চোখ টকটকে লাল। চোখের কোণে ময়লা জমেছে। তার দিকে তাকানো যাচ্ছে না; কুদ্দুস বলল, শরীরের ভাব কী?
কেশব বাবু বললেন, একটু ভালো বোধ করছি! চোখ যন্ত্রণা দিচ্ছে।
মনে হয় চউখ উঠতেছে। চাইরদিকে চউখ উঠা ব্যারাম।
ইছাপুর যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?
ধরেন আর দুই ঘণ্টা।
রুনি এক দৃষ্টিতে কেশব বাবুর দিকে তাকিয়ে আছে। কুদ্দুস বলল, ছোট আম্মা, এই রকম কইরা চউখ উঠা মাইনসের চউখের দিকে তাকাইতে নাই। যে তাকায় তারও চউখ উঠে।
রুনি বলল, কেন?
কুদ্দুস উদাস গলায় বলল, কেন তা ক্যামনে বলব? এইটা হইল আল্লাপাকের বিধান।
আল্লাপাকের বিধান থাকা সত্ত্বেও রুনি তাকিয়েই রইল। এরকম লাল চোখের মানুষ সে আগে দেখে নি।
কেশব বাবু বললেন, খবরটা শোনা দরকার।
কুদ্দুস বলল, শোনা দরকার হইলে শুনেন, আপনের কাছে তো টেনজিস্টার আছে।
মেয়েরা সব কান্নাকাটি করছে, এর মধ্যে টেনজিস্টার ছাড়াটা কি ঠিক হবে?
সেইটা আফনের বিবেচনা।
কেশব বাবু ঢাকা ধরলেন। খবরে বলা হলো–পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। বিদেশী সাংবাদিকদের একটি টিম সারা প্রদেশে ঘুরে বলেছেন— আইনশৃঙ্খলা সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। দেশের কাজকর্ম স্বাভাবিক গতিতে চলছে। অফিস আদালতে উপস্থিতির সংখ্যা আগের মতো। যারা এখনো কাজে যোগ দেন নি তাদের অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে। গণচীনের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে বাইরের হস্তক্ষেপ বাঞ্ছনীয় নয়, পূর্ব পাকিস্তানে চালের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চালভর্তি জাহাজ চট্টগ্রাম নৌবন্দরে ভিড়েছে। মাল খালাস শুরু হয়েছে।
কুদ্দুস বলল, দেশের অবস্থা তো ভালোই।
কেশব বাবু বললেন, হুঁ।
তাকে খুব চিন্তিত মনে হলো।
ইছাপুরে নৌকা ভিড়ল দুপুর নাগাদ। নৌকাঘাট জনশূন্য। অন্য সময় কেরায়া নৌকা, ঘাস কাটা নৌকায় জায়গাটা জমজমাট হয়ে থাকে। আজ একটা প্রাণীও নেই। চা-বিস্কিটের একটা দোকান ছিল, সেটাও বন্ধ। কুদ্দুস বলল, কেমন কেমন জানি লাগতেছে, বিষয়টা কী?
বিষয় জানতে দেরি হলো না। মিলিটারির একটা দল আজ ভোরবেলাতেই ইছাপুরে এসেছে। তারা জায়গা নিয়েছে ইছাপুর থানায়। তাণ্ডব শুরু হয়েছে। মিলিটারিরা ড্রাম ভর্তি কেরোসিন নিয়ে এসেছে। হিন্দু ঘরবাড়ি জ্বালানো শুরু ধ্ৰুং।। ঘরবাড়ি জ্বালানোর জন্য আজকের দিনটাও শুভ। বাতাস নেই, বৃষ্টি
কুদ্দুসরা নৌকা থেকে নামল না। শুধু কেশব বাবু নেমে গেলেন। কাঁদো। কাঁদো মুখে রুনিকে বললেন, মা গো, আমার জন্য একটু প্রার্থনা করো।
রুনি খুবই অবাক হলো। এত মানুষ থাকতে এই লোকটা তাকে প্রার্থনা করতে বলছে কেন? প্রার্থনা কীভাবে করে তাও তো সে জানে না।
নৌকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মাঝি দুজনই প্ৰাণপণে লগি ঠেলছে। এই অঞ্চল থেকে যত দ্রুত সরে যাওয়া যায়।
খালের পাড়ে বুড়ো এক লোক বসে ছিল। সে চাপা গলায় বলল, তাড়াতাড়ি চইল্যা যান। তাড়াতাড়ি।
