আগন্তুক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর বলল, তোমার প্রস্তাব মেনে নিচ্ছি। যদি সত্যই তোমরা তার মিত্র হও, তাহলে অন্তিমকালে শেষ সাক্ষাঙ্কারে বাধা দেওয়া আমার পক্ষে অনুচিত। বললো, কি তোমার নাম?
– পরন্তপ।
আগন্তুকের ললাট ও ভ্রূ কুঞ্চিত হল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক তোমরা ক্ষণকাল বিলম্ব করো। আমি শল্যকে জিজ্ঞাসা করে আসছি।
গুহামধ্যে তার দেহ অদৃশ্য হতেই কর্ণদেব বলল, তোমার নাম বলে ভুল করেছে পরন্তপ।
উপায় কি? পরন্তপও বলল, শল্যের অনুমতি ছাড়া ওই ব্যক্তি কিছুতেই আমাদের উপরে উঠতে দেবে না। আরও একটা কথা– এই রাজ্যে পরন্তপ নামে একাধিক ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকতে পারে, আমিই যে দস্যু পরন্তপ সে-বিষয়ে সে নিশ্চিত হবে কেমন করে?
কর্ণদেব বলল, ওই ব্যক্তি জানে শল্য দস্যু-দলপতি। দস্যু পরন্তপের নাম এই দেশে কারও অবিদিত নয়। খুব স্বাভাবিক যুক্তি দিয়েই সে ধরে নিতে পারে এক দস্যুর সঙ্গে আর এক দস্যুর পরিচয় বা মিত্রতা ঘটতে পারে। সুতরাং–
কর্ণদেবের কথা শেষ হওয়ার আগেই গুহার মুখে আবির্ভূত হল আগন্তুকের দীর্ঘ দেহ। সে বলল, পরন্তপ! শল্য তোমাকে দেখা করার অনুমতি দিয়েছে। তুমি একাকী নিরস্ত্র ভাবে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারো। তোমার সঙ্গীদের ওখানেই থাকতে হবে।
নিঃশব্দে অস্ত্রত্যাগ করে উপরে উঠে গেল পরন্তপ, তারপর গুহার মধ্যে প্রবেশ করল।
পরন্তপের তিন সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে আগন্তুক বলল, তোমরা যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। উপরে ওঠার চেষ্টা করলে বিপদ ঘটবে। আমি গুহার ভিতর থেকে নজর রাখছি।
সে গুহার ভিতর অদৃশ্য হল।
পরন্তপ তখন আহত শল্যের পাশে বসে পড়েছে, তার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা পরিস্ফুট।
শল্যের পিঞ্জরে বিদ্ধ বাণটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, ওটাকে ক্ষতমুখ থেকে টেনে ফেলে দিলে হয়তো তুমি স্বস্তি পাবে।
ম্লান হেসে শল্য বলল, এখন আর কোনো চেষ্টা করে লাভ নেই। আমার আয়ু সীমিত। মৃত্যুর পদধ্বনি আমি শুনতে পাচ্ছি।
পাশ থেকে আগন্তুক বলে উঠল, ক্ষতমুখ থেকে বাণ উৎপাটিত করলে প্রবল বেগে রক্তপাত হয়ে এখনই প্রাণসংশয় ঘটতে পারে।
অতিকষ্টে শাসগ্রহণ করতে করতে শল্য বলল, আমার মৃত্যু অনিবার্য। বাণ তুলে ফেলার চেষ্টা করলে দারুণ যন্ত্রণা হবে। অনর্থক কষ্টভোগ করাতে চাই না… পরন্তপ! আমার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। বলল, কি বলতে চাও?
পরন্তপ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে আগন্তুকের দিকে কটাক্ষ করল। আগন্তুক সেই দৃষ্টির অর্থ বুঝল কি না বলা যায় না, কিন্তু সে যথাস্থানে দাঁড়িয়ে রইল অটল হয়ে।
শল্যের ওষ্ঠাধরে ক্লিষ্ট হাসির রেখা দেখা দিল, পরন্তপ! আমি জানি তুমি গুপ্ত ধনভাণ্ডারের সন্ধানে এসেছ- তাই নয় কি?
