হঠাৎ একটি নেকড়ে মুখ তুলে চিৎকার করে উঠল আক্রমণের পূর্ব-সংকেত! সঙ্গে সঙ্গে গাছের গুঁড়ির সেতু বেয়ে ছুটে এল অনেকগুলি জানোয়ার;- এধারে পাথরের আড়ালে যে নেকড়েগুলি দাঁড়িয়েছিল, তারাও সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধেয়ে এল নীচে গিরিপথে দণ্ডায়মান তিনটি মানুষের দিকে!
গিরিপথ আর গুহার মাঝখানে সঙ্কীর্ণ চাতালের মতো জায়গাটাতে পৌঁছানোর আগেই তলা থেকে তিরের পর তির ছুটে এসে আক্রমণে উন্মুখ নেকড়েবাহিনীর অধিকাংশকেই মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল। দুটি জানোয়ার গিরিপথের মুখে এসে পৌঁছাল বটে, কিন্তু নীচের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই শশক অব্যর্থ সন্ধানে শরনিক্ষেপ করে একটি জন্তুকে হত্যা করল। আবার ধনুকে বাণ লাগানোর সুযোগ পেল না শশক- দ্বিতীয় নেকড়েটা হিংস্রভাবে দন্তবিকাশ করে নতুন শত্রুর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পরন্তপ শক্ত মুঠিতে পাথরটা চেপে ধরে শূন্যে হাত তুলল, কিন্তু উদ্যত মুষ্টি যথাস্থানে আঘাত করার পূর্ব মুহূর্তেই শশকের প্রচণ্ড পদাঘাতে নেকড়েটা ছিটকে পড়ল পাহাড় থেকে নীচে।
হঠাৎ দুইদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে নেকড়ে বাহিনী চমকে গেল। তিরের নাগালের বাইরে ছোটো বড়ো পাথরের আড়াল থেকে তারা মানুষগুলোর উপর নজর রাখতে লাগল।
উপর থেকে হাঁক দিয়ে পরন্তপ বলল, শায়ন! কর্ণদেব! তোমরা উপরে উঠে এসো। আমার সঙ্গী তোমাদের বাধা দেবে না।
শায়ন বলল, তোমার সঙ্গী বাধা না দিলেও আমরা এখন উপরে উঠে গুহার মধ্যে প্রবেশ করব না।
–কেন? ভিতরে এলে তোমরা কিছুটা নিরাপদ হবে।
না। সেই নিরাপত্তা সাময়িক। আমরা গুহায় প্রবেশ করলেই জন্তুগুলো গুহামুখ থেকে শুরু করে গিরিপথের চারধারে ছড়িয়ে পড়বে, আর সকলেই হব গুহার মধ্যে বন্দি। এখন দুদিক থেকে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ওরা গুহার সামনে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারছে না।
কর্ণদেব বলল, শয়ান! আমরা কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকব?
পরন্তপ কিছু বলার আগেই বল্লভের উদাত্তকণ্ঠ ভেসে এল, তোমরা উপরে উঠে যাও। আমি যা করার করছি।
পরন্তপ সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, কি করতে চাও বল্লভ?
