কর্ণদেবের ওষ্ঠাধরে ফুটল হাসির রেখা। সে কথা বলল না। জল্লাদ বলল, এত ভোরে এই পথে লোকসমাগম হয় না। মধ্যাহ্নের কিছু পূর্বে লোক চলাচল শুরু হয়, সন্ধ্যার প্রাক্কালে আবার পথিকের সংখ্যা বিরল হয়ে পড়ে। অতএব, হঠাৎ মানুষজন এসে পড়ে তোমার প্রাণরক্ষা করবে এমন সম্ভাবনাও নেই। তোমার মতো দুই-একজন পথিক অবশ্য কখনো কখনো অসময়ে এই পথে ভ্রমণ করে তবে দৈবাৎ সেরকম কোনো পথিকের আবির্ভাব ঘটলেও তোমার প্রাণরক্ষার আশা নেই;- তোমার সঙ্গে সেই পথিকও যমালয়ে প্রেরিত হবে।… কর্ণদেব! তুমি নীরব যে!.. নতজানু হয়ে প্রাণভিক্ষা করো, হয়তো তোমাকে ছেড়ে দিতেও পারি।… এখনও নীরব! তোমার মৃত্যু দেখছি অনিবার্য… আচ্ছা! প্রথমে তোমার একটি চক্ষুকে উৎপাটিত করব, দেখি, তোমার কণ্ঠ কেমন নীরব থাকে—
জল্লাদ এগিয়ে আসতেই তার এক সঙ্গী বাধা দিয়ে বলল, জল্লাদ! অধিক বিলম্ব করা বিপজ্জনক। অনেক সময় ধনুর্বাণধারী শবরগণ দলবদ্ধ হয়ে মৃগয়াল মাংস বিক্রয় করার জন্য এই পথে প্রত্যূষেই নগরীতে প্রবেশ করে- দৈবাৎ তাদের একটি দল যদি এসে পড়ে তাহলে এই ব্যক্তিকে ফেলে পলায়ন করতে আমরা বাধ্য হব।
জল্লাদ ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে তার সঙ্গীর দিকে ফিরল, মূঢ়! তুই চুপ কর। যদি ভীত হয়ে থাকিস, তবে স্থানান্তরে গমন কর।
অপর সঙ্গীটি বলে উঠল, এই কিশোরের কাছে মহামূল্য রত্ন ও স্বর্ণমুদ্রা আছে। কাল রাত্রে কুসীদজীবী উত্তানপাদকে এই কিশোর একটি রত্ন দেখিয়েছে। ওর সঙ্গে ওই কুসীদজীবীর কথাবার্তা শুনে বুঝেছি এর কাছে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রাও আছে। জল্লাদ! সেসব কথা তোমাকে বলেছি। এখন যদি একে হত্যা করতে চাও, তবে সত্বর সেই কার্য সমাপ্ত করো। এই কিশোরের মৃতদেহ মৃত্তিকার গর্ভে স্থাপন করে ওর ধনরত্ন নিয়ে আমাদের যথাসম্ভব শীঘ্র এই স্থান পরিত্যাগ করা উচিত। বিলম্বে সত্যই বিপদ ঘটতে পারে।
জল্লাদ তার দুই সঙ্গীর মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর বলল, তবে আগে দেখি এর বস্ত্রের মধ্যে কত স্বর্ণমুদ্রা আর কোন্ মহামূল্য রত্ন লুক্কায়িত আছে।
সে নত হয়ে কর্ণদেবের আঙরাখার ভিতর হাত দেওয়ার উপক্রম করল। তৎক্ষণাৎ হাত বাঁধা অবস্থাতেই মাটির উপর শুয়ে পড়ল কর্ণদেব এবং সজোরে পদাঘাত করল জল্লাদের পায়ে। অতর্কিত আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে জল্লাদ ভূমিশয্যায় ছিটকে পড়ল সশব্দে! যে ব্যক্তি বন্ধনরঙ্কু ধরে দাঁড়িয়েছিল, সে সজোরে দড়িতে টান মারল– দড়ির ফাঁস আরও শক্ত হয়ে কর্ণদেবের দুই হাত চেপে ধরল দেহের সঙ্গে।
সগর্জনে উঠে দাঁড়িয়ে জল্লাদ অসি কোষমুক্ত করল, পামর! আগে তোক হত্যা করব। তারপর তোর সর্বস্ব গ্রহণ করব।
প্রভাত সূর্যের আলোতে ঝকমক জ্বলে উঠল শূন্যে আন্দোলিত তরবারি নিজের অজ্ঞাতসারেই দুই চোখ মুদে ফেলল কর্ণদেব। কিন্তু দেহের উপর অস্ত্রাঘাতের যাতনা অনুভব করার পরিবর্তে তার শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল জল্লাদের কাতর আর্তনাদ এবং কঠিন মাটির উপর তরবারির ঝনৎকার শব্দ!
