রাহেলা চা নিয়ে মঞ্জুর ঘরে ঢুকে দেখেন তার শেভ করা হয়ে গেছে। সে সিগারেট ধরিয়েছে। মাকে দেখে সে বিরক্ত মুখে সিগারেট জানালা দিয়ে ফেলে দিল। রাহেলা ছেলের এই বিরক্তি ক্ষমা করে দিলেন। দামী একটা সিগারেট, দুটা টান দিয়ে ফেলে দিতে বিরক্তি লাগবেই। তিনি যদি সিগারেট খেতেন, তিনিও বিরক্ত হতেন। রাহেলা বললেন, মঞ্জু চা নে।
চা-তো আমি চাই নি।
মঞ্জু বিরক্ত মুখে চায়ের কাপ হাতে নিল। রাহেলা ছেলের সামনে বসতে বসতে বললেন, ফরহাদ বিয়ে করছে ভাল কথা। বিয়ের বয়স হয়েছে। পাত্রী ঠিক আছে। অসুবিধা কি? সে যদি ভেবে থাকে বিয়েটা সম্পূর্ণ তার নিজের ব্যাপার, কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, তাহলেও ঠিক আছে।
ঠিক থাকলে তোমার এত কথার দরকার কি?
বিয়ে যে করছে, বউ নিয়ে সে থাকবে কোন ঘরে? তুই কি তোর দাদাজানকে তোর ঘরে রাখবি?
না।
তাহলে তোর দাদাজান থাকবে কোথায়?
ভাইয়া নিশ্চয়ই কোন ব্যবস্থা করবে।
কি ব্যবস্থা করবে?
নতুন বাসা ভাড়া করে ভাবীকে নিয়ে উঠবে।
তোকে বলেছে?
না আমাকে কিছু বলে নি। তুমি ভাল করেই জান ভাইয়ার সঙ্গে বসে আমি খেজুরে আলাপ করি না।
আজ সন্ধ্যায় তাহলে মেয়ে পক্ষের লোকজন আসবে?
হ্যাঁ।
তুই থাকবি বাসায়?
আমি বলতে পারছি না। আমার কাজ আছে। কাজ শেষ করতে পারলে চলে আসব।
কি কাজ?
কি কাজ বললে তুমি বুঝবে?
তুই কি চাকরি বাকরি কিছু পেয়েছিস?
চাকরি পাব কোথায়? বাংলাদেশে চাকরি আছে? ব্যবসা করার চেষ্টা করছি।
ব্যবসা করতেও তো টাকা লাগে। টাকা পাবি কোথায়?
সব ব্যবসায় টাকা লাগে না। বাংলাদেশের বেশীর ভাগ ব্যবসাই বিনা টাকার ব্যবসা। এখনকার ব্যবসায় যে জিনিসটা লাগে তার নাম বুদ্ধি।
তোর ধারণা তোর অনেক বুদ্ধি?
