উচ্চভূমিতে পরন্তপের ডান হাত একটা ছুরির হাতলে চেপে বসল। শায়ন ও কর্ণদেব ধনুকে বাণ লাগিয়ে নিল। বল্লভ তার প্রকাণ্ড কুঠারের হাতল চেপে ধরল শক্ত মুঠিতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে প্রান্তরের বুকে জাগল ঘন ঘন অশ্বখুরধ্বনি!
নীচে দস্যুদল আর উপরে পরন্তপেরদল চমকে উঠে দেখল দস্যুদের বাঁধা ঘোড়াগুলি হঠাৎ মুক্ত হয়ে প্রান্তরের উপর দিয়ে ছুট অরণ্যের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে! শুধু একটি ঘোড় তীরবেগে ছুটে আসছে দুস্যদের দিকে এবং তার পিঠের উপর তরবারি হাতে উপবিষ্ট হয়েছে পূর্বে উল্লিখিত আগন্তুক।
.
১৪. ধন্য শায়ন ধন্য
ঘটনাটা কি ঘটছে ভালো করে উপলব্ধি করার আগেই ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আগন্তুক এসে পড়ল দস্যুদলের মধ্যে প্রথমেই তার তরবারির আঘাতে প্রাণ হারিয়ে ধরাশায়ী হল দলপতি, তারপরই আর দুজন দস্যুর রক্তাক্ত দেহ মৃত্যুশয্যায় লুটিয়ে পড়ল।
ভীত আর্তনাদে চারদিক কাঁপিয়ে দস্যুরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তরবারির দ্রুত সঞ্চালনে শল্যের বন্ধনরঙ্কু ছিন্ন করে আগন্তুক তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল এবং সবেগে বাহনকে চালনা করল পশ্চাৎবর্তী অরণ্যের অভিমুখে।
দস্যুদলে অবস্থিত ধনুর্বাণধারী দুই দুবৃত্তের মধ্যে একজন আগেই আগন্তুকের অসির আঘাতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল– অপর ব্যক্তি পলায়মান অশ্বের আরোহীদের লক্ষ্য করে চকিতে শরনিক্ষেপ করল। জ্যা-মুক্ত বাণ শল্যের দেহে বিদ্ধ হল। পরক্ষণেই আগন্তুক ও বাণহত শল্যকে বহন করে অশ্ব অরণ্যের গর্ভে অদৃশ্য হল।
অশ্ব যে-পথে অন্তর্ধান করেছে, সেই দিকে তাকিয়ে বিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল দস্যুর দল। প্রথম সংবিৎ ফিরে পেল কৰ্ণদেব। সঙ্গীদের উদ্দেশ করে সে বলে উঠল, বল্লভ! শায়ন! দারুক। তোমরা এস, অশ্বপৃষ্ঠে আমরা ওদের অনুসরণ করব। যেভাবেই হোক শল্যকে উদ্ধার করতেই
আত্মবিস্মৃত কর্ণদেবের উচ্চকণ্ঠ নিকটবর্তী দস্যুদের মধ্যে কয়েকজনের শ্রুতিগোচর হয়েছিল। শব্দ অনুসরণ করে মুখ তুলতেই পাথরের আড়াল থেকে চারটি মানুষের মাথা তাদের চোখে পড়ল। একজন চিৎকার করে উঠল, সাবধান! চারদিকে শত্রু! তোমরা
কথা শেষ হওয়ার আগেই শূন্যপথে উড়ে গিয়ে পরন্তপের নিক্ষিপ্ত ছুরি বক্তার কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল।
আর একটি ছুরি শুন্যে তুলে প্রচণ্ড কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল পরন্তপ, শায়ন! কর্ণদেব! ওদের হত্যা করো। ওরা বেঁচে থাকতে আমরা নিরাপদ নই।
পরক্ষণেই সূর্যালোকে বিদ্যুৎবর্ষণ করে ছুটে গেল শাণিত ছুরিকা ও ধনুমুক্ত বাণ এবং ভূমিপৃষ্ঠকে রক্তাক্ত করে তুলল আরও তিনটি দস্যুর মৃতদেহ।
হতাবশিষ্ট দস্যুরা অরণ্যের নিরাপদ আশ্রয় লক্ষ্য করে ছুটল। কিন্তু শায়নের ধনুক দ্রুত বাণবর্ষণ করে তাদের ইহলীলা সাঙ্গ করে দিল।
ছুটে গিয়ে অশ্বকে বন্ধনমুক্ত করে একলাফে পরন্তপ তার পিঠে উঠে বসল, তারপর উচ্চৈঃস্বরে বলল, বন্ধুগণ! আমাদের একটি সমস্যা মিটে গেল। দুরাত্মা দস্যুর দল আর আমাদের বিরক্ত করতে পারবে না। কিন্তু সম্মুখে আর এক সমস্যা অপরিচিত অশ্বারোহীর কবল থেকে শল্যকে উদ্ধার করতে হবে। শীঘ্র চলো, পলাতক অশ্বারোহীকে অনুসরণ করো।
কথা শেষ করেই পরন্তপ সবেগে বাহনকে চালনা করল এবং ঢালুপথে নীচে না নেমে উপর থেকেই অশ্বপৃষ্ঠে অবতীর্ণ হল তলদেশে অবস্থিত সমতলভূমির উপর!
