বিস্ময়-বিহ্বল স্বরে পরন্তপ বলল, তুমি অমিত শক্তিধর পুরুষ। তোমার ক্ষমতা সম্পর্কে আমার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই।
শায়ন বলল, তাহলে আমরা এখনই অভীষ্ট স্থান অভিমুখে যাত্রা করছি?
-হ্যাঁ। এখন যাত্রা করলে কাল প্রত্যূষে অথবা পূর্বাহ্নে আমরা যথাস্থানে পৌঁছে যাব। সেখানে পৌঁছে অবস্থা অনুসারে ব্যবস্থা হবে।
অভীষ্ট স্থান কতদুরে জানতে পারি কি?
প্রায় ছয় ক্রোশ।
ছয় ক্রোশ!
বল্লভ সভয়ে বলল, আমি পঞ্চাশটি যোদ্ধার সঙ্গে এককভাবে যুদ্ধ করতে ভয় পাই না। কিন্তু ছয় ক্রোশ পথ আজ রাত্রে অতিক্রম করতে হলে আমার ন্যায় স্থূলকায় মানুষ নির্ঘাত মৃত্যুবরণ করবে। দ্রুত পদচালনায় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
শায়ন বলল, আমি দ্রুত ধাবন ও ভ্রমণে অভ্যস্ত। তবু এক রাতের মধ্যে পদব্রজে ছয় ক্রোশ পথ অতিক্রম করা আমার পক্ষেও কঠিন।
কে বলল আমরা পদব্রজে যাব? পরন্তপ গম্ভীরস্বরে বলল, অশ্ব প্রস্তুত আছে। আমরা অশ্বারোহণে যাত্রা করব।
একটু থেমে সে আবার বলল, আরও একটা কথা, সময় বিশেষে আমাদের সঙ্গে অন্যান্য লোকজনের সাক্ষাৎ হতে পারে। পরন্তপ নামে আমাকে সম্বোধন করলে বহু মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। যদিও শ্রাবস্তী রাজ্যে এই নামে বহু মানুষ আছে, তবু অনর্থক সন্দেহের বিষয়বস্তু হয়ে নিজেদের বিপন্ন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অতএব, এখন থেকে তোমরা আমাকে দারুক নামেই সম্বোধন করবে। নিজেদের মধ্যে পরন্তপ নামে সম্বোধন করলে বিপত্তির ভয় নেই, কিন্তু মানুষ অভ্যাসের দাস– অপর ব্যক্তির সম্মুখে পরন্তপসম্বোধন সময় বিশেষে ভীষণ বিপদের সূচনা করতে পারে। তাই এখন থেকে সর্বদাই তোমাদের কাছে আমি দারুক। কথাটা যেন মনে থাকে।
থাকবে, শায়ন বলল, কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন আছে।
–বলো।
আমরা তোমার সঙ্গে এমন এক অভিযানে যোগ দিচ্ছি, যার পরিণামে আমাদের পক্ষে কোনো কোনো ব্যক্তির, এমনকি সকলেরই মৃত্যু ঘটা অসম্ভব নয়।
-সে কথা তো আগেই বলেছি। সব জেনেই তোমরা আমার সঙ্গী হতে সম্মত হয়েছ।
-নিশ্চয়। কিন্তু আমাদের অধিনায়কের মুখের চেহারা আমরা দেখতে চাই। কি বলল বল্লভ?
