রানী মেয়েটিকে আগে যেমন সুন্দর দেখেছিলেন, এবার তার কাছে আরো সুন্দর লাগছে। বিয়ের কথাবার্তা শুরু হলেই মেয়েরা সুন্দর হতে থাকে। সবচে বেশি সুন্দর হয় গায়ে হলুদের দিন। বিয়ের রাত থেকে তাদের সৌন্দর্য কমতে শুরু করে। এটা হলো সাধারণ কথা। রানীর বিয়ের কথা শুরু হয়েছে বলেই সে সুন্দর হচ্ছে, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এ বাড়িতে এসেই রানীকে তিনি একটা শাড়ি দিয়েছেন। মুরুব্বিরা বেড়াতে এলে কাপড়চোপর, মিষ্টি নিয়ে আসে। সেইভাবে আনা, তবে শাড়িটা নিয়ে তার সামান্য মন খুঁত খুঁত করছে। কারণ এই শাড়ি ফরহাদ তার বউ-এর জন্যে কিনেছিল। সুন্দর করে প্যাকেট করা। ফরহাদকে জিজ্ঞেস না করেই দিয়েছেন। ফরহাদের এসব মনে থাকবে না। এখন তার হচ্ছে মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা।
রানী শাড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে অবাক হয়ে বলল—শাড়ি কেন?
তিনি মধুর ভঙ্গিতে বললেন, তোমাকে কখনো কিছু দেয়া হয় না। কিছু দিতে ইচ্ছা করে। ফরহাদকে বললাম একটা শাড়ি কিনে দিতে। সে নিজেই পছন্দ করে কিনে এনেছে। বুঝতে পারছি না তোমার পছন্দ হবে কি না।
রানী লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, নতুন শাড়ি পরতে আমার সব সময় ভাললা লাগে।
রাহেলা বললেন, শাড়ি হাতে নিয়ে বোঝা যায় না সুন্দর না অসুন্দর। শাড়ি সুন্দর শরীরে। শাড়িটা পরে আস মা। লাল ব্লাউজ আছে না? লাল ব্লাউজ যে কোনো শাড়ির সঙ্গে মানায়। লাল ব্লাউজ দিয়ে শাড়িটা পর। দেখি তোমাকে মানায় কি-না।
রানী হ্যাঁ সুচক মাথা নেড়ে লজ্জিত এবং আনন্দিত ভঙ্গিতে বের হয়ে গেল।
রাহেলা মেয়েটাকে শাড়ি পরে আসতে বলেছেন কারণ নতুন শাড়ি পরলেই সবাই জানতে চাইবে শাড়িটা কোত্থেকে এসেছে। এটা সবার জানা দরকার। কেউ যেন মনে না করে তিনি আশ্রিতা হিসেবে মেয়ের বাড়িতে উঠেছেন। এতে তার যেমন অপমান। তার মেয়েরও অপমান। তিনি যতদিন থাকবে। খরচাপাতি করে থাকবেন। এমনভাবে খরচ করবেন যেন সবার চোখে পড়ে। কাল পরশু বিশাল একটা কাতল মাছ কিনে আনাবেন।
রানীকে শাড়ি তিনি অনেক বিচার বিবেচনা করেই দিয়েছেন। শুধু শাড়িটা কিনেছে ফরহাদ এই কথাটা না বললে ভালো হত। রানী যদি কোনোদিন ফরহাদকে কিছু জিজ্ঞেস করে তাহলে সমস্যা হবে। আজকালকার মেয়ে, অকারণে কথা বলা এদের স্বভাব। ফরহাদকে দেখে বলে বসতে পারে। আপনি তো ভালো শাড়ি চিনেন। রঙটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আর ফরহাদ এমন গাধা। এ রকম কোনো কথা বললে, সে সঙ্গে সঙ্গে বলবে—কই আমি তো তোমার জন্যে শাড়ি কিনি নি!