মুহূর্তমাত্র অপেক্ষা না করে যে-পথে অজ্ঞাত অশ্বারোহী শল্যকে নিয়ে অন্তর্ধান করেছে, সেই দিকেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল পরন্তপ।
বল্লভ সবিস্ময়ে দেখল একই ভঙ্গিতে অশ্বকে চালনা করে উপর থেকে নীচে লাফ দিয়ে নেমে গেল শায়ন ও কর্ণদেব এবং একটুও না থেমে পরন্তপকে অনুসরণ করল বায়ুবেগে!
ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে বল্লভ আপনমনেই বলল, ওরা রাগ করুক আর যাই করুক, আমি অমনভাবে এই পাহাড়ি পথে ঘোড়া ছোটাতে পারব না।
বল্লভ সহজভাবেই ঢালু পথ বেয়ে অশ্বপৃষ্ঠে সমভূমির বুকে অবতরণ করল, তারপর যে-পথে বন্ধুদের ধাবমান অশ্বগুলি অরণ্যের অন্তরালে অদৃশ্য হয়েছে, সেই পথ ধরে অপেক্ষাকৃত দ্রুতবেগে অগ্রসর হল…।
বল্লভ যখন তার বন্ধুদের কাছে পৌঁছল, সে দেখল ঘোড়া থামিয়ে তারা গভীর গবেষণায় ব্যস্ত। কেউ তার দিকে দৃকপাত করল না। অথচ সে ভেবেছিল বিলম্বের জন্য তিরস্কৃত হবে। মনে মনে কৈফিয়ত তৈরি করেই সে এসেছিল, কিন্তু তিরস্কার থেকে নিষ্কৃতিলাভ করেও সে খুশি হতে পারল না বরং বন্ধুরা তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করছে ভেবে সে মনে মনে অপমানিত বোধ করল। কিছুক্ষণ অন্যমনস্কর ভান করে সে আলোচনা থেকে নিরস্ত রইল, কিন্তু শ্রবণেন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে বন্ধুদের কথাবার্তা শুনতে লাগল উত্তর্ণ হয়ে।
পলাতক অশ্বের পদচিহ্ন ধরে এতখানি পথ এসেছে তিন অশ্বারোহী, কিন্তু সম্মুখে কঙ্কর ও প্রস্তরাকীর্ণ কঠিন ভূমির উপর আর পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না বলেই পলাতক কোন্ পথে গেছে তাই নিয়ে তর্ক করছে পরন্তপ ও কর্ণদেব। শায়ন সম্পূর্ণ নীরব। অশ্বের বপ্পা কর্ণদেবের হাতে দিয়ে সে ইতস্তত পদচালনা করছে, মাঝে মাঝে নত হয়ে কি যেন দেখছে ভূমিপৃষ্ঠে, আবার ঊর্ধ্বমুখে অদূরবর্তী পর্বতের দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে গভীর মনোযোগর সঙ্গে…।
হঠাৎ ফিরে এসে কর্ণদেবের হাত থেকে অশ্বের বা গ্রহণ করে শায়ন বলে উঠল, সন্ধান পেয়েছি। অশ্বারোহী শল্যকে নিয়ে ওইদিকে গেছে।
