আসমানীর বিয়ে হয় নি। তার অসুখের কারণে যে হয় নি তা-না। বিয়ে হয়নি কারণ আজ সকাল এগারোটা দশ মিনিটে ফরহাদের দাদাজান মারা গেছেন। মরা বাড়িতে বিয়ে হয় না।
বিদেশী টুরিস্টদের মত লাগছে
কামরুল ইসলাম সাহেবকে আজ বিদেশী টুরিস্টদের মত লাগছে। তাঁর গায়ে থাই সিল্কের ঢোলা সার্ট। সেই সার্ট লাল, নীল, সবুজ অনেক কটা রঙ। চোখে সানগ্লাস। গলায় ক্যামেরা ঝুললেই পুরোপুরি টুরিস্ট। তাঁর গা থেকে ভুর ভুর করে গন্ধও বের হচ্ছে। গাড়ির পেছনের সীটে তিনি গা এলিয়ে বসে আছেন। ফরহাদ তাঁর পাশে। গাড়ি এয়ারপোর্ট রোড ধরে চলছে। তিনি কোথায় যাচ্ছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ফরহাদ ভেবেছিল তাকে নিয়ে তিনি যাচ্ছেন, পিজিতে। আসমানী আছে পিজিতে। কিন্তু শাহবাগের মোড়ে এসে তিনি ড্রাইভারকে বললেন—এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে যাও। তারপরই ফরহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের এদিকে ভাল কফি শপ নেই তাই না।
ফরহাদ বলল, আমি ঠিক বলতে পারছি না।
আসমানী বলেছে নেই। আসমানী আর নিশাকে নিয়ে একবার কফি শপের সন্ধানে বের হয়েছিলাম।
পান নি?
কয়েকটি পেয়েছি। গুলশানের দিকে। তবে ঠিক কফি শপ না। ফাস্ট ফুডের দোকান। চা কফিও বিক্রি করে। সবগুলিই ইয়াং ছেলেমেয়েদের দখলে। আমার এমন কফি শপ দরকার যেখানে আমার মত বুড়ো মানুষও যেতে পারে।
আমরা কি এখন কোন কফি শপে যাচ্ছি?
হ্যাঁ। কিছু কথা আছে বাড়িতে নিরিবিলি বসে বলতে হয়। কিছু কথা আছে পার্কে হাঁটতে হাঁটতে বলতে হয়। আবার কিছু কথা আছে বলতে হয় ভীড়ের মধ্যে। কফি শপে কিংবা পাবে। তোমার চারপাশে লোজন থাকবে। তারা সবাই কথা বলবে। তুমিও বলবে। কেউ কারো কথা শুনবে না। জনতার মধ্যেই আছে নির্জনতা।
ফরহাদ কিছু বলল না। আসমানীর মামা তাকে বিশেষ কিছু কথা বলতে চান। সেই বিশেষ কথাগুলি কি সে ধরতে পারছে না। তিনি কি তাকে বলবেন, আসমানীর ভয়ংকর কোন অসুখ হয়েছে। এটা তাকে বলার দরকার নেই। এটা সে কারো সঙ্গে কথা না বলেও বুঝতে পারছে।
ফরহাদ?
জ্বি।
তোমার দাদাজানের মৃত্যুশোক তোমরা কি সামলে উঠেছ?
ফরহাদ বলল, জ্বি।
এখন কেউ কান্নাকাটি করছে না?
উনার বয়স হয়েছিল। মৃত্যু তার জন্যে প্রয়োজন ছিল। কেউ তেমন কান্নাকাটি করে নি।
তোমার খুব খারাপ সময় যাচ্ছে তাই না?
জ্বি।
শুনলাম যে বাড়িতে থাকতে সেই বাড়ি ছেড়ে দিতে হচ্ছে?
জ্বি।
যাচ্ছ কোথায়? নতুন বাসা ভাড়া করছ?
এখনো করি নি।
তোমার যে চাকরি নেই এটাও জানতাম না। এটা আমাকে বলা দরকার ছিল। আসমানী কি জানে?
জ্বি জানে।
এটা ভাল যে তাকে বলেছ। তার কাছে কিছু গোপন করনি। চাকরি যে নেই, সংসার কিভাবে চলবে না চলবে কিছু ভেবেছ?
