নানান রকম কথা গত কয়েকদিন ধরে এ বাড়িতে হচ্ছে। তিনি সব কথা ধরতে পারছেন না। এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে এমন কথা তিনি অনেকবার শুনেছেন। কেন ছেড়ে দিতে হবে বুঝতে পারছেন না। কেউ তাকে কিছু বলছেও না। বাড়ি কে কিনে নিয়েছে বলে শুনেছেন। বাড়ি বিক্রি করা ঠিক না। দুটা জিনিস বিক্রি করা যায় না। যে বাড়িতে সাতদিন থাকা হয়েছে সেই বাড়ি এবং যে গয়না সাতদিন পরা হয়েছে সেই গয়না। তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলতে পারতেন। তাঁর কাছে কেউ পরামর্শ চাইতেও আসছে না।
কালরাতে ফরহাদের সঙ্গে কিছু কথা হয়েছে। অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি অভ্যাসমত বললেন, ফরহাদ জেগে আছিস?
ফরহাদ বলল, দাদাজান, বাথরুমে যাবেন?
না।
বিছানা নষ্ট হয়ে গেছে?
হুঁ।
দাঁড়ান চাদরটা বদলে দেই।
ফরহাদ চাদর বদলে দিল। তিনি বললেন, তোর জন্যে আমি খাস দিলে দোয়া করলামরে ব্যাটা। আসল দোয়া।
ফরহাদ বলল, ক্ষিধে লেগেছে। কিছু খাবেন?
না।
আমি আপনার জন্যে একটা বেদানা এনেছিলাম। ভেঙ্গে দেব?
দে।
ফরহাদ বেদানা ভেঙ্গে তাঁর হাতে দিচ্ছে। তিনি দুটা তিনটা করে দানা মুখে দিচ্ছেন। খুবই মিষ্টি বেদানা। ফল-ফ্রুট মানেই ভিটামিন। বুড়ো বয়সে ভিটামিন খুব কাজে আসে।
ফরহাদ বলল, কাল যে আমার বিয়ে এটা কি আপনি জানেন দাদাজান?
জানি। তুই বলেছিস।
খুবই গরীবি হালতে বিয়ে, হাত একেবারে খালি।
মেম্বর আলি শংকিত বোধ করলেন। ফরহাদ কি তার অভাব অনটনের কথা বলে তাঁর কাছে চন্দ্রহারটা চাচ্ছে? এত আদর করে বেদানা ভেঙ্গে খাওয়ানোর এটাই কি রহস্য? চন্দ্রহারটা দিয়ে দিলে তার থাকল কি? তার আজ যদি বড় কোন চিকিৎসার দরকার হয় টাকা পাবেন কোথায়?
দাদাজান।
হুঁ।
আপনি কয়েকটা দিন ফুপুর বাসায় থাকতে পারবেন না?
হুঁ।
নানান ঝামেলায় পড়েছি। সামলাতে পারছি না।
হুঁ।
ফুপু আপনাকে নিয়ে যাবে। আমি রোজ একবার আপনাকে দেখে আসব।
হুঁ।
আচ্ছা।
ফুপু আপনার জন্যে একটা ছেলে জোগাড় করেছেন যে সব সময় আপনার সঙ্গে থাকবে।
আচ্ছা।
বেদানাটা খেতে কেমন?
মিষ্টি।
আপনার যদি কখনো কিছু খেতে ইচ্ছা করে যে কাজের ছেলেটাকে ফুপু আপনার জন্যে ঠিক করেছে তাকে বলবেন। সে এনে দেবে। এর জন্যে ফুপুর কাছে টাকা চাওয়ার দরকার নেই। এই টাকাটা আপনার কাছে রাখেন। এখন বালিশের নিচে থাক। এক হাজার টাকা আছে। সব পঞ্চাশ টাকার নোট। দুইশ পঞ্চাশ টাকার নোট। ঠিক আছে দাদাজান?
