রাত দশটার দিকে জাহানারা পানদান নিয়ে উপস্থিত হলো। রাহেলা বললেন, খাওয়া দাওয়া করেছিস?
জাহানারা বসতে বসতে বলল, না। আমার খেতে বসতে বসতে রাত বারটা বাজবে।
রাহেলা পান মুখে দিতে দিতে বললেন, দুপুরের পর থেকে তোর বাবার সঙ্গে দেখা হয় নি। সে আছে কোথায় জানিস।
টিভি দেখছেন।
জামাই-এর বাড়িতে এসে এত টিভি দেখাদেখি কি? ওকে এসে ঘুমুতে বল।
একতলায় ভাইয়াদের জন্যে যে ঘর রেখেছি, বাবা বলেছেন সেখানে থাকবেন।
রাহেলা আঁৎকে উঠে বললেন, কী সর্বনাশের কথা লোকজন কি বলবে? আমি এক ঘরে সে এক ঘরে। বুড়োকে এক্ষুনি আসতে বল। তোর বাবা বড় যন্ত্রণা করছে।
জাহানারা শান্ত গলায় বলল, বাবা যেখানে থাকতে চাচ্ছেন সেখানে থাকুন। লোকজন কি বলবে এটা নিয়ে তোমাকে এত মাথা ঘামাতে হবে না। এ বাড়ির লোকজন এত মাথা ঘামায় না।
তাই বলে স্বামী-স্ত্রী আলাদা ঘুমুচ্ছে এটা চোখে পড়বে না। সবার চোখে পড়বে।
কার চোখে কি পড়ছে এটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন? তুমি থাক তোমার মতো।
রাহেলা বললেন, তুই এত রাগী রাগী গলায় কথা বলছিস কেন? ঘটনা কি?
এ বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকে তুমি ক্রমাগত মিথ্যা বলে যাচ্ছ। এই জন্যে রাগ লাগছে।
কোন মিথ্যা বললাম?
এই যে বলছ বাড়ি ভাড়া হয়েছে। বাথরুম ঠিক হয় নি বলে যেতে পারছ না। ভাইয়ারা তোমাদের হোটেলে রুম ভাড়া করে দিতে চাচ্ছিল। আসল ব্যাপার তো আমি জানি। ভাইয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে। যেখানে তার চাকরি পর্যন্ত নেই সেখানে উদ্ভট কথাবার্তা বলার দরকার কি? তার উপর হুট করে তুমি রানীকে শাড়ি কিনে দিলে কেন? আমার তো মনে হয় এই শাড়িও তুমি নিজে কেন নি। ভাইয়া তার বিয়ের জন্যে যে কটা শাড়ি কিনেছিল তার একটা দিয়ে দিয়েছ।
যদি দিয়েও থাকি তাতে দোষ কি?
দোষ আছে। যখন তোমাকে বলেছিলাম রানীর সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও তখন পা ভারী হয়ে গিয়েছিল—এক পরিবারে বিয়ে, নতুন আত্মীয় হবে না। কত রকম কথা। আজ যখন দেখছ সাত হাত পানির নিচে চলে গেছে তখন রাতারাতি শাড়ি।
শাড়িটা আমি আদর করে দিয়েছি। বিয়ের ব্যাপার আমার মাথার মধ্যে নেই।
আদর করে তুমি কিছু দাও নি। এত আদর মা তোমার মধ্যে নেই। তোমার মাথায় সব সময় নানান রকম পরিকল্পনা থাকে। এখানে আমাকে না জানিয়ে কোনো পরিকল্পনা করবে না। রানীর সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলবে না। তার বিয়ের মোটামুটি পাকা কথা হয়ে গেছে। এই বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবারে পানচিনি হবে। ছেলে ব্যাংকার। মেয়ে দেখে পছন্দ করে গেছে।
রাহেলা ক্ষীণ স্বরে বললেন, ফরহাদের ব্যাপারে তাদের আর আগ্রহ নেই।
জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, তোমার যত বয়স হচ্ছে ততই কি বুদ্ধিসুদ্ধি কমে যাচ্ছে যে ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছিল, কোনো একটা সমস্যায় হঠাৎ বিয়ের তারিখ পাল্টেছে তার ব্যাপারে আগ্রহ কেন থাকবে বাজারে কি ছেলে কম পড়েছে?
