এই চিঠি লিখতে লিখতে আমি মজার একটা জিনিস ঠিক করি। মজার জিনিসটা হচ্ছে তোমার জন্যে একটা পরিস্থিতি তৈরি করা। যাতে তুমি সার্ট গায়ে দিয়ে যখন বাথরুম থেকে বের হবে তখন দেখবে আমি ঘুমিয়ে। এই ঘুম আসল ঘুম নামকল যুম। অভিনয় ঘুম। আমাকে ঘুমন্ত দেখে তুমি কি কর তাই আমার দেখার ইচ্ছা। আমার ধারণা তুমি আমার পাশে বসবে এবং খুব সাবধানে (যাতে আমার ঘুম না ভাঙ্গে) কপালে হাত রাখবে। কিংবা মাথা নিচু করে ঝুঁকে এসে… থাক বাকিটা আর লিখলাম না, লজ্জা লাগছে। তুমি কি করবে তা নিয়ে আমি মনে মনে একটা বাজি ধরেছি। দেখি বাজিতে জিততে পারি কি-না। এই শোন আমি আর লিখতে পারছি
—প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল। ভুল বললাম, অনেক কিছু না একটা কথাই বারবার নানান ভঙ্গিতে লেখার ইচ্ছা, I Love You, তাও লিখতে পারছি না। শরীর বিদ্রোহ করেছে। ভালবাসাবাসির সঙ্গে শুধু মন না, এখন মনে হচ্ছে শরীরও জড়িত। তুমি ভালো থেকো।
ইতি তোমার আসমানী।
ফরহাদ আকাশের দিকে তাকালো।
কী সুন্দর ঝকঝকে নীল আকাশ। সোহরাওয়ার্দীর সামনের গাছগুলিকেও কী সুন্দর লাগছে। ফরহাদের আবার হাসপাতালে যেতে ইচ্ছা করছে।
আসমানীর বাবা যা ভাবার ভাবুক। সে আসমানীর হাত ধরে বসে থাকবে। উপায় নেই, আজ তাদের বাড়ি ছাড়তে হবে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানির লোকজন অপেক্ষা করছে।
জাহানারা মায়ের জন্যে দোতলার বড় একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছে। ঘরে খাট আছে, ড্রেসিং টেবিল আছে। দুটা চেয়ার আছে। টেবিল আছে। মেঝেতে কার্পেটও আছে। কার্পেট পুরানো হলেও পরিষ্কার। ঘরের সঙ্গে এটাচড বাথরুম।
জাহানারা বলল, এসি লাগানো ঘর তোমাকে দিতে পারতাম মা। একটা ছিল, কিন্তু এটাচড বাথরুম নেই। বাবা রাতে তিন চারবার বাথরুমে যায় এই জন্যে এই ঘর। ঘরের সঙ্গে বারান্দা আছে। বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে পারবে। তোমার জামাইকে বলেছি সে তার অফিস থেকে একটা টিভি এনে লাগিয়ে দেবে।
টিভির দরকার নেই।
দরকার থাকবে না কেন? অবশ্যই দরকার আছে। মা শোন তুমি এমন মুখ কালো করে আছ কেন? ঘর পছন্দ হয় নি?
ঘর খুব সুন্দর। বারান্দাটাও সুন্দর।
তাহলে মুখটা কাল কেন?
গুষ্ঠি শুদ্ধ তোর এখানে থাকতে এসেছি। ভাবতেই খারাপ লাগছে।
মেয়ের বাড়িতে মা এসে থাকে না? তুমি তো আর সারা জীবনের জন্য থাকতে আসনি?
তাও ঠিক। অল্প কিছু দিন থাকব তুই যা বাড়াবাড়ি করছিস এই জন্যেও খারাপ লাগছে। মঞ্জু বাড়ি ভাড়ার জন্যে যে রকম ছোটাছুটি করছে হয়তো আজ সন্ধ্যাবেলাতেই এসে বলবে—বাড়ি ঠিক হয়েছে চল। ছেলের যে স্বভাব যদি একবার বলে, আজ চল। আজই যেতে হবে।
আগে বলুক তারপর দেখা যাবে। মা শোন-তোমার আর বাবার জন্যে ঘরে খাবার দিয়ে যাবে। খাবার ঘরে তোমাদের খেতে যাবার দরকার নেই। মজিদের মা বলে একটা কাজের মেয়ে আছে তোমার যখন যা দরকার তাকে বলবে। মজিদের মাকে চিনেছ তো ঐ যে উঁচু দাঁত। ঠিক আছে–মা?
