কি ব্যবস্থা হবে?
নান্টু জবাব দিতে পারল না। কি ব্যবস্থা হবে তা সে নিজেও জানে না।
চাকরি গেল কেন? সে কি করেছিল?
কিছু করে নাই। জান দিয়ে খেটেছে। এই দেশে চাকরি হওয়ার জন্যে অনেক কারণ লাগে। চাকরি চলে যাবার জন্যে কোন কারণ লাগে না।
রাহেলা বললেন, ছেলের চাকরি নেই, এর মধ্যে তাকে বিয়ে করতে হচ্ছে। আমি তো বাবা কিছুই বুঝতে পারছি না।
বিয়ের তারিখ আগে থেকে ঠিক হয়েছিল, এর মধ্যে যে চাকরি চলে যাবে সে ভাবে নি।
তোমার বন্ধু কোন দিনই কোন কিছু ভাবে নি। তুমি বোস আমি মাগরেবের নামাজ পড়ে আসি।
নান্টু রাত আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। ফরহাদ ফিরল না। এর মধ্যে শুরু হল বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি। যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে সেই হারে হতে থাকলে রাস্তাঘাট ড়ুবে যেতে থাকবে। শর্মিলার বাড়ির সামনের রাস্তাটা তিন ফোটা বৃষ্টি হলেই ড়ুবে যায়। নান্টুকে এক্ষুণি বের হতে হবে। নয়ত অর্ণবের সঙ্গে দেখাই হবে না। কোন রিক্সা, কোন বেবীটেক্সি ঐদিকে যাবে না।
চাচী আমি আজ উঠি। আমার ছেলেটা অসুস্থ তাকে দেখতে যেতে হবে। আপনি ফরহাদকে বলবেন আমি অর্ণবকে দেখে ফেরার পথে সম্ভব হলে আবার আসব।
বৃষ্টির মধ্যে যাবে কি ভাবে?
কোন অসুবিধা হবে না। বাসায় কি ছাতা আছে? ছাতা থাকলে নিয়ে যাই।
ছাতা নেই। এই বাড়িতে এসে কখনো কিছু চেয়ো না। এটা হল নেই– বাড়ি। এই বাড়িতে কিছুই নেই।
নান্টু চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরহাদ ভিজে ন্যাতা ন্যাতা হয়ে উপস্থিত হল। তার সঙ্গে অনেক জিনিসপত্র। বিছানার চাদর, মশারি, বালিশ সবই ভিজেছে। জোবেদ আলি চিন্তিত মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ এই প্রবল বর্ষণ তাঁকে চিন্তায় ফেলেছে। জাপানী গাছটা আজ পুতেছেন আর আজই এমন বৃষ্টি। পানি জমে গেলে শিকর পঁচে যাবে তো।
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ফরহাদ জিজ্ঞেস করল, বাবা আমার কাছে কেউ এসেছিল?
জোবেদ আলি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, না। অথচ নান্টু তার সামনেই বাসায় এসেছে। বের হবার সময়ও তাঁর সঙ্গে কথা বলে বের হয়েছে। জোবেদ আলি ছেলের দিকে না তাকিয়েই বললেন, কি করা যায় বল দেখি?
কোন প্রসঙ্গে কি করা যায়?
বৃষ্টির কথা বলছি। তুই ঘরে যা ভিজে গেছিস।
বৃষ্টির কথা কি?
তুই যা ঘরে যা।
রাহেলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেকে লক্ষ্য করছেন। ছেলেকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে বেশ সহজ স্বাভাবিক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না তার কোন সমস্যা আছে। এইতো লুঙ্গি পরে কলতলায় চলে গেছে। বালতি ভর্তি করে পানি তুলছে।
মা গায়ে মাখার সাবানটা দিয়ে যাও তো।
রাহেলা সাবান নিয়ে গেলেন। গায়ে মাথায় সাবান মাখতে মাখতে ফরহাদ বলল, দাদাজান দুদিন ধরে আমলকি আমলকি করছেন। আজ আমলকি নিয়ে এসেছি। পলিথিনের একটা ব্যাগে আছে। কয়েকটা আমলকি লবণ দিয়ে দাদাজানকে দাও।
রাহেলা বললেন, আজ কি তোর কাছে কারোর আসার কথা ছিল?
