পছন্দের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট একটা পাওয়া গেছে। এরা আবার কফিও বিক্রি করে। কামরুল সাহেব দু কাপ এসপ্রেসো কফির অর্ডার দিলেন ফরহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার সিগারেট খেতে ইচ্ছা করলে খাও। আমাকে গুরুজন হিসেবে সম্মান দেখাতে গিয়ে সিগারেট বন্ধ রাখার দরকার নেই। তোমার কাছে সিগারেট আছে?
জ্বি না।
আচ্ছা আমি আনিয়ে দিচ্ছি। আমার নিজেরও সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।
কামরুল ইসলাম সিগারেট আনতে পাঠালেন। সব চায়নীজ রেস্টুরেন্ট অন্ধকার অন্ধকার থাকে। এটিও তাই। কামরুল ইসলাম এই অন্ধকারেও চোখ থেকে সানগ্লাস খুলেন নি।
ফরহাদ!
জ্বি।
আসমানীর অসুখটা ভাল না বলে ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন।
ও।
আগেও একবার ডাক্তাররা এ জাতীয় সন্দেহ করেছিলেন। অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা করার পর তারা সন্দেহমুক্ত হয়েছিলেন। বিউমেটিক ফিভারের চিকিৎসা করা হয়। এতে উপকারও পাওয়া যায়। এখন মনে হচ্ছে ভুল চিকিৎসা হয়েছে। ভুল চিকিৎসার মাশুল খুব চড়া হয়। চড়া মাশুল দিতে হবে।
ওর অসুখটা কি?
এখনো জানি না। এখনো পরীক্ষা নীরিক্ষার পর্যায়ে আছে। নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি।
ডাক্তাররা কি সন্দেহ করছেন?
ভয়ংকর কিছু সন্দেহ করছেন। রেড ব্লাড সেল কাউন্ট অনেক বেশী। বেশী হলেও এরা ঠিক মত অক্সিজেন সাপ্লাই করতে পারছে না। নানান হাবিজাবি বলছে। ব্লাড ট্রান্সফিউশান করা হয়েছে। এতে ডাক্তাররা ভাল ফল পেয়েছেন। লোহীত রক্ত কণিকার অসুখ।
চিকিৎসা আছে?
লোহিত রক্ত কণিকার অসুখের আবার না-কি নানান ভেরাইটি আছে। কিন্তু কিছু ভেরাইটির ভাল চিকিৎসা আছে। এমনও আছে যে বোন-মেরো ট্রান্সপ্রেন্ট করে রোগ পুরোপুরি সারানো যায়। বোন-মেরো পাওয়াটাই সমস্যা।
সমস্যা কেন? সব বোন-মেরো ট্রান্সপ্লেন্ট করা যাবে না। ক্রস ম্যাচিং এ দেখতে হবে ম্যাচ করে কি-না। ক্রস ম্যাচিং করতে হবে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। বিরাট জটিলতা। বাংলাদেশে ক্রস ম্যাচিং এর ব্যবস্থাও নেই। সিঙ্গাপুরে আছে।
আসমানী কি তার অসুখের কথা জানে?
না। তাকে বলা হয়েছে রিউম্যাটিক ফিভারের কথা। তোমাকে নিরিবিলিতে ডেকে আনার উদ্দেশ্যটা কি জান?
জ্বি না।
আসমানীর অসুখের খবর দেয়ার জন্যে তোমাকে ডাকি নি। অসুখের খবর দেয়ার জন্যে চাইনিজ রেস্টুরেন্টও লাগে না, এসপ্রেসো কফিও লাগে না। তোমাকে ডেকেছি এই কথাটা বলার জন্যে যে বিয়ের ব্যাপারটা তুমি আপাতত মাথা থেকে সরিয়ে দাও। আসমানী বিয়ের জন্যে খুব অস্থির হয়ে আছে। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম সে যে কথাটা বলেছে তা হচ্ছে আমার বিয়ে হয়নি?
ওকে কি সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হবে?
