বল্লভ এতক্ষণ নীরব ছিল, হঠাৎ সে বলে উঠল, শায়ন! তুমি যে আজকাল পশুজগৎ থেকে সংবাদ আহরণ করতে শিখেছ সেই তথ্য আমারও জানা ছিল না। কিন্তু কথা হচ্ছে তোমাকে সংবাদটি পরিবেশন করল কে? এতক্ষণ তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো জীবজন্তুকে তো ধারে কাছে আসতে দেখি নি।
শায়ন স্মিতমুখে বলল, সেই দেখার কথাই তো বলছি। মল্লযোদ্ধার চোখে দেখলে প্রকৃতির বুক থেকে সংবাদ আহরণ করা যায় না। অভিজ্ঞ শিকারির চোখ থাকলে দেখতে পেতে কেমন করে কোন সংবাদ বহন করে আনে প্রকৃতির সন্তান।
হঠাৎ ধৈর্য হারিয়ে কটুস্বরে কর্ণদেব বলে উঠল, ভণিতা রেখে বলো কোথায় আছে ওরা? আর তুমি সে কথা জানলেই বা কি করে?
নাটকীয়ভাবে পর্বতশিখরে অবস্থিত এক গুহার দিকে আঙ্গুলিনির্দেশ করে শায়ন বলল, পলাতকরা ওই গুহাতেই এখন আশ্রয় নিয়েছে।
সন্দেহজড়িত স্বরে কর্ণদেব প্রশ্ন করল, তুমি কি করে জানলে?
তবে শোন, শায়ন বলতে লাগল, একটু আগেই যখন পলাতকরা কোন পথে গেছে সে বিষয়ে আলোচনা করে তোমরা মস্তিষ্ককে তপ্ত করে তুলছিলে, সেই সময়ই প্রথম আমি ভগ্ন গুল্মটিকে আবিষ্কার করি। তৎক্ষণাৎ বুঝলাম ওই পাহাড়েই ওরা গমন করেছে। অশ্বপৃষ্ঠে আহত মানুষ নিয়ে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি দুরারোহ ওই পর্বতে আরোহণের চেষ্টা করবে না সে কথা সহজেই বুঝলাম। শল্যের উদ্ধারকর্তা যে শল্যকে নিয়ে পদব্রজে ওই পাহাড়ে উঠেছে সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হলাম। সেইসঙ্গে একথাও বুঝলাম ওই বৃহৎ পর্বতের অন্দরে কন্দরে বিভিন্ন গুহা-গহ্বরে হানা দিয়ে পলাতকদের সন্ধান করা অসাধ্য না হলেও অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কিন্তু অনুসন্ধান চালাতে চালাতেই যদি আহত শল্যের মৃত্যু হয়, তাহলে সকল পরিশ্রমই হবে পণ্ডশ্রম! ভাবছি কি করি, এমন সময়ে গিরিপথ বেয়ে এক বিপুল বপু চিত্রকের আবির্ভাব! চিতাবাঘটি অলস-মন্থর। গতিতে ওই গহ্বরের ভিতর প্রবেশ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপর পিছন ফিরে তিরবেগে ছুটে গিরিপথের এক প্রান্ত দিয়ে পর্বতের অপরপার্শ্বে অন্তর্ধান করল। আমি জানি চিতাবাঘ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর জীব। সিংহ বা শার্দুলের সম্মুখীন হলে সে পলায়নের চেষ্টা করে, কিন্তু বনবাসী অন্যান্য শ্বাপদকে সে ভয় পায় না। গুহামধ্যে চিত্রকের ভীতিপ্রদ কোনো পশু থাকলে সে নিশ্চয়ই তাকে আক্রমণ করতে ছুটে এসে গুহামুখে আত্মপ্রকাশ করত, অথবা সগর্জনে বিরক্তি প্রকাশ করত– কিন্তু আমি কোনো হিংস্র পশুকে গুহার মুখে দেখতে পাইনি, অথবা শ্বাপদকণ্ঠের গর্জন ধ্বনিও আমার কর্ণে প্রবেশ করেনি। তবে চিত্ৰক পলায়নে তৎপর হল কেন? ব্যাঘ্রাদি কয়েকটি পশু ছাড়া আরও একটি জীবকে চিতাবাঘ ভয় পায় সেই জীবটি হচ্ছে অস্ত্রধারী মানুষ এই স্থানে আহত শল্য ও তার উদ্ধারকর্তা ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্রধারী পুরুষের অস্তিত্বের প্রমাণ আমরা পাইনি, অতএব বুঝলাম ওই গুহার ভিতরই স্থান গ্রহণ করেছে আহত শল্য ও তার উদ্ধারকর্তা।
পরন্তপ বলল, একটি ভগ্ন গুল্ম ও একটি চিতাবাঘের সচকিত পলায়ন দেখেই তুমি ওইখানে পলাতকদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে ফেললে। ধন্য শায়ন ধন্য!
