নিজের অসহায় অবস্থা নিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করবেন সেই উপায় নেই। আগে যাবতীয় সমস্যা নিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতেন। এখনকার সমস্যাটা তিনি কিছুতেই মেয়েকে জানাতে দিতে চান না। স্বামীর সঙ্গে আলাপ করার প্রশ্নই উঠে না। লোকটার মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে বলে তার ধারণা। কথাবার্তার কোনো ঠিক নেই। কখন কি বলছে—কেন বলছে তাও জানে না। জাহানারার শাশুড়ি যখন বললেন, বেয়াই সাহেব! কেমন আছেন?
তার উত্তরে সে হড়বড় করে বলল, গাছের কথা বলছেন? সব তুলে ফেলেছে। জায়গা পরিষ্কার। কে বলবে দুদিন আগে কত গাছ ছিল, কত ধরনের গাছ ছিল। পাঁচটা লবঙ্গ চারা লাগিয়েছিলাম তার মধ্যে চারটা বেঁচেছে। আর একটা বছর পার করতে পারলে গাছের লবঙ্গ খাওয়াতাম।
জাহানারার শাশুড়ি বললেন, গাছের কথা না বেয়াই সাহেব, আপনার কথা জানতে চাচ্ছি।
ফরহাদের বাবা হতভম্ব হয়ে বলল, আমার কি কথা?
আপনি আছেন কেমন? শরীরটা কেমন?
ফরহাদের বাবা এমনভাবে চারদিক দেখতে লাগলো যেন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন জীবনে কেউ তাকে করে নি।
রাহেলা বললেন, বেয়ান সাহেব উনাকে কিছু জিজ্ঞেস করা না করা অর্থহীন। গাছ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে করেন—জবাব দিবে। অন্যকোনো প্রশ্নের জবাব দিবে না। আপনার বেয়াই সাহেবের আমার সঙ্গে বিয়ে না হয়ে একটা কাঁঠাল গাছের সঙ্গে বিয়ে হলে তার জীবনটা সুখে কাটত।
এই কথায় জাহানারার শাশুড়ি খুবই আনন্দ পেলেন। হেসে ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা। হাসতে হাসতে বললেন, বেয়ান তো বড়ই রসিক। বেয়ান যে এত রসিক তা তো জানতাম না।
রাহেলা মোটেই রসিক না। রস করার মতো মনের অবস্থা তাঁর না। এ বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকে তাকে নানান ধরনের মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। যেমন জাহানারার শাশুড়িকে বললেন–আমার দুই ছেলে বুঝলেন বিয়ান সাহেব। বাস্তববুদ্ধি বলে কিছু নাই। কতবার বললাম রহমত উল্লার জায়গাটা কিনে রাখ। দেশের বাড়ির জমিজমা তো কোনো কাজে আসবে না সাত ভূতে লুটেপুটে খাবে। সেই সব বিক্রি করে এই জায়গাটা কিনে ফেল। ঢাকায় বাস করছিস ঠিকানা বাগবে না? দুই ভাই-ই বলে, বাদ দাও। বাদ দিয়ে অবস্থাটা তো দেখেছেন? একেবারে রাস্তায়।
জাহানারার শাশুড়ি বললেন, কি বলেন বেয়ান সাহেব রাস্তায় হবেন কেন? আমরা আছি কি জন্যে
সেটা তো ঠিকই। ছোট ছেলে আমাকে কি বলে শুনুন। সে বলে—মা মাসের এই ভাংতি কিছুদিনের জন্যে তো আর বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি হোটেলের একটা ঘর ভাড়া করে দিচ্ছি। তোমরা দুই বুড়োবুড়ি হোটেলে থাক। ও আল্লা আমার বড় ছেলেরও দেখি তাতে সায় আছে। সেও বলল, এটাই ভালো। হোটলে থাকার অনেক মজা। চল আমরা বাকি জীবন হোটেলে কাটিয়ে দেই। আমি তখন দিলাম ধমক—বললাম, তোরা আমাকে আমার মেয়ের কাছে দিয়ে নিজেরা হোটেল ভাড়া করে থাক। সঙ্গে অবশ্যই তোর বাবাকেও নিবি। সে হোটেলের টবের গাছে পানি দিবে।
জাহানারার শাশুড়ি বললেন—বেয়ান সাহেব! আপনি এত মজা করে কথা বলেন। আপনার এই গুণের কথা তো আগে জানতাম না। আপনার ছেলেরা বাড়ি ভাড়া করলেও আপনি থাকবেন আমার সঙ্গে। আমরা দুই বুড়ি পান জর্দা খাব। গল্প করব। টিভিতে হিন্দী ছবি দেখব। বেয়ান আপনি হিন্দী বুঝেন তো?
