সে যেদিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করল সেদিকে সবুজ অরণ্যের পরিবর্তে বিরাজ করছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ অসংখ্য প্রস্তর এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কয়েকটি কণ্টকপূর্ণ প্রায়-শুষ্ক বৃক্ষ। প্রস্তর ও শুষ্ক বৃক্ষে সজ্জিত সেই ঊষর ভূমির উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দুটি বৃহৎ পর্বত।
ওই পর্বতের দিকেই শল্যকে নিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তি পলায়ন করেছে বলে অনুমান করছে শায়ন।
বিপরীত দিকে তৃণাবৃত প্রান্তর ও ঘন অরণ্যের দিকে তাকিয়ে পরন্তপ অবিশ্বাসভরে মস্তক সঞ্চালন করল, অসম্ভব! ওদিকে কোথায় যাবে ওরা? ওই পর্বত দুটির মধ্যে দ্বিতীয়টিতে আরোহণ করা প্রায় অসম্ভব। দক্ষিণপার্শ্বে যে পর্বতটি রয়েছে, ওই পাহাড়ের গিরিপথ ধরে কোনোক্রমে দুটি মানুষ পাশাপাশি উঠতে পারে কিন্তু অশ্বারোহণে ওই গিরিপথ ধরে উপরে ওঠা সম্ভব নয়।
শায়ন চিবুকের উপর অঙ্গুলি ঘর্ষণ করতে করতে বলল, অশ্বারোহণে তারা নাও যেতে পারে। পর্বতের তলদেশে ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছে। দুটি পাহাড়ের মাঝখানে যে সঙ্কীর্ণ পথ রয়েছে, সেই পথে হয়তো অশ্ব অন্তর্হিত হয়েছে। অথবা ওই স্থান থেকে ভারমুক্ত অশ্ব পাহাড়ের সমান্তরাল রেখা ধরে ছুটতে ছুটতে দূর অরণ্যে আত্মগোপন করেছে।
পরন্তপ বলল, সবই অনুমান। তবে আহত মানুষকে নিয়ে অশ্বারোহণে বনপথের উপর ভ্রমণ করাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক। দুরারোহ পার্বত্য পথ ধরে একটি আহত মানুষকে নিয়ে ঊর্ধ্বে আরোহণ করতে গেলে পদস্খলিত হয়ে মৃত্যুবরণের সম্ভাবনা আছে। অতএব, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় ওরা অরণ্যের দিকেই পলায়ন করেছে। তৃণাবৃত প্রান্তর শুরু হওয়ার আগে ভূমিপৃষ্ঠ অতি কঠিন বলে অশ্বের পদচিহ্ন লক্ষিত হচ্ছে না। আমার বিশ্বাস ওই প্রান্তরের বুকে সন্ধান করলে আমরা ঘোটকের পায়ের দাগ দেখতে পাব।
শায়নের ওষ্ঠধর ব্যঙ্গের হাসি দেখা দিল, দারুণ! এটাও তোমার অনুমান মাত্র। প্রমাণ নয়।
শায়নের ব্যঙ্গজড়িত হাসির আভাস পরন্তপের মনে ক্রোধের উদ্রেক করল, সে তপ্তস্বরে বলল, আমার অনুমানের পিছনে স্বাভাবিক যুক্তির প্রয়োগ আছে। তোমার অনুমান কষ্টকল্পিত, তাতে যুক্তি বা প্রমাণ নেই।
ঊর্ধ্বে পর্বত শিখরের দিকে দৃষ্টি স্থাপন করে শায়ন বলল, প্রমাণ না পেয়ে আমি কথা বলি না। তারা কোন দিকে গেছে সেই প্রমাণ আগেই পেয়েছি। আর এখন যে কোথায় আছে সেই সংবাদও এইমাত্র আমার কাছে পৌঁছে গেছে।
বিদ্রূপ জড়িত স্বরে পরন্তপ বলল, কোথায় সেই প্রমাণ? আমরা তো চর্মচক্ষে কোনো প্রমাণ। দেখতে পাচ্ছি না, কোনো সংবাদও কেউ আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়নি। বোধ করি পর্বতবাসী। কোনো প্রেতাত্মা পলাতকদের সংবাদ তোমাকে দিয়ে গেছে!