শায়ন বলল, দীর্ঘকাল গিরিকান্তারে বন্য পশুর সংসর্গে জীবন যাপন করার ফলে একটি ভগ্ন গুল্ম ও একটি চিতাবাঘের আচরণ দেখে পলাতকদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছি– দস্যুবৃত্তি করে সময় অতিবাহিত করলে অবশ্যই এমন পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতার অধিকারী হতাম না।
পরন্তপ সক্রোধে গর্জন করে উঠল, শায়ন! সাবধান! তুমি দক্ষ তিরন্দাজ ও অসিযোদ্ধা সন্দেহ নেই, কিন্তু পরপকে ব্যক্তিগত ভাবে অপমান করলে তুমিও নিস্তার পাবে না। মনে রেখো– প্রবল প্রতাপশালী মহারাজ রুদ্রদমনের রাজ্যেও পরন্তপের নাম সন্ত্রাসের সৃষ্টি করে।
শায়নের দুই চক্ষু প্রখর হয়ে উঠল, সে শীতল স্বরে বলল, আমি কোনো ব্যক্তিকে অপমান করতে চাই না। কিন্তু আমাকে বিদ্রূপ করলে আমি সমুচিত উত্তর দিয়ে থাকি। আরও একটা কথা তুমি জেনে রাখো পরন্তপ কোনো দুরাত্মার নাম আমার অন্তরে সন্ত্রাসের সৃষ্টি করতে পারে না। আমার তরবারি যে-কোনো দুরাত্মাকে মুহূর্ত মধ্যে প্রেতাত্মায় পরিণত করতে পারে।
–সাবধান! শায়ন!
–সাবধান! পরন্তপ!
চকিতে ঝনকার শব্দে কোষমুক্ত হল দুটি তরবার–মধ্যাহ্নের সূর্যালোক আলোক-স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে জ্বলে উঠল শাণিত ইস্পাত-ফলকে!
তৎক্ষণাৎ দুই যুযুধানের মধ্যে হস্ত প্রসারিত করে দাঁড়াল বল্লভ ও কর্ণদেব।
বল্লভ গম্ভীর স্বরে বলল, তোমরা দুজনেই বালকোচিত আচরণ করছ। পরন্তপ! না, না– দারুক! শায়নকে বিদ্রূপ করে তুমি অন্যায় করেছে। আর শায়ন- তোমারও দোষ আছে। এই অভিযানের যে অধিনায়ক, তাকে অপমান করা গর্হিত কর্ম। আশা করি তোমরা পরস্পরের কাছে অন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
কর্ণদেব তিক্তস্বরে বলল, দারুক! সামান্য কারণে উত্তেজিত হয়ে তুমি নিজেকেই হাস্যাস্পদ করেছ। অসিচালনায় তোমার দক্ষতা শায়নের চাইতে বেশি কি না সেকথা বলতে পারি না, তবে তোমার ভদ্রতাবোধ যে শায়নের চাইতে উন্নতমানের নয়, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আর শায়ন মুহূর্তের উত্তেজনায় এভাবে আত্মবিস্মৃত হলে কখনো বন্ধুত্ব হয় না। তুমি তাকে হত্যা করে ক্ষমতার পরিচয় দিতে চাইছ? প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু যেখানে তোমাকে গ্রাস করার জন্য অপেক্ষা করছে, সেই মৃত্যুভয়াল পথের এক বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হত্যা করে তুমি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চাও? ধিক!
