দুজনেই লজ্জিত হয়ে মাথা হেঁট করল। দুটি তরবারি আবার কোষের মধ্যে আত্মগোপন করল। প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করল শায়ন, আমি অন্যায় করেছি। শুধু তোমাকে অপমান করিনি, ক্রোধের বশে ভুল করে তোমাকে নিষিদ্ধ নামে সম্বোধনও করেছি। এই ত্রুটি ক্ষমার অযোগ্য। দারুক! তবু তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
-আমারও অন্যায় হয়েছে। তোমার বিশ্লেষণে ভুল থাকলেও তোমাকে বিদ্রূপ করা অনুচিত। শায়ন! তুমিও আমাকে ক্ষমা করো।
সগর্বে মুখ তুলে শায়ন বলল, আমি অন্যায় করেছি; ভুল করিনি! ওই গিরিগুহার সম্মুখে গেলেই বুঝবে আমার অনুমান নির্ভুল।
বেশ, তবে তুমিই অগ্রবর্তী হয়ে পথ দেখাও। আমরা তোমাকে অনুসরণ করছি।
অশ্বপৃষ্ঠে পর্বতের পাদদেশে এসে তারা দেখল অতি সঙ্কীর্ণ গিরিপথ উপর দিকে উঠে গেছে। সে পথে অশ্ব চালনা নিরাপদ নয় বিবেচনা করে তারা পাহাড়ের নীচে একটি বৃক্ষের সঙ্গে অশ্ব চারটিকে রজ্জবদ্ধ করে পর্বতারোহণ শুরু করল…।
নির্দিষ্ট গুহামুখ থেকে তারা যখন প্রায় দশবারো হাত দুরে, সেই সময় হঠাৎ বল্লভের অসতর্ক পদক্ষেপের ফলে একটি প্রস্তর স্থানচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়ল। ওই পাথরটির সংঘাতে আরও কয়েকটি ছোটোবড়ো পাথর স্থানত্যাগ করে গড়িয়ে পড়তে লাগল প্রচণ্ড শব্দের তরঙ্গ তুলে…।
সেই শব্দতরঙ্গ স্তব্ধ হওয়ার আগেই গুহামুখ থেকে ভেসে এল সুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, তোমরা কারা? এখানে কি চাও?
সচমকে মুখ তুলে চারটি দুর্ধর্ষ মানুষ দেখল গুহার সম্মুখে অপরিসর স্থানটির উপর আবির্ভূত হয়েছে শুল্যের উদ্ধারকতা! এবং, তার হাতের ধনুর্বাণ উদ্যত লক্ষ্যে স্থির হয়ে আছে চার বন্ধুর দিকে!
অকস্মাৎ শায়নের দিকে ফিরে অভিভূত স্বরে পরন্তপ বলল, অদ্ভুত তোমার ক্ষমতা। তোমাকে বারংবার সাধুবাদ জানাচ্ছি। ধন্য! শায়ন! ধন্য!
১৫. পরন্তপের শপথ
আগন্তুক আবার প্রশ্ন করল, তোমরা এখানে কি চাও?
পরন্তপ বলল, আমরা পথিক। পর্বত অতিক্রম করে বিপরীত দিকে যেতে চাই।
নীচে দুই পাহাড়ের মাঝখানে পথের দিকে নির্দেশ করে আগন্তুক বলল, বিপরীত দিকে যেতে হলে ওই পথে যাওয়াই সুবিধা। অনর্থক পর্বত পার হওয়ার প্রয়োজন কি?
অসহিষ্ণুস্বরে পরন্তপ বলল, তোমাকে অত কৈফিয়ত দেব না। ধনুর্বাণ নামাও। আমাদের যেতে দাও।
আগন্তুকের মুখে হাসির আভাস দেখা দিল, তোমাদের গতিবিধি সন্তোষজনক নয়। উপরে উঠে তোমরা আমাকে আক্রমণ করতে পারো। বিশেষত আমার এক সঙ্গী অসুস্থ অবস্থায় গুহার ভিতর বিশ্রাম করছে। তার নিরাপত্তার কথাও আমি ভাবছি। অতএব, তোমাদের আমি উপরে উঠতে দেব না।
কর্ণদেব হঠাৎ বলে উঠল, পথিক! পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তুমি আমাদের উপর অত্যাচার করছ। অতর্কিতে ধনুর্বাণ উদ্যত করায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। অসি হস্তে সম্মুখীন হলে তোমাকে উচিত শাস্তি দিতাম।
আগন্তুকের মুখের হাসি বিস্তৃত হল, চারজনের বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধে ব্যাপৃত হলে আমি যে বিপন্ন হব সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সেইজন্যই তো তোমাদের উপরে উঠতে দেব না।
তারপর পরন্তপের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে এই দলের নেতা মনে হচ্ছে। এই বালক দস্যুটিকে কোথা থেকে সংগ্রহ করলে?