ফরহাদের বিয়েটা তো আর হচ্ছে না।
ঐ প্রসঙ্গ নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে চাচ্ছি না। তুমি এখন এসো আমার সঙ্গে।
কোথায় যাব?
আমার শাশুড়ি তোমাকে ডাকছেন?
এত রাতে কি ব্যাপার?
এ বাড়ির লোকজন কেউ রাত একটার আগে ঘুমুতে যায় না। কাজেই তাদের হিসেবে রাত বেশী হয় নি। আমার শাশুড়ির কাছে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আক্তারী খানম নামের এক মহিলা আসেন। তিনি ধর্ম নিয়ে কথাটথা বলেন। জিগির করেন। আমার শাশুড়ি এই মহিলার খুব ভক্ত।
আমি তো ঘুমের অষুধ খেয়ে ফেলেছি।
বেশিক্ষণ থাকার দরকার নেই। উনার সঙ্গে দেখা করে চলে এসো।
রাহেলা বিছানা থেকে উঠতে উঠতে কোমল গলায় বললেন, তুই আমার উপর এত রেগে আছিস কেন রে মা? ভুল ত্রুটি আমার আছে। বয়স হয়েছে ভুল ত্রুটি হবে না?
জাহানারা ক্লান্ত গলায় বলল, আমি মোটেও রেগে নেই। তোমাদের অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে। তোমরা কোন অবস্থায় পৌঁছেছ সেই সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণাও নেই। দিব্যি বড় বড় কথা বলে বেড়াচ্ছ। বাবা মহাসুখে টিভিতে ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান দেখছেন।
তোর বাবার কথা ভিন্ন। ওর মাথারই ঠিক নেই।
মাথা তোমাদের কারোরই ঠিক নেই মা।
জাহানারা মাকে তার শাশুড়ির ঘরে পৌঁছে দিয়ে বাবার সন্ধানে গেল। জোবেদ আলি টিভির অনুষ্ঠান শেষ করে ঘুমুতে এসেছেন। তাঁর মন আজ সামান্য ভালো। ঘুমুবার জন্যে একা একটা ঘর পেয়েছেন। নিশ্চিন্ত মনে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাওয়া যাবে। কারোর কিছু বলার থাকবে না। অনেক দিন পর টিভি দেখলেন। ভালো লাগল। এ বাড়ির লোকজনদেরও তার পছন্দ হয়েছে। সবাই বেশ হাসি খুশি। গাছপালা বিষয়ে যার সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন সেই মন দিয়ে শুনেছে। একজন তো বলেই ফেলল—চাচা আপনি ঐ জাপানি গাছের একটা চারা এনে দিন তো টবে লাগাব। টবে হয়তো। কথাটা যে বলেছে তাকে তিনি চেনেন না। তবে যেই বলুক সে জাহানারার শ্বশুর বাড়ির। কাজেই তার কথার মর্যাদা রক্ষার জন্যে একটা চারা কাল সকালেই আনতে হবে। চারার দাম বাবত তার কাছ থেকে টাকা চাওয়া যায় না। কিন্তু তার নিজের হাত একেবারেই খালি। মঞ্জু বা ফরহাদের কাছে যে টাকা চাইবেন সে উপায় নেই। তারা কোথায় থাকে তিনি জানেন না। এটা একটা ভুল হয়েছে। এরা কে কোথায় থাকে তা জেনে আসা দরকার ছিল। কখন কী প্রয়োজন পড়ে। রাহেলার কাছে টাকা আছে তা তিনি জানেন। থাকলেও কোনো লাভ হবে না। তিনি যদি রাহেলার পা ধরেও বসে থাকেন তাতেও কিছু হবে না। জাহানারার কাছ থেকে ধার হিসেবে নিয়ে নেয়া যায়। বাবা তার মেয়ের কাছে ধার চাইতেই পারে। এতে লজ্জা বা অপমানের কিছু নেই। ধার নিয়ে ফেরত না দেয়াটা লজ্জার। তিনি ফেরত তো দেবেনই। ফরহাদের সঙ্গে যেদিন দেখা হবে তার পরদিনই ফেরত দেবেন।