পরন্তপ সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সায় দিল।
শল্য বল্ল, তুমি নিশ্চয় আমার বিপদের সংবাদ পেয়ে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছিলে? শুনলাম, তোমার সঙ্গে অস্ত্রধারী অনুচর আছে?
পরন্তপ আবার সায় দিল।
শল্য বলল, আমি ওদের গুপ্তধনের সন্ধান দিতে রাজি হইনি, তোমাকে সন্ধান দেব এমন কথা তুমি ভাবছ কেন?
পরন্তপ বলল, ওরা তোমার উপর অত্যাচার করছিল। আমি তোমাকে উদ্ধার করতাম এবং গুপ্তধনের সন্ধান পেলে তোমাকে অর্ধাংশ দিতে সম্মত হতাম। ওদের প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই। গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া মাত্র প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে ওরা তোমাকে হত্যা করত। কিন্তু আমি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না। আমাদের সাহায্যে তোমার প্রাণরক্ষা হলে, আমার প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে তুমি স্বয়ং আমাদের যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেই আমার মনে হয়।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শল্য বলল, সত্য। পরন্তপ কখনো বিশ্বাসভঙ্গ করে না একথা দস্যুমহলে সবাই জানে। কিন্তু আমি এখন মৃত্যুপথযাত্রী; তোমাকে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়ার আগেই আমার মৃত্যু হবে।
পরন্তপ বলল, তা বটে। তবে যদি গুপ্তধনের সন্ধান দাও, তাহলে আমরা ওই ধন উদ্ধার করতে প্রাণপণ করব। তোমার কোনো আত্মীয়-স্বজন থাকলে তার নাম-ধাম আমাকে জানাও। আমি শপথ করছি তোমার প্রাপ্য অর্ধাংশ–
বাধা দিয়ে শল্য বলল, আমার কোনো আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব নেই। কিন্তু
একটু থেমে হাত বাড়িয়ে দণ্ডায়মান আগন্তুকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে শল্য বলল, কিন্তু এই অপরিচিত ব্যক্তিকে আমি পরমাত্মীয় জ্ঞান করি। আমাকে উদ্ধার করার জন্য এই ব্যক্তি নিজের প্রাণ বিপন্ন করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। পরন্তপ! আমি বাঁচব না। যদি আমার অর্ধাংশ ওকে দিতে সম্মত হও, তাহলে আমি তোমাকে গুপ্তধনের সন্ধান দিয়ে যাব। বলল, আমার প্রস্তাবে তুমি সম্মত?
একটু ইতস্তত করে পরন্তপ বলল, হ্যাঁ।
শল্য বলল, প্রতিজ্ঞা করছ?
পরন্তপ একবার পাশেই দণ্ডায়মান আগন্তুকের মুখের উপর দৃষ্টিনিক্ষেপ করল। সেই মুখ পাথরের মতো ভাবলেশহীন নির্বিকার; মনে হল গুপ্তধন সংক্রান্ত কোনো কথাই তার কানে যায় নি, অথবা কানে গেলেও এ বিষয়ে তার কিছুমাত্র আগ্রহ নেই।
শল্য বলল, পরন্তপ! আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। শপথ করো, আমার প্রাপ্য অর্ধাংশ এই ব্যক্তিকে দেবে? শপথ না করলে ধনভাণ্ডারের সন্ধান পাবে না।
পরন্তপ দৃঢ়কণ্ঠে বলল, শপথ করছি, যদি গুপ্তধনের সন্ধান পাই, তাহলে অর্ধাংশ এই ব্যক্তির হাতে সমর্পণ করব। আমার কথার অন্যথা হবে না।