শায়ন ও বল্লভ চিৎকার করে উঠল, আমরা দস্যু নই।
কর্ণদেব ক্রুদ্ধস্বরে বলল, তোমাকে বিপন্ন করার জন্য চারজনের প্রয়োজন নেই। ধনুর্বাণ ফেলে অসি গ্রহণ করলে আমি একাকী তোমাকে সমুচিত দণ্ড দিতে পারি। এস। অসি গ্রহণ করো। তোমাকে আমি দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করছি।
আগন্তুক হাসিমুখে বলল, পরিকল্পনাটি ভাল। তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেই তোমার সঙ্গীরা উপরে উঠে আমাকে ঘিরে ফেলতে পারে। বালক! তোমার প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার মতো নির্বোধ আমি নই।
কর্ণদেব বলল, আমি শপথ করছি আমার সঙ্গীরা যুদ্ধে বাধা দেবে না। ধনুর্বাণ সংবরণ করে অসি হাতে নাও।
আগন্তুক বলল, দস্যর শপথে আমি বিশ্বাস করি না।
কর্ণদেব কি যেন বলতে যাচ্ছিল, তাকে বাধা দিয়ে পরন্তপ বলল, বারংবার আমাদের তুমি দস্যু বলছ কেন? আমরা যে দস্যু তার কোনো প্রমাণ আছে?
-আছে। আমার সঙ্গীর উপর একদল দস্যু অত্যাচার করছিল। আমার সঙ্গী যে এক সময়ে ঐ দস্যুদলেরই দলপতি ছিল, সে কথাও সে আমাকে বলেছে। তার অন্তিমকাল উপস্থিত। তাই তার নাম আর পরিচয় আমাকে জানাতে সে দ্বিধাবোধ করেনি। আমার বিশ্বাস শল্যকে হত্যা করার জন্যই তোমরা এসেছ। যাদের কবল থেকে আমি ওকে উদ্ধার করেছি, তোমরা নিশ্চয়ই সেই দুস্যদলের অন্তর্ভুক্ত। নচেৎ, সমতল ভূমিতে সহজ পথ থাকতেও তোমরা পর্বতে আরোহণ করছ কেন?
চিন্তিতস্বরে পরন্তপ বলল, শল্য তোমাকে তার নাম জানিয়েছে বুঝতে পারছি। সে যে দস্যুদলের অধিপতি ছিল, সেকথাও গোপন করেনি। অন্তিমকাল উপস্থিত দেখে উদ্ধারকর্তাকে তার প্রকৃত পরিচয় দিতে সে ইতস্তত করে নি। কিন্তু সব কথা সে কি তোমায় বলেছে?
–আর কি কথা থাকতে পারে? তার ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য জানার আগ্রহ আমার নেই।
পরন্তপ এক মুহূর্ত হেঁটমুণ্ডে চিন্তা করল, তারপর সহস্য মুখ তুলে বলে উঠল, শোনো; আমরা তার সন্ধানেই এসেছি তোমার এই অনুমান সত্য। কিন্তু আমরা তাকে হত্যা করতে আসিনি। তার বিপদের সংবাদ পেয়ে তাকে উদ্ধার করতেই এসেছিলাম। কিন্তু আমরা কিছু করার আগেই তুমি শল্যকে দুস্যদের কবল থেকে মুক্ত করেছ। সে যে আহত হয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, এই কথা শুনে আমি অতিশয় চিন্তিত। তুমি আমার নাম জানিয়ে শল্যকে জিজ্ঞাসা করো সে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায় কি না– যদি সে অসম্মতি জানায়, তাহলে আমরা ফিরে যাব। আশা করি এই প্রস্তাবে তোমার আপত্তি হবে না।
