বাগানটাতো খুব সুন্দর করে ফেলেছেন। আমাকে চিনতে পেরেছেনতো আমি নান্টু।
হ্যাঁ চিনেছি। ঘরে গিয়ে বোস। ফরহাদ অবশ্যি বাসায় নেই সকালে বের হয়েছে এখনো ফিরেনি।
তার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে আজ বাসায় লোকজন আসার কথা না?
হুঁ।
আমি এই জন্যেই এসেছি।
ভাল করেছ। ঘরে গিয়ে বোস আমি আসছি। হাতের কাজটা শেষ করে আসি।
গাছ লাগাচ্ছেন?
হ্যাঁ।
আপনার বাগানে কি মশলার গাছ আছে? দারুচিনি, লবঙ্গ?
অবশ্যই আছে। দারুচিনি গাছ আছে দুটা। লবঙ্গ গাছ আছে চারটা। একটা এলাচ গাছ আছে। ছোট এলাচ না বড়টা।
এলাচ হয়?
এখনো জানি না। বাবা তুমি এভাবে বাগানে হাঁটাহাটি করবে না। গাছ মেরে ফেলবে। তুমি ঘরে গিয়ে বোস। চা খাও।
আপনার সঙ্গে একটু গল্প করি।
আমি কাজের সময় গল্প করি না। তুমি ঘরে গিয়ে বোস। আমি আসছি।
নান্টু ইস্ত্রী করা পায়জামা পাঞ্জাবী পরে এসেছে। বিয়ের কথাবার্তা হবে পরনে ভাল কাপড় থাকা দরকার। নান্টুর মুখ হাসি হাসি হলেও তার মন সাংঘাতিক খারাপ। মন খারাপের দুটি বড় কারণের একটা হচ্ছে—অর্ণবের জ্বর। ময়মনসিংহ থেকে সে জ্বর নিয়ে ফিরেছে। শর্মিলার কাছ থেকে টেলিফোনে এর বেশী কিছু জানা যায় নি। কত জ্বর? ডাক্তার এসেছে কি-না এইসব কিছু জানার আগেই শর্মিলা বলল— টেলিফোন একবার ধরলেতো তুমি ছাড়তে চাও না। এখন তোমার সঙ্গে বকবক করতে পারব না। রাখি কেমন? বলেই সে টেলিফোন রেখে দিল। এরপরে নান্টু খুব কম হলেও একশবার টেলিফোন করেছে। কেউ রিসিভার তুলেনি। শুধুই এনগেজড টোন। নান্টুর ধারণা শর্মিলা লাইন খুলে রেখেছে।
বিয়ের আলাপটা শেষ হলেই নান্টু ছেলেকে দেখতে যাবে। আলাপ কখন শেষ হয় সেটাই হল কথা। বিয়ের আলাপ হল রবারের মত শুধুই লম্বা হয়। রবার লম্বা হতে হতে এক সময় ছিঁড়ে যায়, বিয়ের আলাপ ছেড়ে না। লম্বা হতেই থাকে, হতেই থাকে।
ছেলের অসুস্থতা ছাড়াও অন্য একটা ব্যাপারে নান্টুর মন খারাপ। সে ছশ টাকা এডভান্স দিয়েছিল এফডিসি গেট থেকে একজন চেহারার মহিলা এবং দুটা বাচ্চা ভাড়া করে আনতে। কথা পাকা হয়েছিল। সকাল আটটা থেকে তারা অফিসের সামনে চায়ের দোকানে বসে থাকবে। নান্টু অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবে। অন্যরাও তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে চায়ের দোকানে আসবে। কেউই আসে নি। অন্যরা আসেনি তার যুক্তি আছে। চাকরি ফেরত পেয়েছে আন্দোলনের আর দরকার কি? কিন্তু তার কাছ থেকে যে এডভান্স ছয়শ টাকা নিয়ে গেছে সেই লোকজন কোথায়? ঠগবাজদের যন্ত্রণায় মনে হয় এই দেশে বাস করা যাবে না হারামজাদা দালালটার কত বড় বড় কথা—একদিনের বাচ্চা চাইলে একদিনের বাচ্চা পাবেন। নাড়ি কাটা হয় নাই এমন বাচ্চা চান? তাও পাবেন। ফিলমের লাইন বলে কথা। বাঘের দুধ অনেকেই জোগাড় করতে পারবে। ফিলমের লোক বাঘের দুধ থেকে সর তুলে সেই সরে ঘি বানিয়ে নিয়ে আসবে। বাঘের ঘি কোন ব্যাপার না। আপনি চাইলে তিনশ গ্রাম বাঘের ঘি দিয়ে যাব। খেয়ে দাম দিবেন।
