রাহেলা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমরা থাকব কোথায়?
ফরহাদ জবাব দিল না। সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করল। রাহেলা ছেলেকে সিগারেট ধরাবার সুযোগ দিলেন। চলে গেলেন বাইরের বারান্দায়। এই বৃষ্টির মধ্যে জোবেদ আলি কোদাল হাতে বাগানে কি যেন করছেন।
রাহেলা শান্ত গলায় বললেন, তুমি কি করছ?
জোবেদ আলি বললেন, জমিতে পানি জমে গেছে। নালা কেটে দিচ্ছি। পানি হচ্ছে গাছের জীবন। এই পানি যদি একটু বেশী হয় তাহলে পানিই গাছের বিষ। আল্লাহপাকের কি অদ্ভুত ব্যবস্থা, এই বিষ এই অমৃত।
শর্মিলার বসার ঘরে ঢুকে নান্টু খুবই অবাক হল। শর্মিলা সেজেগুজে বসে আছে। তার কপালে লাল টিপ। পরনের সিল্কের শাড়িটা নতুন। শর্মিলার সামনে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। মধ্যবয়স্ক মানুষ। মনে হয় ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ধরেই আছেন। তাঁর সামনের এসট্রেতে পাঁচটা সিগারেটের শেষ অংশ। পাঁচটা সিগারেট, একটার পর একটা খেতেও তো পাঁচ গুণন তিন-পনেরো মিনিট লাগার কথা। তিনি নিশ্চয়ই কোন হাসির কথা বলেছেন—শর্মিলা হাসছে। নান্টুর মনে হল হুট করে ঘরে ঢুকে পরাটা তার ঠিক হয় নি। দরজা বন্ধ থাকলে সে কলিং বেল টিপে ঘরে ঢুকতো। দরজা ছিল ভেজানো হাত দিতেই খুলে গেল।
শর্মিলা হাসি বন্ধ করে নান্টুর দিকে তাকাল। তার ভুরু কুঁচকে আছে। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ। শর্মিলার সামনে বসা ভদ্রলোকও যেন কেমন করে তাকাচ্ছেন। নান্টু বলল, অর্ণব কেমন আছে। ওকে দেখতে এসেছি।
শর্মিলা উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এল নান্টুর দিকে। নান্টু বলল, অর্ণবের জ্বর কত?
ওর জ্বর কমেছে। ঘুমুচ্ছে।
দেখে যাই।
বললাম না ঘুমুচ্ছে। দেখে যাবে কি? সকালে এসো। সকালে এসে দেখে যেও।
জ্বর শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়েছে।
একটা কথা কতবার বলল, জ্বর এখন নেই। মার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে।
এসেছি যখন দেখে যাই।
মার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে। মাও ঘুমুচ্ছেন। বললাম না সকালে এসো।
নান্টু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শর্মিলা বলতে গেলে তাকে প্রায় তাড়িয়ে দিচ্ছে। সে এরকম করছে কেন? শর্মিলার সামনে যে ভদ্রলোক বসে আছেন সেই দ্রলোকের কি কোন ভূমিকা আছে? এই ভদ্রলোকের সামনে নান্টু থাকুক শর্মিলা তা চাচ্ছে না। যার ছেলে অসুস্থ সেই বা কেন এত সেজেগুজে বসে থাকবে? বিয়ে বাড়িতে বা জন্মদিনের নিমন্ত্রণে যাবার সাজও এটা না। তাহলে গায়ে গয়না থাকত। শর্মিলার হাতে কয়েক গাছা চুড়ি ছাড়া আর কিছু নেই।
নান্টু বলল, তোমার জন্যে রসমালাই এনেছিলাম।
শর্মিলা হাত বাড়িয়ে রসমালাইয়ের হাড়ি নিতে নিতে বলল, কাল পরশু এক সময় এসে অর্ণবকে দেখে যেও।
নান্টু দরজার দিকে এগুচ্ছে। পেছনে পেছনে আসছে শর্মিলা। মনে হচ্ছে নান্টুকে একেবারে ঘর থেকে বের করে, দরজা বন্ধ করে তারপর লোকের সঙ্গে গল্প করতে যাবে। নান্টুর মনে হল অর্ণবের জ্বর আসলে সারে নি। নান্টুকে তাড়াতাড়ি বিদেয় করার জন্যে জ্বর সেরে যাবার কথা বলেছে। নান্টু কি কোন একটা রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করবে? ভদ্রলোক চলে যাবার পর আবার গিয়ে খোঁজ নেবে?
