পরন্তপ বলল, না পাঁচজন নয়- যতদূর জানি বিদ্রোহী দস্যুদের সংখ্যা আট কি দশ হবে। ওই কুটির ছিল শল্যের গোপন বাসস্থান। বর্তমানে তার বাসস্থানই তার কারাগারে পরিণত হয়েছে। কুটিরের মধ্যে অন্যান্য দস্যুরা রয়েছে কিনা, অথবা থাকলেও কতজন আছে, এখান থেকে তা অনুমান করা সম্ভব নয়। কেউ কেউ হয়তো শিকারের সন্ধানে নিকটস্থ অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করেছে। তবে দ্বিপ্রহরে মধ্যাহ্ন ভোজনের সময়ে সকলেই এখানে সমবেত হবে। দস্যুদল একত্রে ভোজন করে। সেইটাই পদ্ধতি। খুব সম্ভব, কুটিরের নিকট কোনো বৃক্ষের তলদেশে ওরা সমবেত হয়ে ভোজন করবে। সেইটাই হবে আক্রমণের উপযুক্ত সময়।
বল্লভ বলল, মধ্যাহ্ন ভোজনের এখনো যথেষ্ট বিলম্ব আছে। সূর্য এখনও প্রখর হয়নি। আপাতত আমরা কি করব?
পরন্তপ বলল, শুধু ওদের উপর দৃষ্টি রাখা ছাড়া আপাতত আর কোনো কাজ নেই।
শায়ন বলল, একটু দূরে গাছের তলায় চারটি ঘোড়া বাঁধা আছে। মনে হয়, সর্বসমেত দস্যুদলে ছয়জন আছে।
পরন্তপ বলল, ঘোটকের সংখ্যা দিয়ে দস্যুদের সংখ্যা নির্ণয় করার চেষ্টা করলে ভুল হবে। প্রত্যেক দস্যুই যে অশ্বারোহী তা নয়। ওই যে শ্বেতবর্ণ অশ্বটি দেখছ, ওই অশ্বের প্রকৃত অধিকারী হচ্ছে শল্য- তবে আমার মনে হয় বর্তমানে শ্বেত অশ্বটিকে অধিকার করেছে বিদ্রোহী দস্যুদের দলপতি স্বয়ং।
বল্লভ বলল, যুদ্ধের এখনও বিলম্ব আছে। এই অবসরে কিছু ভক্ষণ করতে পারলে ভালো হত। আমার বিলক্ষণ ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে। পরন্তপ ভ্রু কুঞ্চিত করল।
কর্ণদেব হাসল, দারুক! বল্লভের ক্ষুধা কিন্তু বেশি। অবিলম্বে ওই ক্ষুধাকে প্রশমিত করতে না পারলে যথাসময়ের বল্লভের বিক্রম সম্যক প্রকাশিত হবে না।
পরন্তপ বলল, আমার অশ্বের পৃষ্ঠদেশে বেশ কিছু ফল ও শলাকাপক্ক শুষ্ক মাংস আছে। অসময়ে প্রয়োজন হতে পারে বলে ওই খাদ্য আমি সঙ্গে এনেছি। কিন্তু এত শীঘ্র যে বল্লভের উদরে অগ্নি প্রজ্বলিত হবে সে কথা ভাবিনি। বল্লভ! এখন ওই মাংস ও ফলের কিয়দংশ দিয়ে তোমার ক্ষুধাকে শান্ত করে। কিন্তু সমুদয় আহার্য উদরসাৎ করো না।
বল্লভ হেসে বলল, না, না। আমি অত স্বার্থপর নই।
যে উচ্চভূমিতে আশ্রয় দিয়ে চারটি দুর্ধর্ষ মানুষ তলদেশের পটভূমির উপর নজর রাখছিল, সেই উচ্চভূমির এক পাশে একটি প্রকাণ্ড পাথরের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল চারটি অশ্বকে। বল্লভ সেইদিকে পা বাড়িয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
নিকটবর্তী অরণ্যের ভিতর থেকে একটি বাণবিদ্ধ হরিণের মৃতদেহ বহন করে প্রান্তরের উপর আত্মপ্রকাশ করেছে তিনটি সশস্ত্র পুরুষ!
