-তবে এখন বিদায় গ্রহণ করছি। সন্ধ্যাকালে পুনরায় দেখা দেখা হবে।
-হ্যাঁ। সন্ধ্যাকালে দেখা হবে। তোমার অস্ত্রগুরু পরন্তপের সঙ্গেও আশা করি সাক্ষাৎ হবে?
–বলাই বাহুল্য।
» ১২. সংখ্যার নাম চার
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিশাল বটবৃক্ষের তলদেশে দাঁড়িয়ে আছে তিন ব্যক্তি কর্ণদেব, বল্লভ, শায়ন। শায়নের আচরণে অস্থিরতার চিহ্ন পরিস্ফুট। সে ইতস্তত পদচালনা করছে, কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আবার পদচালনা করছে। তাকে দেখে পিঞ্জরে আবদ্ধ শার্দুলের কথা মনে পড়ে।
অকস্মাৎ কর্ণদেবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে শায়ন অসহিষ্ণু স্বরে বলে উঠল, কর্ণদেব। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। এখনো যে পরন্তপের দেখা নেই?
কর্ণদেব উত্তর দেওয়ার আগেই পিছন থেকে ভেসে এল গম্ভীর কণ্ঠস্বর, পরন্তপ যথাসময়েই উপস্থিত হয়েছে।
সচমকে ফিরে দাঁড়িয়ে বল্লভ ও শায়ন দেখলে তাদের পিছনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘকায় পুরুষ! উক্ত পুরুষের মাথা ও মুখ কৃষ্ণবর্ণ উষ্ণীষ ও উষ্ণীষ সংলগ্ন বস্ত্রের আবরণে অদৃশ্য, উর্ধ্বাঙ্গে আঙরাখা ও নিম্নাঙ্গে পারসিকদের মতো সেলাই করা পরিচ্ছদ ও কৃষ্ণবর্ণে রঞ্জিত; কটিদেশে লম্বিত রয়েছে দীর্ঘ তরবারি এবং বক্ষস্থলের বামপাশ্ব থেকে দক্ষিণ কটিতট অবধি বেষ্টন করে পিঠের উপর দিয়ে ঘুরে গেছে একটি চমবন্ধনী– ওই বন্ধনীর সঙ্গে ধনুর্বাণের পরিবর্তে সংলগ্ন রয়েছে অনেকগুলি ছুরিকা!
প্রদোষের প্রায়ান্ধকার প্রান্তরের বুকে ওই অপরূপ মূর্তির আকস্মিক উপস্থিতি বল্লভ ও শায়নকে চমকিত করে দিল।
প্রথম কথা বলল বল্লভ, সন্ধ্যার প্রাক্কালে তোমার এখানে আসার কথা ছিল। পরন্তপ! তুমি কথা রাখতে পারোনি।
আবরণের অন্তরাল থেকে মৃদু হাসির শব্দ ভেসে এল, সন্ধ্যার প্রাক্কালে এলে দেখা হবে এই কথাই ছিল। তোমরা ওই সময়ে এসেছ এবং আমার সঙ্গে সাক্ষাৎও হয়েছে। আমি সন্ধ্যার পূর্বে দেখা দেব এমন কথা নিশ্চয়ই কর্ণদেব বলেনি বলেছে কি?
