নীরা কে?
নীরা হল সুনীলের চির প্রেমিকা। তোমার জন্যে সিগারেট আনিয়ে রেখেছি। আমার সামনে বসে আরাম করে একটা সিগারেট খাওতো।
হাসপাতালে রোগীর ঘরে বসে সিগারেট খাবো?
হ্যাঁ খাবে। কারণ আমি ছোট্ট একটা পরীক্ষা করতে চাই। আমার শরীরটা আজ কত ভাল সেই পরীক্ষা। যদি দেখি সিগারেটের গন্ধ সহ্য হচ্ছে—তাহলে বুঝব শরীর বেশ ভাল।
শরীর ভাল লাগছে?
হ্যাঁ ভাল লাগছে। আমি গান জানলে গুনগুন করে গান গাইতাম। আমি অবশ্যি গান না জানলেও গুনগুন করে গাই। সবচে বেশি কোন গানটা গাই জান? সবচে বেশী গাই–
ভালবেসে যদি সুখ নাহি
তবে কেন মিছে এ ভালবাসা।
আচ্ছা আমি কি খুব বকবক করছি?
ফরহাদ সিগারেট ধরাল। সে তাকিয়ে আছে আসমানীর দিকে। তাকে সামান্য রোগা লাগছে। চোখের কোণে কালি, সেই কালিও সামান্য। এছাড়া তার মধ্যে অসুস্থতার কোন চিহ্ন নেই। আসমানী বিছানার মাঝখন থেকে সরে এক পাশে চলে গেল। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল। হঠাৎ তাকে সামান্য ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ফরহাদ বলল, সিগারেটের গন্ধটা কি সহ্য হচ্ছে?
আসমানী বলল, না।
ফেলে দি?
না ফেলবে না। তুমি সিগারেট খাচ্ছ দেখতে ভাল লাগছে। আচ্ছা শোন আমার উচিত ছিল তোমার দাদাজান বিষয়ে কথা বলা। তোমাদের বাড়িতে একজন মানুষ মারা গেছে অথচ তা নিয়ে আমি কোন কথা বলিনি। আসলে ইচ্ছা করে বলি নি। তোমার সঙ্গে অপ্রিয় কোন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। আমি সারা জীবণু তোমার সঙ্গে সুখ নিয়ে কথা বলতে চাই।
ফরহাদ সিগারেট ফেলে দিল। আসমানী বলল, তোমাদের খুব দুঃসময় যাচ্ছে তাই না?
ফরহাদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
আগের বাড়িটা কি তোমরা ছেড়ে দিয়েছ?
আজ ছাড়ব।
তোমরা উঠবে কোথায়?
আমার একজন ছোটবোন আছে—-জাহানারা আপাতত তার বাড়িতে।
তুমি কোন রকম দুঃশ্চিন্তা করবে না। তোমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
কি ভাবে? কি ভাবে তা জানি না। কিন্তু হবে।
If winter comes can spring be far behind?
ফরহাদ হাসতে হাসতে বলল, সাহিত্যে অনেক সুন্দর সুন্দর কোটেশন আছে। কিন্তু পৃথিবীটা কোটেশন মত চলে না। পৃথিবী চলে তার নিজের নিয়মে। সেই নিয়মটা কি তাও আমরা ভালমত জানি না।
প্লীজ দার্শনিকের মত কথা বলবে না। অসহ্য লাগছে।
আচ্ছা বলব না।
আমার বড় মামা কি আমাদের বিয়ের ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলেছেন?
না।
আমার মনে হয় বলেছেন। তিনি এখন চান না যে বিয়েটা হোক। তিনি এখন বলছেন—বিয়ে হবে আমার অসুখ সারলে।
সেটাইতো ভাল।
সেটা মোটেই ভাল না; অসুখ সারার জন্যে অপেক্ষা করলে আর আমার বিয়ে হবে না। কারণ আমার অসুখ সারবে না।
সারবে না কেন?
