তবে শোন, অতিকষ্টে শ্বাস নিতে নিতে শল্য বলল, উত্তর-পশ্চিম দিক ধরে অগ্রসর হলে শ্রাবস্তী ও কৌশাম্বী রাজ্যের সীমানায় একটি পাহাড়ের গুহায় ওই ধনভাণ্ডার লুকানো রয়েছে। ওই অঞ্চলের পর্বতমালার মধ্যে বিশেষ পর্বতটিকে সনাক্ত করার উপায় আমি বলে দিচ্ছি। পাহাড়টির চেহারা অবিকল মাংসহীন নরমুণ্ডের মতো। কঙ্কাল-করোটির আকার বিশিষ্ট ওই পর্বতের গুহামুখে– অর্থাৎ, নরমুণ্ডের মুখের মধ্যে প্রবেশ করলে গুহার গায়ে আমার নামের আদ্যাক্ষর খোদিত আছে দেখবে। ওইখানে পপ-পশ–ওঃ! পরক্তপ! বড়ো কষ্ট- একটু জল!
জল। পরন্তপ বিব্রত মুখে বলল, জল এখানে কোথায় পাব?
শল্যের সমস্ত দেহ ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল; অধর প্রান্তে উঠে এল একঝলক রক্ত। তারপর মুখের দুইপাশে চোয়াল বেয়ে ঝরে পড়ল সেই রক্তের ধারা। শল্যের দেহের উপর ঝুঁকে পড়ে পরন্তপ ডাকল, শল্য! শল্য!
আগন্তুক বলল, কাকে ডাকছ? তোমার বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে আগন্তুকের মুখের উপর দুই চোখের দৃষ্টি মেলে পরন্তপ বলল, তুমি সব কথাই শুনেছ। গুপ্তধন পাওয়া গেলে অর্ধাংশ তোমাকে নিশ্চয়ই দেব। পথের আপদ-বিপদ সম্পর্কে তোমাকে সতর্ক করা নিষ্প্রয়োজন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার নির্ভীক চরিত্রের পরিচয় আমরা পেয়েছি। তবে–
-তবে কি?
শ্রাবস্তী ও কোশলের সীমান্ত বহু ক্রোশ ধরে বিস্তৃত। ওই কঙ্কালকররাটির আকার-বিশিষ্ট পর্বতের সন্ধান পেতে বেশ বিলম্ব হবে। চারদিকে অনার্যপ্রহরীর দল সর্বদাই
বাধা দিয়ে আগন্তুক বলল, পাহাড়টি বহু কাল পূর্বেই আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ওই পথে আমি বহুকাল ধরে যাতায়াত করছি। স্থানীয় বনপথে চলাচলের অভিজ্ঞতা আমার আছে। কোন পথে কিভাবে চললে অনার্যসেনার দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া যাবে তা আমি জানি। নিতান্তই যদি ধরা পরি, তাহলে যথাসময়ে যথাকৰ্তব্য করা যাবে। এখন থেকে সম্ভাব্য বিপদের কথা ভেবে দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
স্থির দৃষ্টিতে আগন্তুকের মুখের দিকে তাকিয়ে পরন্তপ বলল, তুমি পরন্তপের যোগ্য সঙ্গী বটে। তোমার নাম?
আমার নাম শশক।
আগন্তুকের পেশীবদ্ধ বিপুল বপুর দিকে তাকিয়ে পরন্তপ সবিস্ময়ে বলে উঠল, তোমার নাম শশক? আশ্চর্য!
নিজের দেহের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিব্রত মুখে শশক বলল, আমি সার্থকনামা মানুষ নই। শশক নামটিও আমি পছন্দ করি না।
পছন্দ হওয়ার কথা তো নয়, পরন্তপ হেসে বলল, কিন্তু নামকরণের উপর আমাদের তো হাত নেই। জনক-জননী বা আত্মীয়-স্বজনই আমাদের নামকরণ করে থাকেন। তবে তোমার ন্যায় শক্তিশালী পুরুষের নাম শশক হওয়া অনুচিত একথা বলতে পারি।… শশক! যদি অনুমতি দাও, তাহলে আমার সঙ্গীদের আমি উপরে আসতে বলি। আজ থেকে তুমিও যে আমদের সহচর সেকথা তাদের জানানো প্রয়োজন।
আগন্তুক কিছু বলতে গেল, কিন্তু সে কথা বলার আগেই পার্বত্যপথের নীচ থেকে কর্ণদেবের উচ্চকণ্ঠ ভেসে এল, পরন্তপ! পরন্তপ! সতর্ক হও! সামনে সমূহ বিপদ!
