কেউ উত্তর দিল না।
আগন্তুক আবার বলল, আমি অবশ্য অসিচালনায় এই কিশোরের নৈপুণ্য দেখেছি, কিন্তু রক্তধারায় সেই দক্ষতার পরীক্ষা হয়নি। এইবার দেখব যুদ্ধে এই কিশোরের পারদর্শিতা কেমন।
আততায়ী দড়ির প্রান্ত ছেড়ে দিলেও কর্ণদেবের দুই হাত আর দেহকে বেষ্টন করে তখনও অবস্থান করছিল নাগপাশের মতো দড়ির ফাস।
আচম্বিতে জাগল ধনুকের টঙ্কারধ্বনি- জ্যামুক্ত শর সবেগে কর্ণদেবের ডান হাতের উপরিভাগে বন্ধনরকে দংশন করে ভূমিতে বিদ্ধ হল। সকলে সবিস্ময়ে দেখল শাণিত তিরের ফলা হাত ঘেঁষে দড়ির বাঁধন কেটে দিয়েছে, কিন্তু কর্ণদেবের হাত সম্পূর্ণ অক্ষত! ধনুর্বিদ্যার এমন আশ্চর্য উদারহণ দেখে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল!
নীরবতা ভঙ্গ করে জাগল আগন্তুকের কণ্ঠস্বর, কিশোর! তুমি বন্ধন-মুক্ত। কাল বিপণিতে যে অসি লাভ করেছে, সেই অসির ধার পরীক্ষা করার সময় উপস্থিত।
মুহূর্তের মধ্যে খাপ থেকে তলোয়ার টেনে নিয়ে কর্ণদেব গর্জে উঠল, জল্লাদ! অসি গ্রহণ করো। এইবার দেখব তোমার বীরত্ব।
জল্লাদ বলল, আমার দক্ষিণ বাহু বাণাঘাতে বিদীর্ণ। আমি এখন অসি ধারণে অসমর্থ।
কর্ণদেব বলল, সেজন্য আমি দায়ী নই। যাই হোক, তোমার বামবাহু অক্ষত, ওই হাতেই অসি নিয়ে আমার সম্মুখীন হও। আমিও বামহস্তে তরবারি ধারণ করছি।
জল্লাদ বিপন্ন হয়ে বলল, আমি তোমার মতো দুই হাতে তরবারি চালনায় অভ্যস্ত হইনি।
আগন্তুক ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, কিন্তু গুপ্তঘাতকের ন্যায় অতর্কিতে নরহত্যা করতে অভ্যস্ত হয়েছ। এই কিশোর তোমাকে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে। এখনই যদি তরবারি নিয়ে তুমি দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ না হও, তবে আমার বাণ তোমার বাহু ছেড়ে বক্ষে বিদ্ধ হবে।
নিরুপায় জল্লাদ বাঁ হাতে কোষ থেকে অসি আকষর্ণ করল।
কর্ণদেব বলল, জল্লাদ। প্রস্তুত হও, এই আমি আক্রমণ করলাম।
অপটু বামহস্তে তরবারি তুলে জল্লাদ আত্মরক্ষার চেষ্টা করল। অসির সঙ্গে অসির সংঘাতে কয়েকবার ঝনৎকার শব্দ উঠল, তারপরই কর্ণদেবের তরবারি আমূল বিদ্ধ হল জল্লাদের বক্ষে।
রক্তাক্ত তরবারির শূন্যে নাচিয়ে জল্লাদের দুই সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে কর্ণদেব আগন্তুককে উদ্দেশ্য করে বলল, এই দুই দস্যুকে নিয়ে কি করা যায়?
