বৌমা ও বৌমা।
রাহেলা মুখ অন্ধকার করে শ্বশুরের ঘরে ঢুকলেন। মেম্বর আলি বললেন, আমলকি খাব বৌমা।
কি খাবেন?
আমলকি।
রাহেলা তিক্ত গলায় বললেন—আব্বা শুনুন আপনিতো বেহেশতে বাস করছেন যে কোন একটা ফল খেতে ইচ্ছা করল মুখ দিয়ে বললেন, অমি ফলটা এসে মুখের সামনে ঝুলতে থাকল। আমলকি এখন পাব কোথায়?
লবণ দিয়ে একটা আমলকি খেলে মুখে স্বাদটা ফিরে।
বুড়ো মানুষের মুখে এত স্বাদ হওয়া ভাল না। স্বাদ হলে দুনিয়ার কুপথ্য করবেন আর পেট নামবে।
মঞ্জু বাসায় আছে না? তার কথা শুনলাম।
হ্যাঁ আছে।
মঞ্জুকে বলে দাও। এখন কার্তিক মাস, আমলকির সিজন।
আব্বা শুনুন, আপনার বয়স হয়েছে, শরীর ভাল না। আপনি আল্লাহখোদার নাম নেন। তসবি পড়ার মত আমলকি আমলকি করছেন কেন? আমলকির মধ্যে আছে টা কি?
আমলকি স্বাদ বর্ধক। আমলকি, জলপাই দুইটাই কার্তিকের ফল, দুইটাই স্বাদ বর্ধক। মা মঞ্জুকে জলপাইও আনতে বল। একটা কাগজে লিখে দাও। লিখে দিলে মনে থাকবে না।
আচ্ছা যান বলব।
লেবু চা একটু দিতে পারবে মা?
ঘরে লেবু নাই।
লেবু না থাকলে রং চা দাও। বৃদ্ধ মানুষের জন্যে রং চা মহৌষধ।
রাহেলা বললেন, চা দিচ্ছি। আব্বা আপনাকে একটা কথা বলি একটু মন দিয়ে শুনুন।
মা তোমার সব কথা আমি মন দিয়ে শুনি।
এটা একটু বেশি মন দিয়ে শুনুন। আপনার বয়স হয়েছে। এই বয়সে খুব ভাল সেবা দরকার। আপনি আপনার মেয়ের কাছে কয়েকটা দিন থেকে আসেন।
এইখানে আমার সেবা হচ্ছে না তোমাকে কে বলল? এরচে বেশি সেবা কে আমাকে করবে? রাতে যতবার ঘুম ভাঙ্গে, আমি বিছানায় নড়াচড়া করতেই তোমার ছেলে ফরহাদ লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। মশারী তুলে জিজ্ঞেস করে, দাদাজান কি হয়েছে? এরচে বেশিতে ফেরশতাও করবে না।
ফরহাদতো আর সারাজীবন আপনাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাবেনা। ও বিয়ে করবে। সে তার সংসার দেখবে।
মেম্বর আলি হাসি মুখে বললেন, সে সংসার দেখবে, সংসারের ফাঁকে ফাঁকে আমাকেও দেখবে। যে দেখতে পারে সে সংসারে থেকেও দেখতে পারে।
রাহেলা চা বানাতে রান্নাঘরে ঢুকলেন। তাঁকে বিস্মিত করে দিয়ে মঞ্জুও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরে ঢুকল। মঞ্জু তার নিজের ঘর আর এ বাড়ির বারান্দা ছাড়া কোথাও যায় না। রান্নাঘরে সে কখনো উঁকি দিয়েছে বলে তিনি মনে করতে পারছেন না। রাহেলা বললেন, কি আরেক কাপ চা খাবি?
মঞ্জু বলল, চা খাব না। মা শোন এই পঞ্চাশটা টাকা রাখ, দাদাজান আমলকি খেতে চাচ্ছে তাকে আমলকি এনে খাইও। আর সাথে এই টাকাটা রাখ সংসারের খরচ। এখন থেকে মাসের এক দুই তারিখে আমি যা পারি দেব।
রাহেলা আনন্দিত গলায় বললেন, এখানে কত টাকা?
