বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে এতক্ষণ যুদ্ধ দেখছিল ধনুর্বাণধারী আগন্তুক, এইবার সে বলে উঠল, সাধু! সাধু! অসি চালনার এমন কৌশল খুব কমই দেখা যায়। কিন্তু এই দুটি অনডান অসি ধরতেই শেখেনি। এরা তোমার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
জ্বলন্ত চক্ষে কর্ণদেবকে নিরীক্ষণ করতে করতে সে বলল, তোমার ন্যায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে মৃত্যুবরণেও সুখ আছে।
কর্ণদেব সহাস্যে বলল, কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আমি অনিচ্ছুক।
আগন্তুক গম্ভীর স্বরে বলল, তোমার এবং তোমার গুরুর পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম মনে আছে? তুমি রূঢ় ভাষায় আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে।
কর্ণদেব বলল, অন্যায় করেছিলাম। আমার নাম কর্ণদেব। অস্ত্রগুরুর নাম বলতে পারব না। গুরুর নিষেধ।
আগন্তুক হতাশকণ্ঠে বলল, আমি আশা করেছিলাম তুমি উদ্ধত ভঙ্গিতে পুনরায় আমাকে রূঢ় উত্তর দেবে। কিন্তু অন্যায় স্বীকার করেই তুমি বিভ্রাটের সৃষ্টি করেছ।
বিস্মিত স্বরে কর্ণদেব বলল, কিন্তু আমি তো সত্যই অন্যায় করেছিলাম। সেই স্বীকারোক্তিতে বিভ্রাটের কি হল?
আগন্তুক পূর্ববৎ হতাশ ভঙ্গিতে বলল, তুমি রূঢ় উত্তর দিলে আমি অপমানিত বোধ করে তোমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাতে পারতাম। কিন্তু অন্যায় স্বীকার করেই তুমি সব মাটি করে দিয়েছ।
কৌতুক-উচ্ছল স্বরে কর্ণদেব বলল, আমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করার জন্য তুমি এত উৎসুক কেন?
আগন্তুক বলল, আমি আর্যাবর্তের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছি। কোথাও আমার সমকক্ষ ধনুর্ধর বা অসিযোদ্ধার সাক্ষাৎ পাইনি। তোমার অসি চালনার কৌশল দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল এতদিনে বুঝি যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সাক্ষাৎ পেলাম। কিন্তু তুমি আমাকে হতাশ করলে!
-অস্ত্র চালনায় দক্ষতা প্রদর্শন করে যদি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চাও, কর্ণদেব বলল, তবে বোধহয় তোমাকে সেই সুযোগ আমি দিতে পারব।
আগন্তুক সাগ্রহে প্রশ্ন করল, কবে? কোথায়? কখন?
ধীরে, বন্ধু, ধীরে। স্মরণ রেখো আমি বোধহয় বলেছি। তিরন্দাজ শায়নের গৃহে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি। যদি তার দেখা পাই, তাহলে তোমাকে খুশি করতে পারব না। আর যদি তার সাক্ষাৎ না পাই
বাধা দিয়ে আগন্তুক বলে উঠল, তিরন্দাজ শায়নের গৃহে তার সাক্ষাৎ তুমি পাবে না।
কর্ণদেবের ভ্রু কুঞ্চিত হল, কেন?
–সে গৃহে নেই।
-তুমি কি করে জানলে সে গৃহে নেই? তুমি তো তার গৃহের বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ রাজধানী থেকে আসছ!
–এই মুহূর্তে সে কোথায় আমি জানি।
কোথায়?
–তোমার সম্মুখে।
স্তম্ভিত নেত্রে কিছুক্ষণ আগন্তুকের মুখের দিকে চেয়ে রইল কর্ণদেব, তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, তুমিই শায়ন?… হ্যাঁ, তাই হবে। বাহুকে অক্ষত রেখে বাহুর উপরজড়িত রঞ্জুকে যে শরাঘাতে ছিন্ন করতে পারে, এমন তিরন্দাজ শায়ন ভিন্ন আর কে আছে?
