-কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি এই অভিযানে না যাই? যদি পরন্তপের বিচারে আমি অযোগ্য প্রতিপন্ন হই? তা হলে? এই অর্থ তা হলে কবে এবং কখন তোমাকে প্রত্যার্পণ করতে হবে?
–পরন্তপের বিচারে আপনার অমনোনীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। তবু সেরকম ঘটনা যদি ঘটে, তা হলেও আপনার চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি আপনাকে ঋণস্বরূপ এই অর্থ দিলাম। যখন পারবেন, যতদিনে পারবেন, ঋণশোধ করবেন। এ বিষয়ে কোনো শর্ত রইল না।
কর্ণদেব! পৃথিবীতে তোমার মতো মানুষও আছে, আবার কুসীদজীবী উত্তানপাদের মতো মানুষও আছে!
-বল্লভ! অনুমতি করুন, এবার বিদায় গ্রহণ করি। একটু দাঁড়াও, বল্লভ এগিয়ে এসে কর্ণদেবের দুই কাঁধে হাত রেখে তার মুখের উপর দৃষ্টি স্থাপম করল, কর্ণদেব! ক্রোধের বশে আমাকে তুমি সম্বোধন করেছিলে, স্নেহের বশে কি ওই সম্বোধনে ফিরে যাওয়া যায় না?
বল্লভ!আবেগরুদ্ধ স্বরে কর্ণদেব বলল, পিতামাতার মৃত্যুর পর একটি দুর্ধর্ষ মানুষ আমাকে ভালবেসেছে, কিন্তু আর কেউ আমার প্রতি এতটুকু স্নেহ বা সহানুভূতি প্রদর্শন করেনি। তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করেছ একথা আমি কোনোদিনই ভুলব না। আজ থেকে তোমাকে আমি জ্যেষ্ঠভ্রাতার মতোই মনে করব।
কর্ণদেব!আ স্বরে বলল, মতো কেন, আজ হতে আমি সত্যই তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা হলাম। আচ্ছা ভাই এস। কাল সন্ধ্যায় দেখা হবে।
–নিশ্চয়।
.
১১. অসি ও শায়ক
বল্লভের গৃহ থেকে বহির্গত হয়ে কর্ণদেব যখন রাজপথে পদার্পণ করল নগরী তখনও নিদ্রামগ্ন। অন্ধকারকে বিতাড়িত করে পৃথিবীর বুকে আলোর আবির্ভাব ঘটেছে বটে, কিন্তু অধিকাংশ নাগরিকই এখনও শয্যা ত্যাগ করেনি। পথের ধারে কয়েকটি গৃহ থেকে শিশুর ক্রন্দন ও নারী-পুরুষের কণ্ঠস্বর কর্ণদেবের শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল, কৃচিৎ দুই একটি পথিকের দেখাও সে পেল কিন্তু জনজীবনের কোলাহলে কর্মব্যস্ত রাজধানীর জাগরণের যে বেশ বিলম্ব আছে, সে কথা সহজেই বুঝল কর্ণদেব।
নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে সবেগে পদচালনা করতে করতে পথের দুইদিকে দৃষ্টিকে সঞ্চালিত করে কর্ণদেব দেখল রাজধানীর মধ্যস্থলে অবস্থিত প্রস্তর ও কাষ্ঠ-সংযোগে নির্মিত বৃহৎ অট্টালিকার প্রাচুর্য এই অঞ্চলে নেই। ছোটো ছোটো কাঠের বাড়ির সংখ্যাই বেশি। মাঝে মাঝে দই-একটি পাষাণ-গহ চোখে পড়লেও তাদের সংখ্যা নগণ্য। এই দিক দিয়ে কর্ণদেব নগরে প্রবেশ করেনি, তবু তার মনে হল নগরীর উপকণ্ঠে যেদিক থেকে সে রাজধানীতে প্রবেশ করেছিল, সেখানকার ঘরবাড়ির চেহারাও এই ধরনের। তখনও পর্যন্ত রাজধানীর মধ্যস্থলে বিরাজমান সুবৃহৎ অট্টালিকা ও স্নানাগারসমূহ তার চোখে পড়েনি। এখন সে বুঝল রাজধানীর