দুই হাজার।
রাহেলা টাকাটা হাতে নিয়েই শুনতে শুরু করলেন। সব একশ টাকার নতুন নোট। একটার গায়ে একটা লেগে আছে। গুনতে কষ্ট হচ্ছে। পৃথিবীর সবচে আনন্দময় কষ্টের একটা কষ্ট হচ্ছে টাকা গোনার কষ্ট। একটু আগে মঞ্জু যে খারাপ ব্যবহার তাঁর সঙ্গে করেছে তার কিছুই এখন রাহেলার মনে নেই। ছেলের প্রতি মমতায় তাঁর হৃদয় এখন আদ্র। তার মন বলছে এই ছেলে ফরহাদের মত পুতু পুতু করে জীবন শুরু করবে না, সে মাথা শক্ত করে উঠে দাঁড়াবে। এই ছেলের টাকা পয়সা হবে। ঘর বাড়ি হবে। গাড়ি হবে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় ব্যাপার এই ছেলের বেলা কখনো ঘটবে না। শক্ত ধরনের ছেলে। বর্তমান সময় হল কঠিন সময় এই কঠিন সময়ে শক্ত ধরনের ছেলেপুলে দরকার। মিনমিনে মেয়ে টাইপ ছেলেদের যোগ শেষ হয়েছে।
গাছ লাগাবার জন্যে সবচে ভাল সময় হচ্ছে বিকাল। রোদ থাকে না। মাটি ভাল করে তৈরী করে চারা পুতে দিতে দিতেই সন্ধ্যা নামে, সন্ধ্যার পরই নামে রাত। রাতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় নতুন লাগানো গাছে শান্তির পরশ পরে। রাতে শিশিরে মাটি ভিজে থাকে। গাছের গায়ে সেই শিশির জমে। গাছের জন্যে যা খুবই প্রয়োজন।
জোবেদ আলি এমন এক মহেন্দ্রক্ষণে এরিকা জাপানিকা গাছের চারা লাগালেন। চল্লিশ টাকা দিয়ে তিনি একটা বাঁশ কিনে এনেছিলেন। বাঁশ কেটে গাছের চারদিকে বেড়া দিয়ে দিলেন। লোকজন ছাগলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে গাছ বেড়া দেয়। তিনি দিচ্ছেন তার ছেলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে। তাঁর মন বলছে মঞ্জু এই গাছটাও পাড়িয়ে মেরে ফেলবে।
গাছটা মনে হচ্ছে বেঁচে যাবে। জোবেদ আলি গাছের জীবন রক্ষার জন্যে দীর্ঘ প্রার্থনা করলেন। প্রার্থনার মাঝখানে বাঁধা পড়ল, তিনি দেখলেন, গেট খুলে নান্টু ঢুকছে। যে কেউ বাগানে ঢুকলে তিনি কিছুটা শংকিত বোধ করেন, এই বুঝি সে কোন চারার উপর দাঁড়িয়ে পড়ল। এই বুঝি হাত বাড়িয়ে গাছের কোন পাতা ছিঁড়ল। মানুষের এই এক বিচিত্র অভ্যাস, গাছ দেখলেই পাতা ছিঁড়ে গন্ধ শোঁকা। গন্ধ যদি কতেই হয় পাতা না ছিঁড়েও তো শোকা যায়। এমনোতো হতে পারতো যে গাছরা মানুষের স্বভাব পেয়েছে। কোন মানুষ যাচ্ছে গাছের নিচ দিয়ে। গাছটা টান দিয়ে মানুষের একটা হাত ছিঁড়ে ফেলল গন্ধ শোঁকার জন্যে। তখন কেমন হত? মানুষ এমন অকৃতজ্ঞ। কোন মানুষকি পারে তার নিজের ছেলেমেয়ে অন্যকে বিলিয়ে দিতে। কিন্তু গাছতত পারছে। সে তার সব ফল দিয়ে দিচ্ছে। ফলগুলি গাছের সন্তান ছাড়া আর কি?
চাচাজান কেমন আছেন?
জোবেদ আলি বললেন, ভাল। তাঁর খুবই অস্বস্থি লাগছে কারণ নান্টু ছেলেটা হেলতে দুলতে বাগানের ভেতর দিয়ে তাঁর কাছে আসছে। মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটলেও একটা কথা ছিল তিনি বুঝতেন যে সে দেখেশুনে হাঁটবে। চাড়া মাড়িয়ে দেবে না।