হ্যাঁ ঠিক আছে।
তোমার তো আবার ঘন ঘন চা খাবার অভ্যাস। তোমাকে সকালবেলায় এক ফ্লাক্স গরম পানি দিয়ে যাব। ঘরে টি কাপ, চিনি, দুধ থাকবে। শুধু চা-টা বানিয়ে নেয়া।
ফরহাদ কোথায় থাকবে?
একতলায় ব্যবস্থা করেছি। বড় ভাইজান বলেছে, সে থাকবে না। সে নাকি কোনো এক বন্ধুর সঙ্গে থাকবে। মঞ্জু ভাইয়ার সঙ্গে তো আমার দেখাই হয়নি। সে এখানে থাকবে কি না, তাও জানি না। বড় ভাইজানের ঘরে দুটা খাট আছে তারা দুইজন থাকতে পারবে। কোনো সমস্যা হবে না।
মেয়ে তাদের যত্ন করছে তাতে তার খুশি হওয়া উচিত। তিনি খুশি হতেন যদি জানতেন তার দুই ছেলে তার জন্যে বাসা ভাড়া করবে। তিনি ভাড়া বাসাতে উঠে যাবেন। মঞ্জু তাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে—পাগল হয়েছ মা। আমি বাড়ি ভাড়া করব কীভাবে? আমার আছে কি তোমাকে যে মাসে এক হাজার করে টাকা দিব বলেছি এটাই আমার ফাইন্যাল কথা। সেটা দিব। তোমাদের একটা সুবিধা করে দিচ্ছি। আমার থাকার ব্যবস্থা নিয়ে তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। আমার ব্যবস্থা আমি করে নেব।
ফরহাদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। ফরহাদ মাথা নিচু করে বলেছে– দেখি একটা কিছু ব্যবস্থা করব। সেই ব্যবস্থাটা কী সে বলতে পারছে না। ব্যবস্থাটা কবে নাগাদ হবে সে সম্পর্কেও কিছু বলছে না। ফরহাদের দৃষ্টি ভরসা হারা দৃষ্টি।
তিনি ফরহাদকে মোটামুটি কঠিন গলায় বলেছেন—আমরা জামাইয়ের বাড়িতে কত দিন পড়ে থাকব? সহজ প্রশ্নের সহজ উত্তর হওয়া উচিত। সেই সহজ উত্তরটা সে দিচ্ছে না। এমন ভাব করেছে যেন মায়ের কথা সে শুনতে পাচ্ছে না।
তুই কি আমাদের সঙ্গে থাকবি?
উঁহু। আমি নান্টু ভাইয়ের মেসে থাকব।
না, তুই অবশ্যই আমাদের সঙ্গে থাকবি। আমাদের কখন কী দরকার হয়। এ বাড়িতে কাকে কি বলব?
রাহেলা মনে প্রাণে চাচ্ছেন ছেলে তার সঙ্গে থাকুক। সঙ্গে থাকলেই অন্যের বাড়িতে থাকার অপমানটা গায়ে লাগবে। তখন একটা কিছু ব্যবস্থা করার জন্যে উঠে পরে লাগবে। রাহেলার মনে ক্ষীণ ভয় ঢুকে গেছে তার দুই ছেলে কোনো ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত করবে না। বাকি জীবনটা তার কাটবে জামাইয়ের অন্ন খেয়ে। অতি দ্রুত তিনি কাজের বুয়ার স্তরে নেমে যাবেন। ফরহাদের বাবা হয়ে যাবে বিনা বেতনের মালি। বাড়ির সামনে মাটি কুপিয়ে গাছ পুতবে। ঝাঝরি দিয়ে সকাল বিকাল গাছে পানি দিবে। জামাইয়ের গাড়ি এসে থামলে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিবে।
