বাথটাবের বাংলা কি মামা?
বাথটাবের বাংলা মানে? বাথটাবের বাংলা দিয়ে তুই কি করবি?
জানতে ইচ্ছা করছে।
এত জিনিস থাকতে বাথটাবের বাংলা জানতে ইচ্ছে করছে কেন?
তাওতো জানি না।
আমার মনে হয় জ্বরটা তোর মাথায় উঠে যাচ্ছে। জ্বর একবার মাথায় উঠলে আবোল তাবোল চিন্তা আসে।
মামা!
কি?
তুমি কি সিগারেটটা ফেলে দেবে। সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি সিগারেটের গন্ধে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি।
সিগারেটতো খাচ্ছি না।
ও আচ্ছা। মামা কটা বাজে?
সাড়ে সাতটা।
অনেকক্ষণ আগে একবার বললে সাড়ে সাতটা এখনো সাড়ে সাতটা?
সাতটা সাইত্রিশ।
এরমধ্যে মাত্র সাত মিনিট পরে হয়েছে?
তুই চুপ করে থাকতো। দেখি আমি মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করছি। কোন কথা না। একেবারে চুপ।
জ্বি আচ্ছা।
চোখ বন্ধ করে রাখ তাকিয়ে থাকিস না। তোর লাল চোখ দেখে ভয় লাগছে।
আসমানী চোখ বন্ধ করে আছে অথচ চোখ বন্ধ অবস্থায় সে সবাইকে দেখছে। এটা কি খুবই বিস্ময়কর ঘটনা না? মাথায় পানি ঢালছেন, মা। তিনি মাথার পেছনে, চোখ খোলা অবস্থায়ও তাঁকে দেখতে পাবার কথা না। মাছি হলে দেখতে পেত। মাছিদের মাথার পেছনেও চোখ থাকে। কিন্তু সে মাছি না হয়েও দেখতে পারছে। এটা কি একটা অদ্ভুত ঘটনা না? মা কি শাড়ি পরে আছেন তাও সে দেখতে পাচ্ছে। ব্লক প্রিন্টের শাড়ি। ডিজাইনটা চোখে লাগছে। আজ তাঁর মেয়ের বিয়ে তিনি এমন কুৎসিত ডিজাইনের শাড়ি পরেছেন কেন। তাঁকে বলতে হবে সুন্দর একটা শাড়ি পরতে। মেয়ের বিয়েতে সবচে বেশী সাজ করা উচিত মেয়ের মার।
আসমানীর ঘুম ঘুম পাচ্ছে। পানির শীতল ধারা চুলের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে পরছে-কি আরামই না লাগছে। ঘুমিয়ে পড়লে এই আরাম লাগবে না। জ্বরের ঘুম খুব কষ্টের ঘুম। ঘুমের মধ্যেও মাথার ভেতরটা জ্বালা করতে থাকে। আসমানীকে জেগে থাকতে হবে। আজ তার বিয়ে। কত কাজ পরে আছে। গোসল করে একটা হলুদ শাড়ি পরবে। হলুদ শাড়ি পরে ছবি তুলবে। অনেক অনেক দিন পর পুরানো এলবামে এই ছবি দেখে তার বড়মেয়ে বলবে—মা, গায়ে হলুদের দিন তোমাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছিল? তোমার কি তখন এত চুল ছিল?
হুঁ ছিল।
তোমাকে হলুদ পরীর মত লাগছে মা।
একদিন তোকেও এমন হলুদ পরীর মত লাগবে।
মাগো কি যে সুন্দর তোমাকে লাগছে। তবে মুখটা খুব রোগা।
তখন আমার খুব জ্বর ছিলরে মা।
জ্বর ছিল?
হ্যাঁ আকাশ পাতাল জ্বর। মাথায় পানি ঢালাঢালি। জ্বর নামানোর সবাই এত চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বর নামছে না।
আহারে। আমি থাকলে চট করে জ্বর নামিয়ে দিতাম।
কি ভাবে জ্বর নামাতি?