ফরহাদ বলল, হ্যাঁ ছিল। আসমানীর মামা আসবেন বলেছিলেন। তিনি সিঁড়ি থেকে পরে পা মচকে ফেলেছেন। আসবেন না।
রাহেলা বললেন, তোর বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে?
ফরহাদ বলল, হ্যাঁ। মা তুমি ভিজছতো ঘরে চলে যাও। গোসল শেষ করেই আমি এক কাপ আদা চা খাব। মনে হচ্ছে আমার জ্বর আসছে।
জ্বরের মধ্যে গোসল করছিস কেন?
সারাদিন ঘুরেছি। গা ঘেমেছে। বিশ্রী লাগছে।
নান্টু এসেছিল। পরে আবার আসবে বলেছে।
ও আচ্ছা।
নান্টু বলেছিল তোর চাকরি নিয়ে কি সমস্যা না-কি হয়েছে।
ফরহাদ জবাব দিল না। মগের পর মগ পানি মাথায় ঢালতে লাগল। রাহেলা রান্নাঘরে চা বানাতে গেলেন। রান্নাঘরের খোলা দরজা দিয়ে কলঘর দেখা যায়। তিনি দেখতে পাচ্ছেন—ফরহাদ এক বালতি পানি শেষ করে আরেক বালতি পানি নিয়েছে। মগে করে পানি ঢালছে। অতি দ্রুত ঢালছে। সে আবারো পানি ভরছে। বৃষ্টির জোর আরো বেড়েছে।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফরহাদ বলল, চা-টা খুব ভাল হয়েছে মা।
রাহেলা বললেন, তোর কি জ্বর এসেছে?
আসব আসব করছিল এমন গোসল দিয়েছি যে পানি দিয়ে জ্বর ধুয়ে ফেলেছি।
ক্ষিধে লেগেছে, আজ রান্না কি?
শিং মাছের ঝোল।
ইলিশ মাছের ভাজা খেতে ইচ্ছা করছে। বৃষ্টিটা যদি কমে তাহলে একটা ইলিশ মাছ নিয়ে আসব।
এত রাতে মাছ পাবি?
ইলিশ মাছ রাত একটার সময় গেলেও পাওয়া যাবে। চা-টা সত্যি ভাল হয়েছে মা। দাদাজানকে এক কাপ বানিয়ে দাও।
রাহেলা অবাক হয়ে ছেলেকে দেখছেন। ফুল হাতা শার্ট গায়ে দিয়ে ভেতরের বারান্দায় চা খেতে বসেছে। চুল আঁচড়েছে। আরাম করে চা খাচ্ছে। তাকে দেখে কে বলবে তার কোন রকম সমস্যা আছে। সুখী সুখী চেহারা। রাহেলা বললেন, তোর বাবার কাছে শুনলাম এই শুক্রবারে না-কি তোর বিয়ে।
একটু পিছিয়েছে মা, রোববারে হবে। রোববার রাতে। বিয়ে মানে দুই তিনজনকে নিয়ে ওদের বাসায় যাব। কাজী সাহেব থাকবেন। কাগজে সই করে বাসায় চলে আসা।
আমি আজ সকালেই জানলাম।
তোমাকে বলা হয় নি। নানান ঝামেলার মধ্যে মাথা আউলা হয়ে আছে।
তোর চাকরি চলে গেছে?
হ্যাঁ। তবে এরচেয়েও বড় সমস্যা আছে।
এরচে বড় সমস্যা আবার কি?
ফরহাদ ছছাট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, রহমত উল্লাহ সাহেব সুইজারল্যান্ড থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিটা পড়ে দেখ। চিঠি পড়লেই বুঝবে সমস্যা কত প্রকার ও কি কি? চিঠিটা আমার টেবিলের উপর আছে। উনি এই বাড়ি জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। যাদের কাছে বিক্রি করেছেন তারা দখল নিতে আসবে। যে কোনদিন সব খালি করে দিতে হবে। বাবার জন্যেই আমার কষ্টটা বেশি হচ্ছে। শখ করে এত গাছ লাগিয়েছেন।