জ্বি না।
যে ছেলে বিয়ে করবে তার কোন প্ল্যানিং থাকবে না? তোমার মার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। চমৎকার মহিলা। তিনি দুঃখ করে বলছিলেন তুমি যে বিয়ে করতে যাচ্ছ এই খবরটা তুমি তাঁকেও দাও নি। তোমার যে চাকরি নেই এটাও তিনি জানতেন না। তুমি একটা মেয়ের গভীর প্রেমে পড়েছ এটা খুবই ভাল কথা। যখন ঠিক করলে মেয়েটাকে তুমি বিয়ে করবে তখনই কিন্তু রেসপনসিবিলিটির ব্যাপারই চলে আসছে। আসছে না?
জ্বি।
সিনেমায় বা রোমান্টিক উপন্যাসে কপর্দকহীন ছেলে প্রেমিকাকে বিয়ে করে। তাদের কোন সমস্যা হয় না, তারা সুখেই সময় কাটায়। রিয়েল লাইফে তা হয় না। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে কল্পনা এবং বাস্তবের সীমারেখা সম্পর্কে তুমি জান না। তুমি পুরোপুরি কল্পনাতেও বাস করছ না, আবার বাস্তবেও বাস করছ না। দুয়ের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় বাস করছ। আমি নিজে যে ভুলটা করেছি সেটা হচ্ছে আসমানীর আবেগের মূল্য দিয়েছি। তোমার বিষয়ে কোনরকম খোঁজ খবর করার প্রয়োজন বোধ করি নি।
খোঁজ খবর করে সব জানলে বিয়েতে রাজি হতেন না?
রাজি হতাম। আসমানীর দিকে তাকিয়ে রাজি হতাম।
কফি শপ একটা পাওয়া গেল। কামরুল ইসলাম সাহেবের পছন্দ হল না। ছোট্ট জায়গা। ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বার্গার-ফার্গার খাচ্ছে। এদের দেখে মনে হচ্ছে এদের বাড়িতে রান্না হয় না। দোকানের বার্গারই একমাত্র ভরসা। কামরুল সাহেব বললেন, চল এক কাজ করা যাক কোন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসি।
ফরহাদ বলল চাইনিজ রেস্টুরেন্টে কফি পাওয়া যায় না।
চাইনিজ চা নিশ্চয়ই আছে। চল চা খেতে খেতে কথা বলি। এই এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেস্টুরেন্ট কোনটা?
আমি বলতে পারব না মামা। গুলশান বিত্তবান লোকদের এলাকা। আমি এদিকে আসি না।
চল খুঁজে বের করি। একটা পছন্দ না হলে আরেকটায় যাব। আসলে আজ আমার ঘুরতে ইচ্ছা করছে। কোন কোন দিন আসে যখন ঘরে থাকতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় সারাদিন ঘুরি। তাই না?
জ্বি।
আবার কোন কোন দিন আসে যখন ঘর থেকে বেরুতে ইচ্ছা করে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় দরজা জানালা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকি। মানুষ হয়ে জন্মানোর অনেক যন্ত্রণা আছে। ঠিক বলছি না ফরহাদ?
জ্বি।
আচ্ছা ধর তোমাকে একটা চয়েস দেয়া হল—তুমি মানুষ না হয়ে অন্য যে কোন পশুপাখি কীট পতঙ্গ হয়ে জন্মাতে পার। তুমি কি হতে চাইবে?
কামরুল সাহেব তাকিয়ে আছেন। কালো চশমার কাৰণে তার চোখ দেখা যাচ্ছে না, তবে তিনি যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তা বোঝা যাচ্ছে। ফরহাদ বুঝতে পারছে আসমানীর মামা অস্থির বোধ করছেন। অস্থির মানুষ নিজের অস্থিরতা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চায়। এই অস্থিরতা কি অসমানীর বিয়ে নিয়ে? না-কি আসমানীর অসুখ নিয়ে? চাইনিজ রেস্টুরেন্টের নিরিবিলিতে তিনি ফরহাদকে কি জিজ্ঞেস করবেন? সে পরের জন্মে কি হয়ে জন্মাতে চায়? না-কি উনি বলবেন—আসমানীর সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যাপারটা আপাতত স্থগিত। তুমি কোন ভদ্র চাকরি জোগাড় কর। বউকে নিয়ে কোথায় তুলবে সেই ব্যবস্থা কর। তারপর দেখা যাবে।