কোনো উত্তর না দিয়ে বল্লভ সঙ্কীর্ণ গিরিপথ বেয়ে উপরে উঠে এসে গুহার মুখে দাঁড়াল, একবার শশকের দিকে দৃষ্টিপাত করল, তারপর দৃঢ়মুষ্টিতে কুঠার ধরে বৃক্ষকাণ্ডে গঠিত সেতুর দিকে অগ্রসর হল।
নেকড়েরা এতক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মানুষগুলোর গতিবিধি লক্ষ করছিল। বল্লভ তাদের কাছাকাছি আসতেই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে সগর্জনে তেড়ে এল। সেতুর ওপারে যে নেকড়েগুলো দাঁড়িয়েছিল, তারাও দলে দলে সেতু পার হতে শুরু করল।
তির ছুড়লে বল্লভের গায়ে লাগতে পারে তাই, শায়ন ও কর্মদেব ধনুর্বাণ নামিয়ে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বল্লভের দিকে। শশক একবার বল্লভের দিকে দৃষ্টিপাত করল, তারপর খাপ থেকে তলোয়ার খুলে পিছন পিছন এগিয়ে গেল।
কিন্তু শশকের তরবারিতে এক ফোঁটা রক্তের দাগও পড়ল না। বল্লভের প্রচণ্ড কুঠার ঘুরতে লাগল বিদ্যুদ্বেগে এবং পাহাড়ের গায়ে রক্তের স্রোত ছুটিয়ে ছিটকে পড়তে লাগল নেকড়েদের ছিন্ন ভিন্ন মৃতদেহ! কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ! হতাবশিষ্ট নেকড়েগুলি গাছের গুঁড়ির সেতু পার হয়ে অপর দিকে পাহাড়ে তিরবেগে পলায়ন করল। বল্লভ তবু থামল না, সেতুর সামনে এসে সে কুঠার তুলল। রক্তাক্ত কুঠার ফলক সবেগে নেমে এল বৃক্ষকাণ্ডে নির্মিত সেতুর উপর। উপরি-উপরি দুবার আঘাত করতেই বিশাল বৃক্ষ দুটি খণ্ডিত হয়ে তলায় ছিটকে পড়ল।
কুঠার নামিয়ে সঙ্গীদের দিকে দৃষ্টিপাত করে বল্লভ বলল, আপদ শান্তি। ওরা এখন আর আমাদের বিরক্ত করবে না।
তারপর পিছন ফিরে তরবারি হাতে শশককে দেখে হেসে বলল, আমাকে সাহায্য করতে এসেছ বলে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তবে এ যাত্রা তোমার তরবারি ব্যবহারের প্রয়োজন হল না।
কর্ণদেব ও শায়ন ততক্ষণে উঠে এসেছে গুহার মুখে। সকলকে ডাক দিয়ে পরন্তপ বলল, বন্ধুগণ! এদিকে এসো।
শশকের সঙ্গে বল্লভ এসে দাঁড়াল পরন্তপের সম্মুখে। তাদের পাশেই দণ্ডায়মান হল শায়ন ও কর্ণদেব।
তোমরা শোন, পরন্তপ বলল, এই ব্যক্তির নাম শশক। আজ থেকে এই অভিযানে শশকও আমাদের সঙ্গী।
এই অভাবিত ঘোষণায় সকলেই চমকে উঠল, কিন্তু কেউ কোনো অভিমত প্রকাশ করল না।
কর্ণদেব জিজ্ঞাসা করল, শল্য কোথায় যাবে?
পরন্তপ বলল, শল্যের মৃত্যু হয়েছে। অন্তিমকালে তার অনুরোধেই আমি শশককে দলভুক্ত করেছি এবং শল্যের প্রাপ্য অর্ধাংশ শশককে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি।
শশক! সবিস্ময়ে বল্লভ বলল, এই বৃষস্কন্ধ ব্যঢ়োরস্ক প্রকাণ্ড পুরুষের নাম শশক?
শায়ন আর কর্ণদেব শশকের নামকরণ সম্পর্কে তাদের মতামত প্রকাশ করতে উদ্যত হল, কিন্তু তাদের মুখের কথা মুখেই থেকে গেল–
বল্লভ ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, নেকড়েরা হঠাৎ চিৎকার করছে কেন? ওরা কি তলা থেকে এই পাহাড়ে উঠে আমাদের আক্রমণ করতে চায়?
পরন্তপ বলল, বোধহয় না। একবার আমাদের আক্রমণ করতে এসে ওদের যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে দ্বিতীয়বার ওরা এদিকে আসতে সাহস করবে বলে মনে হয় না।
কর্ণদেব বলল, আমারও তাই মনে হয়। তবে নেকড়ের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নিতান্তই সীমাবদ্ধ।