শায়ন হাসিমুখে বলল, কর্ণদেব! এবার বলো, অস্ত্রচালনায় আমার দক্ষতা প্রদর্শন করার উপযুক্ত ক্ষেত্র কোথায় আছে? সেখানে গেলে আমি কি উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দীর সাক্ষাৎ পাব?
–তোমার সমকক্ষ তিরন্দাজ শ্রাবস্তী রাজ্যে আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু অসিচালনায় তোমারই মতো নিপুণ আর একটি মানুষের সাক্ষাৎ তুমি নিশ্চয়ই পাবে।
–ভালো। সমকক্ষ অসিযোদ্ধার সঙ্গে শক্তিপরীক্ষা করতে আমি সর্বদাই ইচ্ছুক।
–উঁহু। সেই দক্ষ অসিযোদ্ধা তোমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় না, বন্ধুত্ব করতে চায়।
–বন্ধুত্ব চায়? যে আমাকে চোখেও দেখে নি, সে আমার বন্ধুত্ব চাইছে কেন?
–এক কঠিন কার্যে সিদ্ধিলাভ করার জন্য তোমার ন্যায় নিপুণ অসিযোদ্ধা এবং লক্ষ্যভেদে সিদ্ধহস্ত তিরন্দাজের সাহায্য একান্ত প্রয়োজন মনে করেই তোমার কাছে আমাকে প্রেরণ করেছে আমার অস্ত্রগুরু। তিরন্দাজ শায়নের নাম শ্রাবস্তী রাজ্যে লোকের মুখে মুখে ফেরে। সুতরাং আমার গুরুর কানেও তোমার নাম গেছে।
-তোমার গুরু! যার কাছে তুমি অসিচালনা শিক্ষা করেছ?
–হ্যাঁ।
সাধু! সাধু! আমি তার সঙ্গে দেখা করতে উগ্রীব। কোথায় তিনি?
–বলছি। কিন্তু তার আগে বলো– রাজধানীতে যখন তোমার সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম, তখন তোমার কটিতে তরবারি থাকলেও পৃষ্ঠে ধনুর্বাণ ছিল অনুপস্থিত। এখন দেখছি, ধনুর্বাণ তোমার অঙ্গশোভা বৃদ্ধি করছে। এই ধনুক আর শরপূর্ণ তূণীর কি তাহলে তুমি রাজধানী থেকে ক্রয় করেছ?
-আরে না, না। রাজধানীতে বন্ধুগৃহে একটি দিন ও একটি রাত অতিবাহিত করতে গিয়েছিলাম। রাজপথে ধনুর্বাণ নিয়ে চলাফেরা করে কেবল সৈনিক ও মাংস ব্যবসায়ী শবর। আমি শবরও নই, সৈনিকও নই, অনর্থক লোকের কৌতূহলী চক্ষুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই না– তাই বন্ধুগৃহে ধনুর্বাণ রেখেই রাজপথে ভ্রমণ করছিলাম। এখন গৃহে ফিরে যাচ্ছি, তাই সঙ্গের ধনুর্বাণ আবার অঙ্গে উঠেছে।
তুমি বুঝি প্রায়ই রাজধানীতে গিয়ে কালক্ষেপ করো?
–গুরুত্বপূর্ণ কার্যে প্রাণসংশয় ঘটার সম্ভাবনা থাকলে বন্ধুগৃহে যাই এবং রাজধানীতে বিবিধ আমোদ-প্রমোদে আত্মাকে তৃপ্ত করে গৃহে এসে কিয়ৎকাল বিশ্রাম করি– তারপর যথাস্থানে গমন করি কর্তব্য পালন করতে।
-তাহলে বর্তমানে প্রাণসংশয় ঘটার মতো কোনো বিপজ্জনক কার্যে তুমি যোগ দিতে যাচ্ছ?