হ্যাঁ আমার বুদ্ধি খারাপ না। এখন তুমি যাও আমি সিগারেট খাব।
ব্যবসা ট্যাবসার ব্যাপারে জামাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারিস। ব্যবসার ব্যাপার ওরা ভাল বুঝে।
মঞ্জু সিগারেটের প্যাকেটে হাত দিল। হাতে সিগারেটের প্যাকেট দেখে যদি রাহেলা তাকে মুক্তি দেন। রাহেলা ছেলেকে মুক্তি দিলেন। বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। মেয়ের কাছে যাবেন কি-না বুঝতে পারছেন না। সংসারে সমস্যা হওয়া শুরু হয়েছে। এইসব সমস্যা নিয়ে মেয়ের সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় আলাপ করতে হবে। সব শুনলে জাহানারা তাঁর উপর খুবই রাগ করবে। জাহানারা ধরেই নিবে মার কারণে সংসারে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। রাণীর সঙ্গে বিয়েটা হচ্ছে না কেন এই জবাবদিহিও রাহেলাকেই করতে হবে। অথচ তিনি ধরেই নিয়েছিলেন রাণীর সঙ্গে ফরহাদের বিয়েটা তিনি দিতে পারবেন। দিন রাত ভেবে সূক্ষ্ম কিছু পরিকল্পনাও তিনি করেছিলেন। এ জাতীয় পরিকল্পনা অতীতেও তিনি করেছেন। তখন কাজ করেছে। জাহানারার বিয়েতে তিনি এইভাবেই দিলেন। জাহানারা পালিয়ে গিয়ে যে ছেলেকে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছিল, সেই বিয়ে তিনি হতে দেননি। তার ফল শুভ হয়েছে।
রাহেলা মনে হল আজই মেয়েকে কিছু জানানো ঠিক হবে না। বিয়ের কথা হলেই যে বিয়ে হয়ে যাবে এমনতো না। চল্লিশ জায়গায় বিয়ের কথা হয়, কিন্তু বিয়ে চল্লিশ জায়গায় হয় না। বিয়ে এক জায়গাতেই হয়। তাঁর মন বলছে ফরহাদের বিয়ে রাণীর সঙ্গে হবে। তিনি ভোর রাতে এরকম একটা স্বপ্ন দেখেছেন। বউ সেজে রাণী তাঁর ঘরে ঢুকেছে। তার গা ভর্তি গয়না, পরনে লাল টুকটুকু শাড়ি। তাকে সালাম করতে করতে বলেছে—আপনাকে এত দিন মাঐ মা ডেকেছি, আজ হঠাৎ মা ডাকতে পারব না। আপনি কিন্তু কিছু মনে করতে পারবেন না।
ফজরের নামাজের স্বপ্ন ভুল হবার কথা না। চাঁদের হিসাবটা দেখতে হবে। শুক্লা পক্ষের চাঁদ হলে স্বপ্ন মিলে যাবে। কৃষ্ণপক্ষ হলে মিলতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে।
আজ সন্ধ্যাবেলায় মেয়ে পক্ষের লোকজন কথা বলতে আসবে। তাদের সঙ্গে মুরুব্বী মহিলাও নিশ্চয়ই থাকবেন। বিয়ের আলাপে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারা সব সময় আসেন। মহিলারা আসেন ভেতরের খবর বের করার জন্যে। সেই মহিলাকে ভেতরের খবর তিনি সবই দেবেন। কিছুই লুকাবেন না। এক ছেলের হাতে পুরো সংসার। অসুস্থ বৃদ্ধ একজন মানুষ আছে। ঢাকা শহরে নিজেদের বাড়ি ঘর বলতে কিছু নেই। অন্যের বাড়িতে পাহারাদার হিসেবে থাকা। যে কোন সময় তারা বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে। তখন যেতে হবে গাছ তলায়। দেশের বাড়িতে গিয়ে যে থাকবে সেই উপায়ও নেই। দেশে ভিটা বাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। সেই বাড়িতে কেউ থাকে না। ঘর-দোয়ার ভেঙ্গে পড়েছে। চারদিকে জংলা, সাপ খোপের আচ্ছা।
বৌমা আছ বৌমা।
রাহেলা বিরক্ত মুখে ফরহাদের ঘরের দিকে তাকালেন। মেম্বর আলির আজ জ্বর এসেছে। কত জ্বর বোঝা যাচ্ছে না। থার্মোমিটার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাউকে দিয়ে যে থার্মোমিটার কিনে আনাবেন তাও সম্ভব না। কাজের মেয়েটা ছুটিতে গিয়েছে। মঞ্জুকে বললে লাভ হবে না। তবু বলে দেখা যেতে পারে। নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকা। কেউ যেন বলতে না পারে—শ্বশুরের জ্বর হয়েছে একটা থার্মোমিটার আনিয়ে জ্বরটা যে মাপবে তাও করেনি। তবে এক্ষুণী মঞ্জুর ঘরে ঢুকে কিছু বলার দরকার নেই। তাঁকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই মঞ্জু দপ করে জ্বলে উঠবে। তার দরকার কি। গাল বাড়ালেই যদি চড় খেতে হয় তাহলে গাল বাড়ানো কেন? একসময় না একসময় মঞ্জু ঘর থেকে বের হবে। বের হবার মুখে বললেই হবে।
