আসমানী খিল খিল করে হাসছে। তাকে দেখতে আসলেই সুন্দর লাগছে। শাদা শাড়িতে তাকে মেঘ কন্যা বলে মনে হচ্ছে।
আসমানীর হাতে শাদা লেখা কাগজের টুকরোটা এখনো ধরা। সে এই কাগজ ফেলে দেবে না। কোন এক ফাঁকে চট করে তার হ্যান্ড ব্যাগে লুকিয়ে ফেলবে। মেয়েরা স্মৃতি সংগ্রহ করতে খুব পছন্দ করে।
রাহেলা খুবই অবাক হয়েছেন
রাহেলা খুবই অবাক হয়েছেন এই শুক্রবারে তাঁর ছেলের বিয়ে অথচ তিনি কিছু জানেন না। শুক্রবার মানেতো আগামী কাল। এমন একটা খবর তাঁকে অন্যের কাছ থেকে শুনতে হল? তিনি কি এতই তুচ্ছ, এতই নগন্য? রাহেলা খবরটা কিছুক্ষণ আগে শুনেছেন। চা খেতে খেতে জোবেদ আলি মনের ভুলে বলে ফেললেন, ঘর দোয়ার একটু গুছাতে হয়। নতুন বৌ আসছে। তোমার কাছে টাকা পয়সা কিছু আছে? টুকটাক কিছু ইলেকট্রিকের কাজ করা দরকার। বারান্দার বাতি জ্বলে না, বাথরুমের বাতি জ্বলে না। ভাবছি বাগানেও একটা একশ পাওয়ারের বাত্ব frie i
রাহেলা বললেন, বিড়বিড় করে নিজের মনে কি বলছ?
জোবেদ আলি শংকিত গলায় বললেন, কিছু বলছিনাতো।
নতুন বৌ আসছে মানে কি?
জোবেদ আলিকে মূল ঘটনা প্রকাশ করতে হল। সকাল বেলার চা-টা তিনি আগ্রহ করে খান। চা খাওয়ার মাঝখানে একি বিপত্তি? এরিকা জাপানিকার চারা কিনেছেন। চারা লাগাবার জন্যে জমি তৈরী করতে হবে। পঁচা গোবরের সন্ধানে যেতে হবে। রাহেলার প্যাচে পড়লে বের হওয়া যাবে না।
রাহেলা বললেন, ফরহাদ বিয়ে করছে?
জোবেদ আলি বললেন, হুঁ।
সব ঠিকঠাক?
ঠিকঠাক না হলে বিয়ে হবে কি ভাবে?
আমি জানলাম না কেন?
তোমাকে বলার সুযোগ পায় নি।
তোমাকেতো ঠিকই বলার সুযোগ পেয়েছে, আমাকে পায় নি কেন?
তোমার ঘুমের সমস্যা তুমি সকাল সকাল শুয়ে পড়—তারপর ধর ইয়ে…কি যেন বলে…
বিড়বিড় করবে না। বিড়বিড় বন্ধ কর।
জোবেদ আলি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, রাহেলা তুমি স্বভাব চরিত্র বদলাও। নতুন একটা মেয়ে আসছে এসেই দেখবে তার শাশুড়ির প্রধান কাজ হচ্ছে তার শ্বশুরকে ধমকানো এটা তার ভাল লাগবে না। সব মেয়েরাই স্বামীকে ধমকাতে পছন্দ করে। কিন্তু যখন দেখে অন্য কোন মেয়ে তার স্বামীকে ধমকাচ্ছে তখন খুব রাগ করে।
বিয়ের খবরটা তুমি কবে জেনেছ?
পরশু রাতে।
পরশু রাতে জেনেছ মাঝখানে পুরো একটা দিন গিয়েছে আর তুমি আমাকে কিছুই জানাও নি।
আহারে যন্ত্রণা। বিয়েটা যদি আমার হত আমি বিয়ে ঠিক হওয়া মাত্র তোমাকে জানাতাম। বিয়ে ফরহাদের। সে তোমাকে না জানালে আমি কি করব?
আমাকে জানাতে তার অসুবিধা কোথায়?
