কঠিন স্বরে পরন্তপ বলল, দেখতেই পাবে। এখন চুপ করে থাকো। কর্ণদেব! তোমার অশ্বের পৃষ্ঠে আমি ধনুক আর শরপূর্ণ তুণীর রেখে দিয়েছি। ওইগুলি নিয়ে এস। বোধহয় শীঘ্রই ধনুর্বাণ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে।
কর্ণদেব নীরবে অধিনায়কের আজ্ঞা পালন করল।… কিছুক্ষণ পরেই দস্যু দলপতি তার দুই সহচরের সঙ্গে বনের ভিতর থেকে এসে প্রান্তরের উপর দাঁড়াল। তার এক সহচরের মাথায় শুকনো কাঠের বোঝা অপর ব্যক্তি বহন করছে দুটি বৃক্ষশাখা। শাখা দুটি সাত-আট হাত দীর্ঘ এবং অতিশয় স্থূল। দলপতির নির্দেশে দুস্যরা শাখা দুটিকে মাটিতে পুঁতে দিল। দুটি শাখার মধ্যবর্তী দূরত্ব চার-পাঁচ হাতের বেশি নয়।
এইবার শল্যকে টেনে এনে তার দুই হাত শক্ত করে দুই বৃক্ষশাখার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল। দলপতির নির্দেশে শুকনো কাঠ স্তূপকারে সাজিয়ে দেওয়া হল শল্যের পায়ের কাছে।
শল্য! দলপিত হেসে বলল, তোমাকে ধীরে ধীরে অগ্নিদগ্ধ করা হবে। দেখ, যদি গুপ্তধনের সন্ধান দাও, তাহলে এখনই নিষ্কৃতিলাভ করতে পারো। নচেৎ শলাকাপ মৃগমাংসের ন্যায় তোমাকে অগ্নিপক্ক করা হবে।
শল্য নীরব। দলপতি হাঁক দিয়ে দস্যুদের বলল, তোমরা কাষ্ঠে অগ্নিসংযোগ করো।
উচ্চভূমির উপরে পরন্তপ তার সঙ্গীদের উদ্দেশ করে বলল, আমি এইখান থেকে সজোরে ছুরিকা নিক্ষেপ করে দলপতিকে বিদ্ধ করব। সঙ্গে সঙ্গে শায়ন ও কর্ণদেব তির নিক্ষেপ করে দস্যুদের হত্যা করতে থাকবে। দস্যুদের মধ্যে দুই ব্যক্তির সঙ্গে ধনুর্বাণ রয়েছে, অপর সকলেরই তরবারি ও ছুরিকা সম্বল। তোমরা প্রথমেই ধনুর্বাণধারী দুই দস্যুকে তিরবিদ্ধ করবে। অতর্কিত বাণাঘাতে বিপর্যস্ত দস্যুদল পলায়নের চেষ্টা করবে। আশা করি প্রথম আক্রমণেই আমরা ওদের পাঁচজনকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিতে পারব। বাকি পাঁচজন প্রাণ নিয়ে পালাতে চেষ্টা করবে, কিন্তু ওদের পালাতে দিলে পরবর্তীকালে আমরা বিপন্ন হতে পারি– অতএব বাণবিদ্ধ দস্যরা ধরাশায়ী হতে না হতেই এই স্থান হতে লাফিয়ে পড়ে আমি অন্যান্য দস্যুদের আক্রমণ করব। বল্লভ! তুমি কুঠার হস্তে আমার সহযাত্রী হবে এবং প্রথম সুযোগেই শল্যকে বহন করে এই উচ্চভূমির উপর নিয়ে আসবে। আচ্ছা, এইবার প্রস্তুত হও। মনে রেখো আমি ছুরিকা নিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে তোমরাও শর নিক্ষেপ করবে। তার আগে কিন্তু আরে! আরে! ও আবার কে!
পূর্ণকুটিরের পশ্চাৎবর্তী অরণ্য ভেদ করে যে মানুষটি হঠাৎ প্রান্তরের উপর এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে দেখেই পরন্তপের বিস্ময়-চকিত উক্তি– ও আবার কে!