সারবে না কারণ, অসুখটা ভয়ংকর। যদিও সবাই আমাকে বলছে রিউম্যাটিক ফিভার। আমি জানি ব্যাপারটা কি? জেনেও ভাণ করছি জানি না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমার সঙ্গে ভাণ করব না। কাজেই সত্যি কথা বললাম।
ফরহাদ চুপ করে গেছে। সে এখন আর আসমানীর দিকে তাকাচ্ছে না। তাকিয়ে আছে খোলা দরজার দিকে। আসমানী বলল, এই তুমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছ কেন? তুমি যতক্ষণ আমার সামনে থাকবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে।
ফরহাদ তাকাল। আসমানী বলল, এই তো ঠিক আছে। এখন মন দিয়ে আমার জরুরি কথাটা শোন—আমার অসুখ যত ভয়ংকরই হোক আমি একদিনের জন্যে হলেও তোমাকে বিয়ে করতে চাই। মামা এই বিয়ে হতে দেবে না। কাজেই তুমি যা করবে তা হচ্ছে কাজির অফিসে ব্যবস্থা করে রাখবে। আমি গোপনে উপস্থিত হব। বিয়ে শেষ হলে হাসপাতালে ফিরে এসে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকব। ঠিক আছে?
হ্যাঁ ঠিক আছে।
আচ্ছা শোন পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক তার প্রেমিকার চুল হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চায়। তুমি কখনো আমার চুল ছুঁয়ে দেখনি। নাও চুলগুলি ছুঁয়ে দেখ। কারণ বেশিদিন আমার মাথায় চুল থাকবে না। যখন কেমোথেরাপি শুরু হবে সব চুল পড়ে যাবে। নাও চুলে হাত দাও।
ফরহাদ ফুল স্পর্শ করল।
আসমানী হোট্ট করে নিশ্বাস ফেলে বলল, এখন তুমি চলে যাও।
চলে যাব।
হ্যাঁ চলে যাবে। কারণ তোমাকে দেখে আমার খুব খারাপ লাগছে। কষ্ট হচ্ছে, এবং কান্না পাচ্ছে। তুমি সারা জীবন আমার পাশে থাকবে না, ভাবতেও পারছি না। সত্যি সত্যি হয়তো কেঁদে ফেলব। আমাকে কাঁদতে দেখে তুমি কাঁদবে। পুরুষ মানুষের কান্না খুব বিশ্রী। প্লিজ তুমি বিদেয় হও। ফরহাদ অবিশ্বাসী গলায় বলল, বিদেয় হব।
হ্যাঁ বিদেয় হবে। আর শোন আমাকে বিয়ে করতে হবে না। এতক্ষণ তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম। যে মেয়ে কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার আবার বিয়ে কি? আচ্ছা বল তো আমাকে কি আজ সুন্দর লাগছে?
হ্যাঁ।
তোমার চোখে আমাকে যেন সুন্দর লাগে এই জন্যে সকাল থেকে সাজছি। কাজল দিয়েছি, মাশকারা দিয়েছি। গাল গোলাপী লাগছে না? রাসন দিয়েছি। আমার চেহারা অতি দ্রুত খারাপ হয়ে যাবে। আমি চাই না আমার সেই চেহারা তুমি দেখ। কাজেই এই তোমার আমাকে শেষ দেখা।
ফরহাদ তাকিয়ে আছে। আসমানী হাসছে। কী সুন্দর হাসি। এত সুন্দর করে একটা মেয়ে হাসে কি করে? তাছাড়া এখন কি তার হাসির সময়
আসমানী হাসি থামিয়ে বলল, আমার বাবা খুব দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। রাতে তার ঘুম হচ্ছে না। এই কদিনে তার ওজন এত কমেছে যে বলার না। কোনো প্যান্ট এখন পরতে পারেন না। ঢিলা হয়ে গেছে। বেল্ট লাগে। বাবাকে আজ দেখে খুবই মায়া লাগল। কথাবার্তাও এখন ঠিকমতো বলতে পারেন না। কথা আটকে যায়।