রাহেলা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন রানী শাড়ি পরে তাঁকে এসে সালাম করবে। তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন মেয়েটা এল না। বাড়ির পেছনে কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলা হচ্ছে। তিনি বারান্দা থেকে দেখলেন রানী ব্যাডমিন্টন খেলছে। তাকে দেখে লজ্জা পাবার মতো ভাবও করল না। রানীর সঙ্গে লম্বামত যে মেয়েটি খেলছে তাকে তিনি চিনতে পারলেন না। এদের কোনো আত্মীয় স্বজন হবে। এখন থেকে এ বাড়ির সবাইকে চিনতে হবে। তাদের আচার আচরণ বিশ্লেষণ করতে হবে। সবার মন যুগিয়ে এমনভাবে চলতে হবে যেন কেউ বুঝতে না পারে তিনি সবার মন যুগিয়ে চলছেন। একবার বুঝে ফেললে–সর্বনাশ।
আশ্রিতের জীবন ভয়াবহ জীবন। এই জীবন সহনীয় করার কোনো ব্যবস্থা নেই। নিজেকে এই পরিবারের কাছে অতি প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারলে জীবনযাত্রা সহজ হবে, কিন্তু এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই। এদের বিরাট পরিবার। অনেক লোকজন। চার পাঁচটা কাজের মেয়ে। নদশ বছর বয়েসী দুটা ছেলে—যাদের একমাত্র কাজ একটু পর পর দোকানে যাওয়া এটা ওটা নিয়ে আসা। বাজার করার লোকও আলাদা। বিশাল বলশালী একজন মানুষ। মাথা কামানো। তাকে দেখলেই মনে হয় কিছুক্ষণ আগে একটা খুন করে এসেছে। পরিশ্রম হয়েছে বলে ক্লান্ত হয়ে চা খাচ্ছে। চা খেয়ে দ্বিতীয় খুনটা করতে যাবে।
রাহেলা এই বাড়ির ভাব ধরার চেষ্টা করছেন। ধরতে পারছেন না। এত সহজে ধরা যাবে না। সময় লাগবে। জাহানারার কাছে শুনেছেন এরা একান্নবর্তি পরিবার। কিন্তু এখন দেখছেন—সবার জন্যে একসঙ্গে রান্না হয় এটা যেমন ঠিক আবার প্রত্যেক পরিবারের আলাদা রান্নাঘর আছে। সেখানেও রান্না হয়। এটাও ঠিক।
রাতে জামাইয়ের সঙ্গে রাহেলার দেখা হলো। জামাই বিনয়ে কাচুমাচু হয়ে বলল, সাভারে গিয়েছিলাম। এই কিছুক্ষণ আগে ফিরেছি। আম্মা খাওয়া দাওয়া হয়েছে।
রাহেলা বললেন, জি বাবা খেয়েছি।
খাওয়া দাওয়ার কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বলবেন।
না বাবা অসুবিধা কি হবে।
আমাদের মানুষ বেশি। অসুবিধা হবেই। সবার রুচির দিকে লক্ষ রেখে তো রান্না করা সম্ভব না। এই জন্যে বলে দেয়া আছে—দিনে মাছ, রাতে মাংস।
বাবা আমার কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না। আর কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার। মঞ্জু একটা বাড়ি ঠিক করে ফেলেছে। বাথরুমের কিছু কাজ করাবার জন্যে তিন চার দিন নাকি লাগবে।
তিন চার দিন লাগুক, বা তিন চার মাস লাগুক। আম্মা এটা আপনার নিজের বাড়ি। জাহানারা মোবাইলে বলেছিল অফিসের টিভিটা আনতে। সাভার থেকে এসেছি তো মা ভুলে গেছি। কাল সকালে অফিসে গিয়েই টিভি পাঠিয়ে দিব।
বাবা তুমি ব্যস্ত হয়ো না। এটাকি আর টিভি দেখার বয়স? আল্লা আল্লা করে দিন পার করা। তুমি পরিশ্রম করে এসেছ যাও হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া দাওয়া কর।
জামাইয়ের কাছ থেকে এরচে ভালো ব্যবহার তিনি আশা করেন নি। ভবিষ্যতে তার জন্যে কি অপেক্ষা করছে তিনি জানেন না। ভবিষ্যৎ খুব সুখের তা মনে হয় না। স্ত্রীর ভবিষ্যৎ স্বামীর সঙ্গে যুক্ত। যেখানে স্বামী থেকেও নেই সেখানে আর ভবিষ্যৎ কি?