মধ্যভাগে আশ্রয় গ্রহণ করেছে ধনী ও উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়, উপকণ্ঠে বাস করে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। আরও কিছুদূর এগিয়ে যেতেই তার চোখে পড়ল শ্যামল প্রান্তর ও বৃক্ষের আধিক্য কাষ্ঠনির্মিত গৃহের পরিবর্তে দেখা দিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পর্ণকুটির। কর্ণদেব জানে, এখানে বাস করে অতি দরিদ্র কিছু শ্রমজীবী অথবা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা শবরশ্রেণির কয়েকজন মানুষ যারা শবরপল্লীর নিয়ম ও সামাজিক বিধি মেনে নেয়নি, কিন্তু মৃগয়ালব্ধ পশুমাংস ও চর্ম বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে।
এখান থেকেই শুরু হয়েছে অরণ্যের রাজত্ব। বনপথ ধরে এগিয়ে চলল কর্ণদেব। বল্লভের নির্দেশ অনুসারে আরও একটু অগ্রসর হতেই পূর্ব-পরিচিত পথের দেখা পেল সে। কর্ণদেব উল্লসিত হয়ে উঠল– আর বেশিদূর নয়, শায়নের গৃহের নিকটেই সে এসে পড়েছে দ্বিগুণ বেগে পা চার্লিয়ে দিল সে।
আচম্বিতে চাবুকের মতো কি একটা বস্তু তার দেহের উপর আছড়ে পড়ল, পরক্ষণেই প্রবল আকর্ষণে মাটির উপর ছিটকে পড়ল কর্ণদেব সঙ্গে সঙ্গে তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করল এক প্রচণ্ড অট্টহাস্য!
আঘাতের বেগ সামলে কর্ণদেব দেখল, তার দুই হাতকে দেহের সঙ্গে আবদ্ধ করে অবস্থান করছে একটি দড়ির ফাঁস!
কোনোমতে উঠে বসে সে দেখল অদূরবর্তী একটি ঝোপের আড়াল থেকে হাসিমুখে আত্মপ্রকাশ করল জল্লাদ! তার সঙ্গে আরও দুটি অপরিচিত মানুষের সাক্ষাৎ পেল কৰ্ণদেব। অপরিচিত দুই ব্যক্তির মধ্যে একজনের হাতে ছিল দড়ির ফাঁসের অপর প্রান্ত।
উপবিষ্ট কর্ণদেবের সামনে এসে কটিতে দুই হাত স্থাপন করে জল্লাদ হাসিমুখে বলল, কর্ণদেব! খুব আশ্চর্য হয়ে গেছ, তাই না?
কর্ণদেব উত্তর দিল না। জল্লাদ হৃষ্টস্বরে বলতে লাগল, কাল আমার অনুচর দুটি তোমাকে অলক্ষ্যে অনুসরণ করেছিল। বল্লভের গৃহে প্রবেশ করতেই আমাকে একজন যথাস্থানে গিয়ে তোমার সংবাদ দিয়েছে, অপর ব্যক্তি পাহারা দিয়েছে সারারাত ধরে। সংবাদ পেয়ে আমি বল্লভের গৃহের নিকটে উপস্থিত হলাম। প্রত্যূষে তুমি গৃহত্যাগ করে পথে বহির্গত হতেই অলক্ষ্যে তোমাকে অনুসরণ করলাম। এই পথে সকাল-সন্ধ্যায় আমি প্রায়ই শিকারের সন্ধানে অপেক্ষা করি। পথচলতি দলছাড়া পথিকের অর্থ গ্রহণ করে তার মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিই। তোমার আশেপাশে এমন অনেক হতভাগ্য মানুষের দেহই মাটির তলায় লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তোমার শরীরটাও ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটির তলায় আত্মগোপন করবে। কর্ণদেব! তুমি নীরব কেন? একবার নতজানু হয়ে প্রাণভিক্ষা চাও, হয়তো আমি তোমায় ক্ষমা করতে পারি।