দুর্বৃত্তদের দিকে ধনুর্বাণের নিশানা উদ্যত রেখে দাঁড়িয়েছিল আগন্তুক, কর্ণদেবের প্রশ্নের উত্তরে বলল, এরা পরস্ব-অপহারক দস্যু।নরহত্যায় এদের দ্বিধা নেই কিছুমাত্র। সুযোগ পেলেই এরা তোমাকে হত্যা করত।
জানি, কর্ণদেব বলল, এদের অসিযুদ্ধে হত্যা করতে আমার বিশেষ অসুবিধা হবে না। তবে, হাতে সময় নেই– অতএব এদের মুক্তি দেওয়াই ভালো।
আগন্তুক হাসল, কিশোর! ঋণ, অগ্নি আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। তাছাড়া তোমার অসিচালনায় নৈপুণ্য আমি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম না। জল্লাদ নামে যে দুর্বত্তকে তুমি এখনই হত্যা করলে, সে বামহস্তে অসি চালনা করতে অভ্যস্ত ছিল না– তবে তোমার রণকৌশল দেখে বুঝলাম তুমি বামহস্তে অসিচালনায় অভ্যস্ত। অপটু শত্রুকে তুমি হত্যা করেছ অতি সহজেই। অতএব ওই যুদ্ধে তোমার ক্ষমতার যথার্থ পরীক্ষা হয়নি। এই দুই দুৰ্বত্তের সঙ্গে একে একে উপর্যুপরি যুদ্ধ করে যদি জয় লাভ করতে পারো, তবে বুঝব তোমার ক্ষমতা আছে।
কর্ণদেব বলল, আমার ক্ষমতার পরিচয় দেওয়ার জন্য নরহত্যা করতে হবে?
আগন্তুক বলল, এদের আমি মানুষ বলেই গণ্য করি না। এরা নরখাদক হিংস্র শ্বাপদের মতো বধ্য। তবে তুমি যদি ভীত হয়ে থাকো, সে কথা স্বতন্ত্র।
কর্ণদেব বলল, আমি ভীত নই। এরা নিষ্ঠুরতায় অভ্যস্ত নির্বোধ দস্যু। অসি চালনার সূক্ষ্ম কলাকৌশল এরা কখনো শিক্ষা করেনি। এদের হত্যা করতে কতক্ষণ?… তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতে এরা আমার শত্রুতাচারণ করতে পারে বটে। তোমার সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করা অনুচিত।
জল্লাদের দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে কর্ণদেব বলল, আমি তোমাদের হত্যা করব। তোমরা মিলিতভাবে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো- দেখ, যদি বাঁচতে পারো।
বামহস্তে ছুরিকা আর দক্ষিণ হস্তে তরবারি নিয়ে এগিয়ে গেল কৰ্ণদেব। অপর পক্ষে দুই দুর্বৃত্ত কটি থেকে তরবারি টেনে নিয়ে প্রস্তুত হল যুদ্ধের জন্য।
ধনুর্বাণধারী আগন্তুক হাঁক দিল, দুই-এর বিরুদ্ধে এক!… চমৎকার! কিশোর! নিজের ক্ষমতার উপর তোমার যথেষ্ট বিশ্বাস আছে দেখছি। আশা করি তোমার এই সাহস বৃথা দুঃসাহস বলে প্রমাণিত হবে না।
তীব্র ধাতব শব্দে ঝংকার তুলে তিনটি তরবারি মিলিত হল, পরক্ষণেই বিদ্যুৎ ঝলকের ন্যায় কিশোরের বাঁ হাতের ছুরি একটি শত্রুর রক্তপান করতে পিছিয়ে এসে আর্তনাদ করে আহত দস্যু বারেক নিজের ক্ষতস্থান দর্শন করে বেপরোয়া আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ততক্ষণে কর্ণদেবের তরবারি অপর দুর্বত্তের স্কন্ধদেশে দংশন করেছে নিষ্ঠুর পুলকে।
দুই দস্যুই বুঝলে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বয়সে নবীন হলেও অসিচালনায় সাতিশয় দক্ষ। তারা প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগল। কিন্তু যুদ্ধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই অস্ত্রাঘাতে ছিন্নভিন্ন দুই দুৰ্বত্তের রক্তাক্ত মৃতদেহ ধরণীকে আলিঙ্গন করল। রক্তাক্ত অসির শোণিতধারা শত্রুর পরিধেয় বসনে বিলুপ্ত করে নিষ্কলঙ্ক অসিকে পুনরায় কোষবদ্ধ করল কর্ণদেব।