যে পাঁচটি মানুষ এতক্ষণ নিবিষ্টচিত্তে বাক্যালাপ করছিল, তারা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সোল্লাসে শিকারিদের অভ্যর্থনা জানাল। কুটিরের দ্বারপথে মুখ বাড়িয়ে মৃগয়ালব্ধ হরিণটিকে দেখে চিৎকার করে আনন্দ প্রকাশ করল।
পরন্তপ ও তার তিন সঙ্গী বুঝল পূর্বোক্ত তিন ব্যক্তি দস্যুদের দলের মানুষ, তারা অরণ্যে প্রবেশ করেছিল সকলের জন্য মাংসের ব্যবস্থা করতে এখন মৃগয়ালব্ধ মৃগমাংস দেখে দস্যুদল আসন্ন ভোজের সম্ভাবনায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে।
কিছুক্ষণ তাদের উল্লাসধ্বনি শ্রবণ করে বল্লভ আবার ফিরল অশ্বপৃষ্ঠ থেকে আহার্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কুটিরের ভিতর থেকে একটা কাতর আর্তনাদ ভেসে আসতেই সে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কয়েক মুহূর্তে পরেই কুটিরের দ্বারপথ দিয়ে বাহিরে এল তিন ব্যক্তি। একজনের কোমরে দড়ি বাঁধা। দড়ির প্রান্ত একব্যক্তির হাতে, অপরজন মুষ্টিবদ্ধ হাত আস্ফালন করে রজ্জবদ্ধ মানুষটিকে ভর্ৎসনা করছে এবং মাঝে মাঝে প্রহার করছে। প্রহৃত ব্যক্তি সম্পূর্ণ মৌন, আঘাতের যন্ত্রণা অসহ্য হলে আর্তনাদ করে উঠেই আবার স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তারা প্রান্তরের উপর এগিয়ে আসতেই তাদের কথাবার্তা পরন্তপ ও তার সঙ্গীদের শ্রুতিগোচর হল। যে ব্যক্তি আস্ফালন সহকারে বন্দিকে প্রহার করছিল, সে বন্দিকে উদ্দেশ করে ক্রুদ্ধস্বরে বলল, শল্য! আজই তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি ধনভাণ্ডারের সন্ধান দাও, তাহলে প্রাণে বাঁচবে। না হলে, এইখানেই তোমাকে আমরা হত্যা করব।
উচ্চভূমিতে অপেক্ষমাণ চারটি মানুষ বুঝল ওই বন্দি হচ্ছে শল্য নামক দস্যু। যে ব্যক্তি বদ্ধমুষ্টি আস্ফালন করে শল্যকে প্রহার করছিল, সে নিশ্চয়ই বিদ্রোহী দস্যুদের দলপতি।
শল্য কোনো উত্তর দিল না। দেখে আরও ক্রুদ্ধ হয়ে দলপতি শল্যের মুখে প্রচণ্ড বেগে মুষ্টাঘাত করল। কাতর আর্তনাদ করে রক্তাক্ত মুখে শল্য ধরাশায়ী হল।
দলপতি বলল, তুমি সহজে মুখ খুলবে না। আচ্ছা, তোমার ব্যবস্থা করছি।
ঘুরে দাঁড়িয়ে নিকটস্থ এক দস্যুকে উদ্দেশ করে দলপতি বলল, রাঘব! কুটিরের ভিতর থেকে একটি কুঠার নিয়ে এস।
তৎক্ষণাৎ কুটিরের ভিতর থেকে একটি কুঠার নিয়ে রাঘব ফিরে এল। আর একটি দস্যুকে ডেকে দলপতি বলল, রাঘব আর কঞ্জুক, তোমরা আমার সঙ্গে বনের ভিতর চলো।
দুই দস্যুকে নিয়ে দলপতি বনের ভিতর প্রবেশ করল। শল্য হেঁটমুণ্ডে বসে রইল প্রান্তরের উপর। তাকে ঘিরে রঙ্গরসিকতা করতে লাগল অন্যান্য দস্যবৃন্দ।
বল্লভ ফিসফিস্ করে জিজ্ঞাসা করল, দারুক! দলপতি কুঠার নিয়ে দুই দস্যুর সঙ্গে বনমধ্যে প্রবেশ করল কেন?