রাহেলা জাহানারার শাশুড়ির কথায় স্বস্তি পেলেন। যাক বুড়ি তার মিথ্যা কথাগুলি বিশ্বাস করছে। এ জাতীয় মিথ্যা কথা জাহানারাকে বলা যাবে না। এই মেয়ের অনেক বুদ্ধি। মিথ্যা বললেই ধরা পড়তে হবে। তার ধারণা জাহানারাকে যখন বলেছেন ম বাড়ি ভাড়ার জন্যে ছোটাছুটি করছে—তখন মেয়ে বুঝে ফেলেছে মা মিথ্যা কথা বলছে। তবে তিনি তার মেয়ের উপর সন্তুষ্ট। খুবই সন্তুষ্ট।
মেয়ে তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে পারত। কিছুই জিজ্ঞেস করে নি। সে বলতে পারত—ভাইয়ের বিয়ে দিচ্ছ কই আমি তো কিছু জানলাম না। আমি যখন রানীর সঙ্গে বিয়ের কথা বললাম, তখনো চুপ করে রইলে। মেয়েকে শুধু মনে পড়ে বিপদের সময়ে
জাহানারা কিছু জানতে চায় নি। দাদাজানের মৃত্যুর কারণে বিয়ে ভেঙ্গে গেছে, সেই ভাঙ্গা বিয়ে আবার কবে জোড়া লাগবে সে ব্যাপারেও কোনো কৌতূহল দেখায় নি। এখন দেখায় নি বলে যে কোনদিন দেখাবে না তা না। এক সময় না এক সময় জানতে চাইবে। রাহেলা তখন কি বলবেন সব ঠিক করে রেখেছেন। তিনি বলবেন, ঐ বিয়ে হবে না। তোর ভাইয়ের বিয়ের দায়িত্ব আমি তোর হাতে দিলাম। মা তুই ব্যবস্থা কর। এটা বলতে তার কোনো অসুবিধা নেই কারণ তিনি জানেন বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙ্গে গেলে সেই বিয়ে আর কখনো হয় না। এটা তিনি যে একা জানেন তা না। সবাই জানে।
তার উপর খবর পাওয়া গেছে মেয়েটা ভয়ঙ্কর অসুস্থ। চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে আছে। এমন অবস্থা যে দেশে চিকিৎসা হচ্ছে না, বিদেশ যেতে হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে যে বিয়ে দিতে চাচ্ছিল এই জন্যেই চাচ্ছিল। রোগ গোপন করে মেয়ে পার। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বাতাস না থাকলেও আপনা আপনি নড়ে। আল্লাহর ইশারায় বিয়ে ভেঙ্গে গেল। কাউকে কিছু করতে হলো না, বলতে হলো না।
রাহেলা ঠিক করে রেখেছেন রানীর সঙ্গে ফরহাদের বিয়ের ব্যাপার নিয়ে এখনো কোনো কথা বলবেন না। চুপচাপ অপেক্ষা করবেন। তার মন আগেও বলেছে বিয়েটা হবে, এখনো বলছে হবে। জাহানারা একটু সাহায্য করলেই হবে। সেই সাহায্য কি জাহানারা করবে? করবে তো বটেই বাপ-ভাই বলে কথা। তবে জাহানারা মনে কষ্ট পেয়েছে। পরে এক সময় মেয়ের সঙ্গে নিরিবিলিতে অনেক কথা বলবেন।