হুঁ ঠিক আছে।
মেম্বর আলি মুখে ঠিক আছে বললেও হঠাৎ করে বুকে ধাক্কার মত বোধ করলেন। ফরহাদ কি তাকে জন্মের মত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ বাড়িতে আর কখনো ফিরিয়ে আনবে না? দু চারদিনের জন্যে পাঠালেতো এতগুলি টাকা দিত না।
এটা একটা বিয়ে বাড়ি।
বিয়ে বাড়ির কত রহস্য আছে। চারদিকে ব্যস্ততা থাকবে। ছোটাছুটি থাকবে। বাচ্চাদের কান্না থাকবে, হাসি থাকবে। মেয়েদের পরণের নতুন শাড়ির গন্ধ থাকবে, খিল খিল হাসি থাকবে। তার কিছুই নেই। সবাই মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে।
মেম্বর আলি তার দীর্ঘজীবনে অনেক বিয়ে দেখেছেন। আজকের বিয়েটা হয়ত তার দেখা শেষ বিয়ে। আর দেখা হবে না। অবশ্যি এই বিয়েটাতে তিনি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারবেন না। তার মেয়ে এসে তাকে নিয়ে যাবে। এছাড়া করার কিছু নেই। তিনি যে ঘরে থাকেন সেই ঘরে ফরহাদের বাসর হবে। ঘরটা ফুল টুল দিয়ে নিশ্চয়ই সাজানো হবে। আজকের দিনটা এ বাড়িতে থেকে যেতে পারলে ভাল হত। একটা রাত না হয় থাকলেন মঞ্জুর ঘরে। কিংবা বারান্দাতেও থাকতে পারেন। থাকার জন্যে বারান্দা খারাপ না। আলো বাতাস বেশী। এখনতো শীতকাল না, যে শীতে কষ্ট পাবেন।
মেম্বর আলির গায়ে রোদ পড়েছে। তিনি হাত বাড়িয়ে রোদ স্পর্শ করলেন। বন্ধ চোখ মেললেন, না রোদ দেখতে পাচ্ছেন না। এই পৃথিবীর অপূর্ব সব দৃশ্য আর তাঁকে দেখতে দেয়া হবে না। এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলি যিনি নেন, তিনি কেমন? মেম্বর আলির সামান্য শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এটা নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই। ঘরে অক্সিজেনের যন্ত্রপাতি আছে। ফরহাদকে বললেই সে নাকে লাগিয়ে দেবে। এখনই বলতে হবে এমন কোন কথা নেই।
এটা কি মাস? বাংলা মাসটা কি? বাংলা কোন মাসে ফরহাদের বিয়ে হচ্ছে তা জানা দরকার। তাঁর নিজের বিয়ে হয়েছিল আষাঢ় মাসে। কি বৃষ্টি কি বৃষ্টি। শত শত নাইয়রীতে বাড়ি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির মধ্যে শুরু হল প্যাক-খেলা। এ তাকে কাদায় ফেলে দিচ্ছে, ও একে ফেলছে। ধুন্দুমার কান্ড। তার বাবা খুবই রাগ। করলেন, চিঙ্কার দিয়ে বাড়ি মাথায় তুললেন-তোমরা করতাছ কি? তোমরার কি আক্কেল জ্ঞান নাই। মেয়েছেলে পুরুষ ছেলে সব প্যাক কাদায় গড়াগড়ি। মৌলভী বাড়ির ইজ্জত রাখবা না? তার কথা শেষ হবার আগেই তাঁর ছোটশালা পেছন থেকে তাঁকে ঝাপ্টে ধরে কাদায় ফেলে দিল। চারদিকে শুরু হল হাসি। এদিকে শুরু হয়েছে কাদার মধ্যে শালা-দুলাভাই যুদ্ধ। কাদা খেলা সারাগ্রামে। ছড়িয়ে পড়ল। কি অদ্ভুত পাগলামী। কনের বাড়িও গ্রামের মধ্যে। একজন কে বলে বসল, শইল্যে প্যাক-কেদা মাইখ্যা বরযাত্রী গেলে কেমুন হয়? কইন্যা পক্ষের উচিত শাস্তি হয়। আমরা গিয়া বলব—শইল্যে প্যাক-কেদা। প্যাক কাদা পরিষ্কারের জোগাড় কর। ভাল কাপড় দেও।
যেই কথা সেই কাজ। বরযাত্রী যাচ্ছে কাদায় মাখামাখি হয়ে। আহারে কি দিন STRUCS1