–আমার সঙ্গে এসো।
পর্বত অভিমুখে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একস্থানে ভূমির দিকে পরন্তপের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শায়ন বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছ?
তীক্ষ দৃষ্টিতে স্থানটি পর্যবেক্ষণ করতে করতে পরন্তপ বলল, প্রায় একহাত উঁচু ছোটো ছোটো চারাগাছগুলির মধ্যে পলাতকদের সন্ধান করার কোনো উপায় তো দেখছি না।
শায়ন হাসল, প্রিয় পরন্তপ না, না, দারুক!–ঈশ্বর তোমাকে একজোড়া চোখ দিয়েছে, কিন্তু তুমি সেই চোখের ব্যবহার জানো না। ভালো করে চেয়ে দেখ একটি গুল্মের শাখা ভগ্ন হয়ে তরল নির্যাস নির্গত হচ্ছে।
তপ্তস্বরে পরন্তপ বলল, তা থেকে কি বুঝব?
-বুঝবে এই যে, আকস্মিক আঘাতের ফলেই চারাগাছটির এই দুর্দশা। হঠাৎ এই গুল্মটির উপর আঘাত আসবে কোথা থেকে? একমাত্র ধাবমান অশ্বের পদাঘাতেই চারাগাছটির এই অবস্থা হতে পারে। অশ্ব এই পথে ছুটলে পর্বত অভিমুখেই যাবে সন্দেহ নেই। এখন বলো, আমার ধারণার স্বপক্ষে এটা কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়?
না। আমি এটাকে যথেষ্ট প্রমাণ মনে করতে পারছি না। বন্য ছাগ বা হরিণের পদাঘাতেও চারাগাছটি ওই ভাবে ভাঙতে পারে।
–বন্য ছাগ এই অঞ্চলে বাস করে না। হরিণের পদাঘাতে চারা গাছ ভাঙতে পারে, কিন্তু এমনভাবে বিধ্বস্ত হবে না। অরণ্যে মৃগয়ার সন্ধানে ঘোরাঘুরি করে পশুচরিত্র সম্পর্কে কিছু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জানি এই গুল্ম হরিণের প্রিয় খাদ্য। অথচ কোনস্থানে গুল্মের উপর হরিণের দন্তাঘাতের চিহ্ন নেই। প্রিয় খাদ্যে ক্ষুন্নিবৃত্তি না করে তাকে পদদলিত করবে এমন হরিণ বোধ হয় আজও মৃগবংশে জন্মগ্রহণ করেনি।
–এই সামান্য প্রমাণ সম্বল করে তুমি যদি পর্বত-অভিমুখে যাত্রা করতে চাও, তাহলে আমি তোমার সঙ্গী হতে আপত্তি করব না; কিন্তু সমস্ত পরিশ্রমই পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে বলে মনে হয়। এখন বলো– ওই দুটি পর্বতের মধ্য নিকটবর্তী পর্বতেই ওরা আশ্রয় নিয়েছে বলে তুমি মনে করো কি? নাকি, দ্বিতীয় পর্বতটিতেই তুমি আবোহণ করতে চাও?
খুব স্বাভাবিক যুক্তিতেই বোঝা যায় নিকটবর্তী পর্বতেই পলাতকরা আশ্রয় নিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু যুক্তি দিয়ে বিচার করার প্রয়োজন নেই। নিকটস্থ পর্বতের কোনো স্থানে তারা আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাও আমার জানা হয়ে গেছে।
–বলো কি! শায়ন! তোমাকে দক্ষ তিরন্দাজ বলেই জানতাম, কিন্তু তুমি যে অন্তর্যামী হয়ে উঠেছ সে কথা জানতাম না।
অন্তর্যামী হইনি দারুক, অন্তর্যামী হইনি। গিরিপথ আর বনভূমির বুকে মৃগয়ার সন্ধানে বিচরণ করতে করতে আমি পশুচরিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং দৃষ্টিশক্তিকে ব্যবহার করতে শিখেছি। বনের পশু এর মধ্যেই আমাকে পলাতকদের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছে।