পরক্ষণেই তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করল এক ভয়াবহ আতধ্বনি! সেই আর্তনাদের কেশ স্তব্ধ হওয়ার আগেই পাহাত্মে সানুদেশে গুহার নিকটবর্তী স্থান থেকে ভেসে এল রক্তজল করা শব্দের তরঙ্গ!
.
১৬. গিরিপথে মৃত্যুর হানা
শশক তার ধনুর্বাণ পৃষ্ঠদেশে স্থাপন করেছিল, এখন ঝটিতি পিঠ থেকে ধনুক নিয়ে তাতে শর যোজনা করে বলে উঠল, নেকড়ের আর্তনাদ! নেকড়ের চিৎকার!
পরন্তপ বলল, অনেকগুলো নেকড়ের চিৎকার! প্রথম যে নেকড়েটা আর্তনাদ করেছিল, সেটা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গীদের তিরের আঘাতে আহত হয়েছিল।
উত্তর না দিয়ে শশক একলাফে গুহার বাইরে এসে দাঁড়াল। বিনা বাক্যবয়ে তার সঙ্গী হল পরন্তপ। শশকের নির্দেশ অনুসারে সে গুহার মধ্যে নিরস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিল, এখন পরিত্যক্ত অস্ত্রে কথা তার মনে হল;- দ্বিধা মুহূর্তের জন্য অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে না জানলে মহারাজ রুদ্রদমনের রাজ্যে এতকাল দুস্যবৃত্তি করতে পারত না পরন্তপ-শশকের সঙ্গ নেওয়ার আগে গুহাতল থেকে একটি প্রস্তর তুলে নিতে তার ভুল হয়নি। প্রস্তরটিকে দৃঢ়মুষ্টিতে ধারণ করে পরন্তপ গুহার বাইরে এসে দাঁড়াল।
গুহার দক্ষিণে যে স্বল্প-পরিসর স্থান বৃত্তাকারে ঘুরে গেছে, সেইদিকে তাকিয়ে তারা দেখতে পেল পাঁচ-ছয়টি নেকড়ে সেখানে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে লোলুপ দৃষ্টিতে! তাদের ক্ষুধিত-দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পরন্তপের তিন সঙ্গীকে! সামনে জ্যান্ত খাবার দেখেও নেকড়ের দল গিরিপথ ধরে কেন নামছে না এই রহস্যের সমাধান পড়ে আছে গুহার অনতিদূরে- তীরবিদ্ধ একটি নেকড়ের মৃতদেহ থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের ধারা!
নীচে গিরিপথের উপর ধনুকে বাণ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শায়ন ও কর্ণদেব। তাদের পাশেই প্রকাণ্ড কুঠার হস্তে অবস্থান করছে গেরুয়াধারী বল্লভ।
শায়ন ও কর্ণদেব আবার তীর নিক্ষেপ করল। দুটি নেকড়ে চিৎকার করে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে পড়ল। অন্যান্য জন্তুগুলি তাড়াতাড়ি পিছিয়ে পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল।
পরন্তপ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল
গুহার অদুরে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানকে পরিপূর্ণ করে সেতুর আকারে বিরাজ করছে দুটি প্রকাণ্ড বৃক্ষকাণ্ড। খুব সম্ভব গিরিপথে যাতায়াত করার জন্য স্থানীয় মানুষ অথবা কোনো শিকারি ওইভাবে গাছ কেটে সেতু প্রস্তুত করেছিল। পরন্তপ ও তার সঙ্গীরা যে পাহাড়টায় রয়েছে, তার পাশের পাহাড়ে ওই গাছের গুঁড়ির পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো নেকড়ে। নেকড়েবাহিনীর অগ্রবর্তী একটা ছোটো দল পার্শ্ববর্তী পর্বত অতিক্রম করার সময়ে সম্ভবত পরন্তপের সঙ্গীদের দেখতে পেয়েছে, আর তার ফলেই এই বিপত্তি। নেকড়েরা শিকার দেখলে চিৎকার করে সঙ্গীদের জানিয়ে দেয়- অগ্রবর্তী দল যখন চিৎকার করে পশ্চাৎবর্তী বাহিনীকে শিকারের সংবাদ জানাচ্ছিল, সেই ভয়ংকর জান্তব উল্লাসের ধ্বনি একটু আগে শুনতে পেয়েছিল পরন্তপ ও শশক। তার আগেই আক্রমণোদ্যত নেকড়েদের দেখে শায়ন অথবা কর্ণদেব তির নিক্ষেপ করে একটি পশুকে হত্যা করেছে শাপদ-কণ্ঠের সেই মৃত্যুকাতর আর্তনাদ শশক ও পরন্তুপের শ্রুতিগোচর হয়েছে প্রথমেই।