আছে নিশ্চয়ই কোন অসুবিধা।
রাহেলা স্বামীর সামনে থেকে উঠে গেলেন। ফরহাদ থাকলে সরাসরি তার কাছে যেতেন। ফরহাদ নেই, খুব ভোরে উঠেই চলে গেছে। নাসতা খায় নি। এক কাপ চা শুধু খেয়েছে। তাঁর সঙ্গে দেখা হয় নি। ঘুমের অষুধ খাওয়ার পরেও কাল রাতে তার এক ফোটা ঘুম হয়নি। ফজরের আজান শুনে ঘুমুতে গেছেন। ঘুম ভেঙ্গেছে সকাল দশটায়। ঘুম ভেঙ্গেই দুঃসংবাদ। ছেলের বিয়ে দুঃসংবাদতো বটেই। মার কাছে মেয়ের বিয়ে সুসংবাদ। ছেলের বিয়ে দুঃসংবাদ।
মঞ্জু দাড়ি শেভ করছিল। ব্লেডে ধার না থাকায় তার গাল কেটে গেছে। রক্ত বের হয়ে শাদা ফেনায় লাল আভা। মঞ্জু বিরক্ত হয়ে আয়নার ভেতরের মঞ্জুকে দেখছে। যেন তার গাল কেটে ফেলায় সে আয়নার ভেতরের মঞ্জুকে দায়ী করছে। মাকে ঢুকতে দেখে সে তার বিরক্ত দৃষ্টি মার দিকে ফিরিয়ে দিল। এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার গাল কাটায় রাহেলারও কোন সূক্ষ্ণ ভূমিকা আছে।
রাহেলা বললেন, কি করছিস?
মঞ্জু বলল, কি করছি দেখতে পাচ্ছ না?
গালতো কেটে ফেলেছিস?
দরজা থেকে সরে যাওতো মা অন্ধকার করে রেখেছ। নিজের পেটের ছেলে এমন ভঙ্গিতে কথা বলছে ভাবাই যায় না। তাঁর হাতে ক্ষমতা থাকলে দারোয়ান দিয়ে কানে ধরিয়ে এই ছেলেকে বাসার চারপাশে কয়েকটা চক্কর দেয়াতেন। অক্ষম মারা ইচ্ছা থাকলেও কিছু করতে পারেন না। তিনি দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তোর সঙ্গে ফরহাদের কথা হয়েছে?
না।
সে যে বিয়ে করছে জানিস?
জানি।
তোকে কে বলেছে?
ভাইয়া।
কখন বলেছে?
দেখছ একটা কাজ করছি। কি ভ্যানভ্যান শুরু করলে? কখন বলেছে তা দিয়ে তোমার দরকারটা কি?
তোর সঙ্গে কি কথা হয়েছে একটু বল, দরকার আছে।
বিরক্ত করোনাতো মা, প্লীজ। ভাইয়ার সঙ্গে আমার এমন কোন কথা হয়নি। আজ বিকেলে মেয়ে পক্ষের লোকজন কথা বলতে আসবে। আমাকে থাকতে বলেছে।
আজ বিকেলে আসবে?
মঞ্জু জবাব দিল না। রাহেলা বললেন, চা খাবি? মঞ্জু এই প্রশ্নের ও জবাব দিল। রাহেলা বের হয়ে রান্নাঘরে গেলেন। কিছু কিছু সময়ে তাঁর ধৈর্য সীমাহীন। তিনি চা বানিয়ে আবার ছেলের কাছে আসবেন। তখন মঞ্জু তার সঙ্গে ভদ্র ভাবে, কথা বলবে তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। কারণ ছেলে মার সঙ্গে একটু আগে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। তার জন্যে সে কিছুটা হলেও অনুতপ্ত বোধ করবে। ছেলে যদি পুরোপুরি অমানুষ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যি ভিন্ন কথা। সেই সম্ভাবনা। তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ছেলেবেলায় মঞ্জু অতি শান্ত ছিল। কোন অভিযোেগ নেই, কোন দুষ্টামী নেই, খাওয়া নিয়ে ঝামেলা নেই। সন্ধ্যা হলেই পড়তে বসছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি না বলছেন—অনেক হয়েছে বাপ ঘুমুতে যাও। ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা ঝুলিয়ে পড়ছেই। তখনি বোঝা উচিত ছিল বড় হয়ে এই ছেলে হারামজাদা টাইপ হয়ে যাবে।