সচমকে দুই চোখ খুলে সে আশ্চর্য হয়ে দেখল জল্লাদের দক্ষিণ বাহু ভেদ করে থর থর কাঁপছে একটি তীর, আর বাঁ হাত দিয়ে আহত ডান হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করছে জল্লাদ।
জল্লাদ ও তার দুই সঙ্গীর ভীত দৃষ্টি অনুসরণ করে কর্ণদেব দেখল একটু দূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ধনুর্বাণধারী এক ব্যক্তি। প্রথম তীরে জল্লাদকে বিদ্ধ করেই সে আর একটি তীর ধনুকে লাগিয়ে নিয়েছে। আগন্তুক শুধু ধনুর্বাণধারী নয়, তার কটিদেশে রয়েছে সুদীর্ঘ তরবারি।
আগন্তুকের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল কর্ণদেব– এই ব্যক্তি তো তার অপরিচিত নয়! রাজধানীর বিপণিতে প্রথমেই যে লোকটির সঙ্গে তার অসি নিয়ে কলহ হয়, এ সেই লোক।
আগন্তুক এগিয়ে এসে কর্ণদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে বলে উঠল, আরে! তুমি!… তোমাকে দেখছি ভারি বিপদে ফেলে দিয়েছে এরা!
জল্লাদ তার একটিমাত্র চক্ষুর জ্বলন্ত দৃষ্টি আগন্তুকের উপর নিক্ষেপ করে বলল, আমাদের ব্যক্তিগত কলহে তুমি হস্তক্ষেপ করছ কেন?
আগন্তুক সহাস্যে বলল, একজনকে দড়ির ফঁসে বন্দি করে যখন আততায়ী তাকে বধ করতে উদ্যত হয়, তখন সেটাকে আর ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে আমি উপেক্ষা করতে পারি না। ওটা হত্যাকাণ্ড! আর, চোখের সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটার উপক্রম হলে আমি সাধ্যমতো বাধা দিয়ে থাকি।
ক্ষতমুখ থেকে সবলে তীরটিকে উৎপাটিত করল জল্লাদ। ফিনকি দিয়ে তপ্ত রক্তধারা ছুটে এসে তার সর্বাঙ্গ সিক্ত করে দিল। সেদিকে ক্রুক্ষেপ না করে জল্লাদ বলল, শোনো! এই কিশোরের কাছে প্রচুর ধনসম্পদ আছে। এসো! ওকে হত্যা করে ওই সম্পদ আমরা ভাগ করে নিই।
আগন্তুকের চোখে এক মুহূর্তের জন্য ক্রোধের আগুন দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল, সে তরল স্বরে বলল, আমি তোমাদের মতো পরস্ব অপহারক দস্যু নই। তাহলে ব্যক্তিগত কলহ নয়– দস্যুবৃত্তি!
এতক্ষণে মৌনব্রত ভঙ্গ করে কথা বলল কৰ্ণদেব, না, নিছক দস্যুবৃত্তি নয়। ওই এক চক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আমার পূর্বশত্রুতা ছিল। আমি এই পথে ভ্রমণ করছিলাম, অকস্মাৎ অন্তরাল থেকে দড়ির ফাঁসি নিক্ষেপ করে ওরা আমাকে বন্দি করেছে। তারপর যা ঘটেছে, তা তোমার অজ্ঞাত নয়।
শ্লেষতিক্ত স্বরে আগন্তুক বলল, এই বালককে হত্যা করতে তোমরা তিনজনেও অপারগ! তাই অতর্কিতে তাকে রজ্জতে আবদ্ধ করে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে?
