কর্ণদেব গম্ভীরস্বরে বলল, করমর্দন করে বল্লভের শক্তিপরীক্ষা করতে চাও?… পরন্তপ! ওই কর্মটি করো না। করমর্দনের ফলে তোমার করতল চুর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি তা না হয়, তাহলেও অন্তত কয়েকটা দিন ওই হাতে অস্ত্রধারণ করা তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে একবার বল্লভের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে পরন্তপ বলল, আমাদের কিশোর বন্ধু কর্ণদেবের আজ্ঞা শিরোধার্য। এই মুহূর্তে দক্ষিণ হস্তটি আমার পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু। ওই বস্তুটিকে অটুট রাখার জন্য বল্লভের সঙ্গে করমর্দনের দুর্লভ আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলাম।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে পরন্তপ আবার বলল, তাহলে শল্যকে উদ্ধার করার জন্য আমরা চারজন যাত্রা করছি? অর্থের বণ্টন বিষয়ে যে ব্যবস্থা ধার্য হয়েছে, সে কথা নিশ্চয়ই কর্ণদেব তোমাদের বলেছে। তাহলেও আমি আবার বলছি- গুপ্তধন উদ্ধার করতে সমর্থ হলে ওই সম্পদ সমান চারভাগে ভাগ হবে। আশা করি ওই ব্যবস্থায় তোমাদের আপত্তি নেই?
বল্লভ ও শায়ন সমস্বরে জানাল ওই ব্যবস্থায় তাদের কিছুমাত্র আপত্তি নেই।
আরো একটা কথা, পরন্তপ বলল, শল্যের উদ্ধারকার্য যে খুব সহজে হবে না একথা নিশ্চয়ই তোমরা বুঝতে পারছ। দুস্যরা আমাদের চাইতে সংখ্যায় অনেক বেশি এবং প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার খেলা খেলতে তারা সর্বদাই প্রস্তুত। তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে আমাদের পক্ষেও হতাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে একথা বলে আমি পূর্বেই তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। ভেবে দেখ– যদি কারও প্রাণের ভয় থাকে, তার এখনও সরে যাওয়ার সময় আছে।
শায়ন এগিয়ে এসে রূঢ়স্বরে বলল, পরন্তপ! আমরা শিশু নই। শল্যকে দস্যুদের কবল থেকে উদ্ধার করতে গেলে তারা যে আমাদের পাদ্য-অর্ঘ দিয়ে অভ্যর্থনা করবে না এটুকু উপলদ্ধি করার মতো বুদ্ধি আমাদের আছে। আমি দস্যুবৃত্তি করি না। কিন্তু ধনুর্বাণ ও অসি সম্বল করে নরখাদক সিংহ, ব্যাঘ্র অথবা মদোন্মত্ত হস্তীর আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছি বারংবার। প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার খেলায় আমি অভ্যস্ত। শুধু হিংস্র পশু নয়– একাধিক পশুবৎ হিংস্র মানুষও আমার অসি ও শায়কের চিহ্ন দেহে ধারণ করে যমালয়ে ভ্রমণ করতে গেছে। অতএব মিছেমিছি বিপদের কথা না বলে এখন আমাদের কি কর্তব্য সে কথাই বলো।
পরন্তপ বলল, শায়ন! আমি তোমাকে ভালোভাবেই জানি। তবু কর্তব্যবোধে আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। দস্যুদলের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়ে শল্যকে উদ্ধার করলেও বিপদের কবল থেকে আমরা মুক্তি পাচ্ছি না। বনপথে হিংস্র জন্তুর ভয় আছে। তার চেয়েও ভয়ানক অনার্য যোদ্ধার দল উদ্যত ধনুর্বাণ হস্তে পাহারা দিচ্ছে সীমান্ত অঞ্চলে। তাদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করা খুবই কঠিন। আমি জানি তোমরা সাহসী মানুষ, সেইজন্যই তোমাদের সাহায্য চেয়েছি। তবু অভিযানের নেতা হিসাবে এই সকল বিপদ-আপদের সম্ভাবনা জানিয়ে আমি তোমাদের সতর্ক করে দেব। সব জেনেও যদি তোমরা আমার সঙ্গে যোগ দাও, তাহলে আমি আনন্দিত হব। মনে রেখো- এই কাজে পদে পদে প্রাণের আশঙ্কা বর্তমান।
শায়ন বলল, আমার অভিমত পুর্বেই তোমাকে জানিয়েছি। এবিষয়ে আর আলোচনা না করে ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি অবিলম্বে স্থির করা প্রয়োজন।
পরন্তপ বলল, বল্লভের মতামত আমি এখনও শুনতে পাইনি। বল্লভ! তুমি নীরব কেন? বিপদের কথা শুনে তোমার মনে আতঙ্কের সঞ্চার হয়েছে? তাহলে বলল, এখনও ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বল্লভ শান্তস্বরে বলল, আমি মৌন ছিলাম, তার কারণ মৌনই সম্মতির লক্ষণ। এখন জানতে চাই শল্যকে উদ্ধার করতে আমরা কখন যাত্রা করব।
–এখনই।
বল্লভ ও শায়ন একসঙ্গে বলে উঠল, এখন! সেকি!
পরন্তপ বলল, শুভস্য শীঘ্রং। বিলম্বে প্রয়োজন কি?
শায়নের পৃষ্ঠে রক্ষিত ধনুর্বাণ ও কটিদেশে বিলম্বিত তরবারির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সে বলল, শায়ন তো দেখছি সশস্ত্র হয়েই এসেছে। তবে বল্লভের কাছে অস্ত্র নেই এটা চিন্তার কথা। কিন্তু আমাদের কিশোর বন্ধু কর্ণদেব চেষ্টা করলে মধ্যযামের আগেই বল্লভের উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
বল্লভ বলল, কর্ণদেবকে ব্যতিব্যস্ত করার প্রয়োজন হবে না। অস্ত্র আমার সঙ্গেই আছে। কর্ণদেবই আমাকে অস্ত্র নিয়ে আসতে বলেছিল।
পরন্তপ বলল, কোথায়? কোথায় তোমার অস্ত্র?
নত হয়ে পায়ের তলা থেকে বল্লভ তার অস্ত্র তুলে ধরল। ম্লান অন্ধকারে অনাবৃত প্রান্তরের উপর বস্তুটি এতক্ষণ পরন্তপের দৃষ্টিগোচর হয়নি। সবিস্ময়ে বল্লভের হাতের দিকে তাকিয়ে পরন্তপ বলল, কুঠার! এত বড়ো?
কর্ণদেব ও শায়ন পূর্বেই সুবিশাল ওই কুঠারটি দেখেছিল। তারা কোনো মন্তব্য প্রকাশ করল না। কুঠারফলকের একপাশে সস্নেহে হস্ত স্থাপন করে বল্লভ বলল, এইটি আমার অস্ত্র। দণ্ড ও কুঠার ছাড়া অন্য অস্ত্র ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত নই। বর্তমান অভিযানে দণ্ডের চাইতে কুঠারই অধিকতর প্রয়োজনীয় মনে হয়।
পরন্তপ বিস্মিত হয়ে বলল, এই গুরুভার কঠার নিয়ে তুমি কি যুদ্ধ করতে পারবে?
উত্তরে সুবিশাল কুঠারটিকে বিদ্যুৎবেগে মাথার উপর কয়েকবার ঘুরিয়ে কুঠারফলক মাটিতে স্থাপন করল বল্লভ– তারপর কুঠারদণ্ডের উপর ভর দিয়ে পরন্তপের মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