খুব বৃষ্টি হচ্ছে। শর্মিলাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় প্রায় হাঁটু পানি। আশে পাশে কোন চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে না যেখানে বসে চা খেতে খেতে এই বাড়ির দিকে লক্ষ্য রাখা যায়। নান্টু পানি ভেঙ্গে এগুচ্ছে। যে ভদ্রলোক শর্মিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাঁর কি আজ এ বাড়িতে নিমন্ত্রণ? তিনি ফুল নিয়ে এসেছেন। টেবিলে গোলাপ ফুলের তোড়া। অতিথিরা আজকাল নিমন্ত্রণে ফুল নিয়ে আসেন। তার মত বেকুবরা যায় রসমালাইয়ের হাড়ি হাতে।
মেম্বর আলি একটি ভয়াবহ সত্য আবিষ্কার করলেন
মেম্বর আলি আজ সকালে একটি ভয়াবহ সত্য আবিষ্কার করলেন। তিনি চোখে একেবারেই দেখতে পারছেন না। একটা চোখ নষ্ট ছিল, সেই চোখে দিনেও দেখতে পেতেন না। অন্য চোখটা ভাল ছিল। ভাল চোখটায় দিনে দেখতে পেতেন। তিনি এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন, ঘোলাটে ধরনের ঝাপসা হলুদ আলো ছাড়া কিছু দেখছেন না। পুরোপুরি অন্ধ তিনি নিশ্চয়ই হননি—অন্ধ মানুষ অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখে না। তিনি হলুদ ধরণের আলো দেখছেন। খুব চিন্তিত হবার মত কিছু নিশ্চয়ই ঘটে নি। চোখের ডাক্তারের কাছে গেলেই হবে। মলম টলম দিয়ে দেবে। চোখে ছানি পড়লে ছানি কাটাবার ব্যবস্থা করবে। মেম্বর আলি ক্ষীণ গলায় ডাকলেন ফরহাদ ফরহাদ।
ফরহাদ ঘরে নেই মনে হয় উঠোনে। তাকে আরো শব্দ করে ডাকতে হবে। তিনি যে শব্দ করে ডাকতে পারেন না, তা না। ইচ্ছা করলেই একটা চিৎকারও দিতে পারেন। চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে না। আজ ফরহাদের বিয়ে। তিনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন না এমন একটা খবর দিয়ে বেচারার মন খারাপ করার দরকার কি? আজকের দিনটা পার হোক তারপর বললেই হবে। শুভ দিনে অশুভ সব দূরে রাখতে হয়। ফরহাদ নিজে অনেক কিছু নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় আছে। বেচারার দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়ে লাভ কি? চোখে দেখতে না পেলেও তার তেমন অসুবিধাওতো হচ্ছে না। তার দিন কাটছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। এমনতো না যে তাকে লেখাপড়ার কাজ করতে হবে। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করতে হবে।
তবে বাড়িতে নতুন বউ আসবে। নতুন বউ-এর মুখ দেখতে পারবেন না এটা খুব কষ্টের। দেখতে না পেলেও ভাব করতে হবে যেন দেখতে পাচ্ছেন।
নতুন বউ আসা পর্যন্ত তিনি এই বাড়িতে থাকতে পারবেন কি-না তাও বুঝতে পারছেন না। মনে হচ্ছে তাকে আজ মেয়ের বাড়িতে চলে যেতে হবে। জাহেদা এসে তাকে নিয়ে যাবে। সে রকমই না-কি কথা হয়েছে।
