-হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে তোমার বক্তব্য শুনতে চাই। তোমার গুরু এক কঠিন কার্যে আমাকে নিয়োগ করতে ইচ্ছুক হয়েছেন শুনে অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে উঠেছি। সত্বর আমার কৌতূহল নিবারণ করো।
–তার আগে তোমার কাছে আমি মাত্র একটি প্রতিশ্রুতি চাই।
–কি প্রতিশ্রুতি?
–প্রতিজ্ঞা করো, আমার প্রস্তাবে সম্মত না হলেও কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে এই বিষয়ে কিছু বলবে না।
-কর্ণদেব! আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমার প্রস্তাব আমার মুখ থেকে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কর্ণগোচর হবে না। এখন বলল, কি তোমার প্রস্তাব?
অতঃপর কর্ণদেব শায়নকে যা বলল সেইসব কথা আমরা পূর্বেই তার মুখ থেকে বল্লভের গৃহে শুনেছি। এখানে পুনরুক্তি অনাবশ্যক। সব কথা শুনে শায়ন কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করল, তারপর বলল, তাহলে পরন্তপই তোমার অস্ত্রশিক্ষার গুরু?… ভাল; দস্যু পরন্তপ যে দক্ষ যোদ্ধা সেই তথ্য আমার অবিদিত নয়। দস্যুবৃত্তিকে আমি সমর্থন করি না কিন্তু যে কাজে পরন্তপ আমার সাহায্য প্রার্থী, সেই কাজে তাকে সাহায্য করতে আমার আপত্তি নেই। বিশেষত অর্থের প্রয়োজন কার না আছে? আমি তোমার প্রস্তাবে সম্মত। কর্ণদেব! বলল- কবে, কোথায়, কখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে?
-যে বটবৃক্ষের তলদেশে পঞ্চপাণ্ডব আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে, সেই বৃক্ষের তলায় আজ সন্ধ্যার প্রাক্কালে পরন্তপের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হতে পারে।
-আজ সন্ধ্যার প্রাক্কালে? অসম্ভব।
অসম্ভব? কেন?
এখান থেকে তিন চার ক্রোশ দূরে এক গ্রামে সিংহের উপদ্রব শুরু হয়েছে। বহু গো-মহিষ ও মানুষ ওই সিংহের কবলে প্রাণ হারিয়েছে। সপ্তাহকাল পূর্বে প্রতিনিধি স্বরূপ কয়েকজন ব্যক্তি এসে আমার সাহায্য প্রার্থনা করে। সিংহটিকে হত্যা করতে পারলে তারা আমাকে দশটি স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিক দিতে প্রতিশ্রুত হয়েছে। অগ্রিম মূল্যস্বরূপ তিনটি স্বর্ণমুদ্রা তারা আমাকে দিয়ে গেছে। আজ দ্বিপ্রহরের মধ্যেই তাদের গ্রামে আমার পৌঁছনোর কথা। ওই নরমাংসলোপ খাপদকে বধ না করে আমি এখন অন্যত্র গমন করতে পারি না।
–এইখান থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে গমন করলে বোধহয় ওই গ্রামে পৌঁছনো যায়। ঐ গ্রামের কিছু আগে বোধ হয় একটি বৃহৎ পর্বতের অস্তিত্ব আছে?
-হ্যাঁ, তুমি ওই গ্রামে গিয়েছে?
তা গিয়েছি বটে। শায়ন! তুমি স্বচ্ছন্দে সন্ধ্যাকালে পরন্তপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারো। ওই সিংহ আর জীবিত নেই।
–সিংহ জীবিত নেই? তুমি কি করে জানলে?
–ঠিক দুই দিন আগে মধ্যাহ্নকালে তরবারির আঘাতে পশুরাজের মৃত্যু ঘটেছে।
তরবারির আঘাতে সিংহকে হত্যা করল কে! আর সে সংবাদ তুমিই বা জানলে কি করে?