ক্ষণকাল নীরব থেকে বল্লভ বলল, পরন্তপ! তুমি যথার্থ বলেছ বটে। কিন্তু অন্ধকার এখনও ঘনীভূত হয় নি। তুমি কোথা থেকে কেমন করে হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে এসে উপস্থিত হলে সেকথা ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। মুহূর্ত পুর্বেও তোমার অস্তিত্ব আমরা বুঝতে পারি নি। তোমার চালচলন সত্যই রহস্যময়।
পরন্তপ আবার হাসল, রহসময় না হলে মহারাজ রুদ্রদমনের গুপ্তরচবর্গ বহু পূর্বেই আমায় বন্দি করে ফেলত। অথবা একদিন বক্ষে বা ললাটে শায়কচিহ্ন ধারণ করে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করতাম।
হঠাৎ শায়নের তিরকণ্ঠ বেজে উঠল, প্রদোষের অন্ধকারে ভূমির উপর শায়িত অবস্থায় হাত ও জানুর উপর ভর দিয়ে অগ্রসর হলে চলমান মানুষের অস্তিত্ব দণ্ডায়মান মানুষের চোখে সহসা ধরা পড়ে না। মৃগয়ার সময়ে আমরা অভীষ্ট পশুর দিকে ওইভাবেই অগ্রসর হই। এটা এমন কিছু রহস্যময় ব্যাপার নয়। পরন্তপ! অনর্থক নিজেকে রহস্যের আবরণে ঢেকে রাখার চেষ্টা করো না।
পরন্তপ বলল, শায়ন! তুমি মৃগয়ায় অভ্যস্ত বলেই এই ধরনের গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত। অনভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে ওইভাবে আত্মপ্রকাশ করলে সে বিস্ময়ে অভিভূত হবে সন্দেহ নেই।
বল্লভ বলল, আমি সত্যই বিস্মিত হয়ে পড়েছিলাম। পরন্তপ কিছুমাত্র অত্যক্তি করেনি। তা ছাড়া, দস্যু দলপতির পক্ষে রহস্যের আবরণ সৃষ্টি করার প্রয়োজন আছে।
শায়ন বলল, আমরা দস্যু নই। পরন্তপ বর্তমান অভিযানের নেতা হলেও তাকে এখন দস্যু দলপতি বললে ভুল হবে।
পরন্তপ বলল, নিশ্চয়। এবার কাজের কথা বলি। শায়ন! তোমার পরিচয় নিষ্প্রয়োজন। শ্রাবস্তী রাজ্যে তুমি খ্যাতনামা তিরন্দাজ! অসিচালনাতেও তোমার খ্যাতি আছে। তুমি যদি আমাদের দলে যোগ দাও, তাহলে আমি সুখী হব। কর্ণদেবের মুখে সব কিছুই শুনেছ তো?
-শুনেছি। আমি এই অভিযানে যোগ দিতে রাজি আছি।
সাধু! সাধু! এসো, তোমার করমর্দন করি।
হাত বাড়িয়ে পরন্তপ ও শায়ন পরস্পরের করগ্রহণ করল। বেশ কিছুক্ষণ তারা ওইভাবেই অবস্থান করল, তারপর পরন্তপ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, বড়োই সুখী হলাম। শক্তিমান পুরুষের হাতে হাত মিলিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়।
পরন্তপ হাত টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক হলেও ঈষৎ কম্পিত। মনে হয়, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি হঠাৎ দ্রুত হয়ে পড়েছে।
শায়ন সম্পূর্ণ স্তব্ধ। তবে করমর্দনের পরেই তার ললাটে কয়েকটি স্বেদবিন্দুর আবির্ভাব ঘটেছে।
এইবার বল্লভকে সম্বোধন করে পরন্তপ বলল, বল্লভ! আমি তোমাকে জানি না। তবে কর্ণদেবের মুখে যা শুনলাম, তাতে বুঝলাম তুমি জয়দ্রথের চাইতে অনেক বেশি শক্তিমান।… বল্লভ! তুমি তাহলে ওই অভিযানে যোগ দিতে রাজি?
আমি রাজি, বল্লভ হাসল, এখন তুমি আমাকে মনোনীত করবে কি না সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
তোমার ন্যায় মহাবলী পুরুষ আমাদের দলে যোগ দিলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব,দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে পরন্তপ হাসল, বল্লভ। এসো, বন্ধুত্বের শপথ নিয়ে আমরা করমর্দন করি।
বল্লভও হাত বাড়াল। কিন্তু তাদের হাত মিলিত হওয়ার আগেই কর্ণদেব সভয়ে এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে বল্লভের হাত সরিয়ে দিল। ক্রুদ্ধভঙ্গিতে কর্ণদেবের দিকে ফিরে পরন্তপ বলল, এই অদ্ভুত আচরণের অর্থ কি কর্ণদেব?