চুমু দিয়ে দিয়ে জ্বর নামাতাম। চোখে চুমু দিলে জ্বর নেমে যায়।
তোকে কে বলেছে।
কেউ বলেনি। আমি জানি।
আসমানী চোখ মেলল। তার মনে হল বাড়ি ভর্তি লোকজন। তাদের নিঃশ্বাসে ঘরের বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে আছে। এত মানুষ কোত্থেকে এল? সে ভালমত দেখার চেষ্টা করল। না লোকতো বেশী না। এইত বড় মামা। বড়মামার পাশে নিশা। কাজের বুয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে। মাথার পেছনে মা। বাবা এখনো ডাক্তার নিয়ে ফেরেন নি। তাহলে বাড়ি ভর্তি লোক মনে হচ্ছে কেন? আসমানী আবারো চোখ বন্ধ করল। ফরহাদকে মনে মনে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়।
এইযে বাবু সাহেব। আজ যে আপনার বিয়ে সেটা কি মনে আছে? না সব ভুল মেরে বসে আছেন? গায়ে হলুদের মাছ পাঠানোর কথা মনে আছে? দয়া করে কাতল মাছ পাঠাবেন না। আমি কাতল মাছ খাই না।
শুনুন বাবু সাহেব আমার শরীর খুব খারাপ করেছে। এখন আমার মাথায় পানি এবং জলপট্টি দেয়া হচ্ছে। আমার জ্বর কত উঠেছে শুনতে চান? একশ পাঁচ। কি সর্বনাশ তাই না? একশ পাঁচ হোক বা দশ হোক বিয়ে কিন্তু হবে। আপনার বাসর রাতটা কাটবে স্ত্রীর সেবা করে। পারবেন না?
আমাদের বাসরটা হাসপাতালে হলে কেমন হয়? হাসপাতালের ধবধবে শাদা বিছানায় আমি শুয়ে আছি। আমাকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। আর আপনি আমার পায়ের কাছে মুখ শুকনো করে বসে আছেন। ঘর ভর্তি স্যাভলনের গন্ধ। সবার হয় ফুলশয্যা আমাদের হবে স্যাভলন শয্যা। মজা হবে না?
আসমানী চোখ মেলল। সে অবাক হয়ে দেখল রাত হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার। দেয়ালে জিরো পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। সেই বাতির আলো নরম। ঘরটা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। বিজবিজ বিজবিজ শব্দ হচ্ছে। এসি চলছে না-কি? শব্দটা এসির আওয়াজের মত লাগছে। তাদের বাড়িতেতো এসি নেই। তাকে কি কোন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে?
হ্যাঁ ক্লিনিক বলেইতো মনে হচ্ছে। এইতো স্ট্যাণ্ডের সঙ্গে স্যালাইনের ব্যাগ ঝুলছে। তাকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। পায়ের কাছে একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে। নার্সটার চেহারা কোমল। নার্স এপ্রন পরে আছে। এনে তার নাম লেখা— রোকেয়া। এপ্রনের পকেটেই ষ্টেথিসকোপ। না তাহলে উনি নার্স না। নার্সরা এপ্রনের পকেটে স্টেথিসকোপ নিয়ে ঘুরেন না। ইনি ডাক্তার। ডাক্তার এগিয়ে আসছেন। তিনি আসমানীকে কি যেন বললেন। আসমানী পরিষ্কার শুনতে পেল না। এসির শব্দে ডাক্তার মেয়েটির কথা ঢাকা পরে গেছে। আসমানীর ইচ্ছা করছে তাকে জিজ্ঞেস করতে–আচ্ছা শুনুন, আজ আমার বিয়ে হবার কথা ছিল। বরযাত্রী এসেছে কি-না আপনি কি জানেন? যদি না জানেন একটু কি জেনে দেবেন? আমার আত্মীয় স্বজনরা নিশ্চয়ই আশে পাশেই আছেন। তাদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।
আসমানী কথা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কথা বলতে পারছে না। ডাক্তার মেয়েটি এগিয়ে এসে স্যালাইনের ব্যাগ নাড়াচাড়া করছে। আসমানী স্যালাইনের ব্যাপের দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