–শোনো বলছি। রাজধানীতে আসার জন্য বনপথ অতিক্রম করে চলতে চলতে সিংহের অত্যাচারে সন্ত্রস্ত গ্রামটির মধ্যে এসে পড়েছিলাম। গ্রামবাসী আমাকে নিকটেই নরখাদক সিংহের অস্তিত্ব জানিয়ে সাবধান করে দেয়। নিকটবর্তী পর্বত দেখিয়ে তারা বলে সিংহ নাকি ওই পর্বতেরই এক গুহাতে বাস করে– অতএব উক্ত গিরিপথে ভ্রমণ না করে অন্য পথে ঘুরে যাওয়াই আমার পক্ষে নিরাপদ পন্থা বলে তারা মতপ্রকাশ করে। আমি তাদের সঙ্গে বিতর্কে ব্যাপৃত না হয়ে তাদের কথাতেই সায় দিলাম। কিন্তু কার্যত ওই পর্বতের গিরিপথ ধরেই অগ্রসর হলাম। কারণ, অন্য পথে ঘুরে গেলে রাজধানীতে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সিংহের ভয়ে বিলম্ব করতে আমার অহঙ্কারে বাধল। তাছাড়া প্রখর দিবালোকে সিংহ হয়তো আক্রমণ করতে সাহসী হবে না একথাও মনে হয়েছিল। কিন্তু মধ্যাহ্নের তীব্র সূর্যালোকের মধ্যেই নরখাদক আমাকে আক্রমণ করল। বোধ হয় গ্রামের লোক অত্যন্ত সতর্ক থাকার ফলে পশুরাজ গ্রাম থেকে মাংসের খাজনা আদায় করতে পারেনি, তাই ক্ষুধার্ত হয়ে অপেক্ষা করছিল শিকারের জন্য। যে কারণেই হোক, প্রকাশ্য দিবালোকেই সিংহ আমাকে আক্রমণ করল। তরবারির দ্রুত সঞ্চালনে শ্বাপদের আক্রমণ ব্যর্থ করলাম। আহত ও ক্রুদ্ধ সিংহ পিছনের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আমাকে নখদন্তের আলিঙ্গনে বন্দি করতে সচেষ্ট হল। আমি সজোরে আঘাত হানলাম- তরবারি আমূল প্রবেশ করল সিংহের বক্ষে। আমার তরবারি বক্ষে ধারণ করে মরণাহত পশুরাজ ছিটকে পড়ল পর্বতের তলদেশে। আমি তাড়াতাড়ি পদচালনা করে পৌঁছলাম রাজধানীতে। শায়ন! সেই জন্যই তুমি আমার কটিবন্ধে শূন্যগর্ভ অসিকোষ দেখতে পেয়েছিলে।
শায়ন এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় কর্ণদেবের কাহিনি শুনছিল, এইবার সজোরে তার স্কন্ধে চপেটাঘাত করে বলে উঠল, সাধু! সাধু! কর্ণদেব আজ সন্ধ্যায় আমি নিশ্চিত ওই বটবৃক্ষের তলায় উপস্থিত থাকছি। কিন্তু এখন আমার গৃহে কিছুক্ষণের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করতে তোমার আপত্তি আছে কি? গৃহে তণ্ডুল ও মৃগমাংস আছে। তাতে হয়তো…
বাধা দিয়ে কর্ণদেব বলল, না। পরন্তপ আমার জন্য উদ্বিগ্ন চিত্তে অপেক্ষা করছে। তাকে সমস্ত সংবাদ অবিলম্বে জানানো প্রয়োজন। আরও একটা কথা–
-বলো।
–বল্লভের কথা তোমাকে আগেই বলেছি। সন্ধ্যাকালে তাকেও তুমি পূর্বোক্ত স্থানে দেখতে পাবে। আশা করি বল্লভকে সঙ্গী হিসাবে নিতে তোমার আপত্তি হবে না।
–কি যে বোল। গেরুয়াধারী বল্লভের প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির খ্যাতি আমার কানেও এসেছে। অবশ্য বল্লভ সম্পর্কে খুব বেশি অবহিত নই। কারণ, বল্লভ কিছুটা প্রচারবিমুখ। এমন একটি মানুষকে বিপজ্জনক পথে সঙ্গীরূপে পেলে খুশি হব।