আগন্তুকের চেহারা দেখলেই মনে হয় তরবারি ও তৃণীর সম্বল করে যে সকল ভাগ্যান্বেষী যোদ্ধা আর্যাবর্তের বুকে বিচরণ করে, এই ব্যক্তি তাদেরই একজন।
আগন্তুক সশস্ত্র। পষ্ঠে ধনুর্বাণ, কটিতে অসি ও ছুরিকা। গায়ের রং তপ্ত কাঞ্চনের মতো, দাড়িগোঁফ আর ঘন কেশের অরণ্যে আবৃত মখমণ্ডল ও মস্তক– দীর্ঘ উন্নত দেহ, পেশীবদ্ধ গ্রীবা, বিশাল বাহু এবং বৃষবৎ স্কন্ধের প্রশস্ত বিস্তার মানুষটির অসধারণ দৈহিক শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। বক্ষের বামদিক বেষ্টন করে দক্ষিণ কটি পর্যন্ত নেমে এসে একটি সবুজ উত্তরীয় উর্ধ্বাঙ্গের নগ্নতা নিবারণ করছে, অধমাঙ্গে পীতাভ বস্ত্র যোদ্ধৃসুলভ ভঙ্গিতে দৃঢ়ভাবে পরিহিত। পায়ে চর্মরঙ্গুতে আবদ্ধ চর্মপাদুকা।
দস্যুরা শল্যকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল, আগন্তুককে তারা দেখতে পায়নি। মানুষটি ধীর পদে এগিয়ে এসে যখন শুল্যের নিকট দণ্ডায়মান হল, তখনই তারা সচমকে তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হল।
দলপতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, কে তুমি?
আগন্তুক উত্তর দিল, আমি পথিক। কিন্তু এখানে কি হচ্ছে?
একজন দস্যু কর্কশ স্বরে বলল, এখানে যাই হোক, তাতে তোমার কি?
যে দস্যুটি চকমকি পাথর ঠুকে অগ্নিসংযোগ করার চেষ্টা করছিল, তার দিকে তাকিয়ে আগন্তুক বলল, তোমরা কি নরমাংস ভক্ষণ করো নাকি? এই ব্যক্তিকে অগ্নিদগ্ধ করে তোমরা ক্ষুধা নিবারণ করবে?
ভীষণ গর্জন করে দলপতি তার কোষ থেকে তরবারি আকর্ষণ করল, ওরে নির্বোধ! এখানে অধিকক্ষণ থাকলে তোরও এই দশা হবে। যা, এই স্থান ত্যাগ করে পলায়ন কর।
আগন্তুক এক পা পিছিয়ে বলল, যথা আজ্ঞা। আমি এখনই এই স্থান ত্যাগ করছি। আমার বিবেচনায় এই স্থান অতিশয় অস্বাস্থ্যকর।
সে বামদিকে অরণ্য অভিমুখে পদচালনা করল এবং দেখতে দেখতে বনমধ্যে অদৃশ্য হল তার সুদীর্ঘ দেহ।
কিছুক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে থেকে দলপতি বলল, গর্দভটাকে শেষ করে দিলেই ভালো হত।
একজন দস্যু বলল, আমাদের দলে লোকসংখ্যা তাহলে কিছু কমে যেত।
দলপতি ভ্রু কুঞ্চিত করল, মাধব! তোর চাইতে ঐকটা ইঁদুরেরও বেশি বুদ্ধি আছে। মারব ওই লোকটাকে, আর লোক কমবে আমাদের দলে?
মাধব নামে দস্যুটি হেসে বলল, লোকটাকে দেখে কি মনে হয়, ওই লোক মার না দিয়ে মার খাওয়ার মানুষ? তুমি এখনো মানুষ চেন না? এতগুলো লোকের পাল্লায় পড়লে মানুষটা মারা পড়ত ঠিকই, কিন্তু যমরাজের কাছে যাওয়ার সময় আমাদের দল থেকে কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে যেত।
দস্যুদের মধ্যেও কয়েকজন বক্তার কথায় সায় দিল।
দলপতি রুষ্টস্বরে বলল, বাজে কথা রেখে এইবার আসল কাজে মন দে। নে, আগুন লাগা।
চকমকির ছোঁয়ায় এতক্ষণে কাঠের স্তূপে আগুনের ঝলক দেখা দিল।