চাকরি চলে গেছে তাতে নান্টু যতটা মন খারাপ করেছে তারচে বেশী মন খারাপ করেছে একটা লোক তাকে বোকা বানিয়ে ছয়শ টাকা হাতিয়ে নিয়ে চলে গেছে এই দুঃখে।
ঘরে কাজের লোক নেই। রাহেলা নিজেই চা বানিয়ে নিয়ে গেলেন। দু কাপ চা। তাঁর নিজের জন্যেও এক কাপ চা খেতে খেতে তিনি কিছুক্ষণ গল্প করবেন। ভেতরের কোন খবর বের করা যায় কি-না। নান্টু ছেলেটা ফরহাদের বেশ ভাল বন্ধু। ফরহাদ মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে রাত কাটাতে যায়। বিয়ে টিয়ে নিয়ে ফরহাদ নিশ্চয়ই বন্ধুর সঙ্গে অনেক গল্প করেছে।
কেমন আছ বাবা?
নান্টু ওঠে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করল। রাহেলা খুশি হলেন। এই ছেলের সঙ্গে তার যতবার দেখা হয়েছে সে পা ছুঁয়ে সালাম করেছে। তাঁর নিজের দুই ছেলে ঈদের দিনেও সালাম করে না। একজনতো ঈদের নামাজই পড়ে না।
নান্টু বলল, ফরহাদ আজ বিকেলে আমাকে আসতে বলেছে। বিয়ের আলাপ হবে। ফরহাদ গেছে কোথায় জানেন?
রাহেলা বললেন, বাবা আমি কিছুই জানি না। আমার ছেলে যে বিয়ে করছে এটাও জানতাম না। আজ সকালে জানলাম।
আপনি কিছু জানতেন না?
না। পছন্দের মেয়ে আছে, বিয়ে করবে খুব ভাল কথা। আমাকে বলতেতো অসুবিধা নেই। আমি কি বলব—এই মেয়ে বিয়ে করিস না। আমার হাতে ভাল মেয়ে আছে। বাপ মা যখন ছেলের দয়ার উপর বাস করে তখন ছেলের কথাই তাদের কথা। ছেলে যদি বলে, উত্তর তারাও বলবে, উত্তর। ছেলে যদি বলে দক্ষিণ, তারাও বলবে, দক্ষিণ।
নান্টু চায়ের কাপ চুমুক দিতে দিতে বলল, ফরহাদের মন খুব খারাপ। বিরাট ঝামেলার মধ্যে পড়েছে। বয়স অল্প। মাথা ঠিক রাখতে পারছে না।
রাহেলা অবাক হয়ে বললেন, কি ঝামেলা?
চাকরির ঝামেলাটার কথা বলছি।
চাকরির কি ঝামেলা?
ঐ যে চাকরিটা চলে গেল।
রাহেলা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। এই ছেলে কি বলছে। ফরহাদের চাকরি চলে গেছে মানে কি? চাকরি না থাকলে চলবে কি ভাবে। রাহেলার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
চাকরি কবে গেল?
অর্ডার হয়েছে এই মাসের চার তারিখ।
ও।
রাহেলার মাথা ঝিমঝিম করছে, ছেলের চাকরি নেই, সে বিয়ে করছে। গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াচ্ছে এর মানে কি?
চাচী ফরহাদের যে চাকরি নেই আপনি জানতেন না?
না বাবা জানতাম না। সে কাউকেই কিছু বলে নাই। তোমার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম।
চাচী আপনি এটা নিয়ে মোটেই দুঃশ্চিন্তা করবেন না। একটা কিছু ব্যবস্থা ইনশাল্লাহ হবেই।