–আমিও ওইকথা বলতে যাচ্ছিলাম। শায়ন! তুমি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছ।
পরন্তপ ইতস্তত করতে লাগল।
দারুক, গম্ভীরস্বরে শায়ন বলল, আমার অনুরোধ না রাখলে আমি এখান থেকেই ফিরে যাব।
বল্লভ বলল, আমারও সেই কথা।
বেশ, পরন্তপ বলল, কিন্তু পরবর্তীকালে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও তোমরা অপরিচিতের ন্যায় ব্যবহার করবে। শপথ করো- কার্যসিদ্ধি হলে কখনো আমার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করবে না। দৈবক্রমে যদি আমার সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ হয়, তাহলেও বাক্যালাপের চেষ্টা করবে না।
শায়ন বলল, আমি শপথ করছি ভবিষ্যতে কখনো তোমার মুখদর্শন করার চেষ্টা করব না। দেখা হলেও বাক্যালাপ থেকে বিরত থাকব।
বল্লভ বলল, আমারও সেই কথা।
উষ্ণীষ ও তৎসংলগ্ন বস্ত্রের আবরণ মুক্ত হল। সকলের চোখের সামনে ভেসে উঠল এক মধ্যবয়স্ক পুরুষের মুখ। অন্ধকারের মুখের রং ভালো বোঝা যায় না, তবু মনে হল উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, রৌদ্রদগ্ধ হয়ে তাম্রবর্ণ ধারণ করেছে। মস্তকে কৃষ্ণ কেশরাশি, ললাট অপ্রশস্ত, রোমশ জ্বর তলায় না-ছোটো না বড় দুই চোখে তীব্র দৃষ্টি, গুম্ফরেখার নীচে পরিপূর্ণ ওষ্ঠাধরে ক্ষীণ হাসির আভাস চিবুক ও মুখমণ্ডল ক্ষৌরকর্মের কল্যাণে পরিচ্ছন্ন ও পরিমার্জিত।
বল্লভ ও শায়ন তীব্র দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেও যোদ্ধা সুলভ কাঠিন্য ও দৃঢ়তায় চিহ্নিত সেই মুখে দস্যুজনোচিত বর্বর হিংসার ছায়া আবিষ্কার করতে পারল না।
মুখের অধিকারী হেসে বলল, আশা করি ভোমারা সন্তুষ্ট হয়েছে।
মৌনমুখে দুজনেই মাথা নেড়ে জানাল তারা সন্তুষ্ট হয়েছে।
–অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে এসো।
তিনজনেই নীরবে পরন্তপকে অনুসরণ করল। একটু দূরে অন্ধকার আচ্ছন্ন ঝোপের মধ্যে চারটি অশ্ব দৃষ্টিগোচর হল। একটি গাছের সঙ্গে ঘোড়া চারটিকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পরন্তপের ঈঙ্গিতে তাদের বন্ধন মুক্ত করে তিনজন তিনটি অশ্বে আরোহণ করল। চতুর্থ অশ্বটির পৃষ্ঠে একলক্ষে উপবিষ্ট হয়ে পরন্তপ বাহনকে সবেগে ছুটিয়ে দিল…।
অশ্বপৃষ্ঠে তাকে অনুসরণ করল আর্যাবর্তের তিনটি দুর্ধর্য মানুষ…।
.
১৩. অপরিচিত আগন্তুক
উচ্চভূমির উপর থেকে নীচে সমতল ভূমিতে অবস্থিত একটি সুবৃহৎ পর্ণকুটিরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে পরন্তপ বলল, ওইখানে রয়েছে শল্য। ওই কুটিরের ভিতর থেকেই ওকে উদ্ধার করতে হবে।
তার তিন সঙ্গী নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল–
কুটিরের নিকটেই অলস বাক্যালাপে সময় অতিবাহিত করছে পাঁচটি বিভিন্ন বয়সের মানুষ। প্রত্যেকেই সশস্ত্র। কটিবন্ধে ছুরিকা ও তরবারি রয়েছে। একজনের পৃষ্ঠে ধনুর্বাণও দেখা গেল।
শায়ন বলল, আমরা তো নিশ্চয়ই রাত্রে আক্রমণ করব?
দলের অধিনায়ক পরন্তপ বলল, না। রাত্রে শল্যকে নিয়ে পলায়নের অসুবিধা আছে। ওই অঞ্চলের বনপথ তোমাদের পরিচিত নয়। তাছাড়া এই অরণ্য হিংস্র শ্বাপদের প্রিয় বাসভূমি। অন্ধকারে বন্যপশু কর্তৃক আক্রান্ত হলে আমরা আত্মরক্ষা করতে পারব না।
বল্লভ প্রশ্ন করল, ওই পাঁচটি দস্যু যদি শল্যকে বন্দি করে রেখে থাকে, তাহলে উদ্ধার কার্য নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। ইচ্ছা করলে এখনই ওদের বিধ্বস্ত করে আমরা শল্যকে উদ্ধার করতে পারি।