জানি না। আমার এত টাকা নেই। শুধু আসমানীকে একা নিলেতো হবে না। বোন-মোরো ক্রস ম্যাচিং করার জন্যে আরো অনেককে নিতে হবে। আমার এত টাকা নেই।
সিগারেট চলে এসেছে। ফরহাদ সিগারেট ধরাল। কামরুল ইসলাম সাহেব সিগারেট খেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্যাকেটের দিকে হাত বাড়ালেন না।
কফির কাপে চুমুক দিতে নড়ালেন।
ফরহাদ!
জ্বি।
চল আসমানীকে দেখতে যাই।
জ্বি চলুন।
কামরুল ইসলাম সাহেব উঠলেন না বসে রইলেন। কফি শেষ হয়ে গেছে তারপরেও তিনি শূন্য কাপে চুমুক দিচ্ছেন।
ফরহাদ।
জ্বি।
তুমি কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের জবাব দাও নি।
কোন প্রশ্ন?
পরের জন্মে তুমি কি হয়ে জন্মাতে চাও? আসমানীকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম সে খুব অদ্ভুত উত্তর দিল। সে বলল…
কামরুল ইসলাম সাহেব কথা শেষ না করে উঠে পড়লেন। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, আমি হাসপাতালে যাব না। আমাকে বাসায় নামিয়ে রেখে তুমি যাও। আরেকটা কথা আসমানীর অসুখটা যে ভয়াবহ এই তথ্য অবশ্যই গোপন রাখবে।
জ্বি রাখব।
আসমানী যখন ছোট ছিল তখন সে কিছু অদ্ভুত কান্ড করতো। একটা তোমাকে বলি…।
ফরহাদ অদ্ভুত কান্ড শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কামরুল ইসলাম সাহেব চুপ করে গেছেন। মনে হয় অদ্ভুত কান্ডের গল্প করতে এখন তিনি আর উৎসাহ পাচ্ছেন না।
বাবু সাহেব কেমন আছেন
বাবু সাহেব কেমন আছেন?
হাসপাতালের বিছানায় বসে আসমানী চুল আঁচড়াচ্ছে। বেশ আয়োজন করেই আঁচড়াচ্ছে। বিছানার উপর স্ট্যান্ড লাগানো আয়না। নিজেকে দেখতে দেখতে চুল। আঁচড়ানো। আসমানী মনে হয় সাজগোজও করেছে। চোখে কাজল। কপালে টিপ। পরনের শাড়িটাও নতুন। মনে হচ্ছে না সে হাসপাতালে আছে। মনে হচ্ছে সে। নিজের বাড়িতেই বাস করছে। বিকেলে মহিলা সমিতিতে নাটক দেখতে যাবে। এটা তার প্রস্তুতি।
বাবু সাহেব আমার কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন? কেমন আছেন?
ভাল।
আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন আমার চুল কত লম্বা?
এখন লক্ষ্য করছি।
দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন।
ফরহাদ বসতে বসতে বলল, তুমি একা কেন?
তুমি আমাকে দেখতে আসছ এই জন্যে ইচ্ছা করে একা হয়েছি। বাবা আর নিশা ছিলেন তাদের জোর করে করে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। একজন আয়া ছিল বসিরের মা। তাকে বলেছি বিকেলে আসতে। আশা করি তুমি বিকেল পর্যন্ত থাকবে।
হ্যাঁ থাকব। শুধু বিকাল পর্যন্ত না যতক্ষণ আমাকে থাকতে দেয় ততক্ষণ থাকব।
রাতে চলে যাবে?
রাতেও যেতে চাচ্ছি না। হাসপাতালের লোকজন যদি অনুমতি দেয় তাহলে তোমার ঘরের সামনের বারান্দায় যে টুলটা আছে সেই টুলে শুয়ে থাকব। তুমি যতবার আমাকে ডাকবে ততবার আমি বাইরে থেকে জবাব দেব।
আসমানী হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, তুমি যে ভাবে কথা বললে তাতে মনে হচ্ছে তুমি সুনীলের কোন রোমান্টিক উপন্যাস থেকে উঠে এসেছ। আমি হচ্ছি নীরা। আমার অসুখ হয়েছে। নীরার অসুখ।
