বল্লভ বলল, সাধু সঙ্কল্প। কিন্তু এইসব ব্যাপারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোথায়?
-বলছি। শল্যকে যারা বন্দি করেছে সেই দস্যুদল সংখ্যায় দশ-বারো জন হবে। পরন্তপ একদল অনুচর নিয়ে তাদের হাত থেকে শল্যকে ছিনিয়ে আনতে পারে বটে, কিন্তু তাহলে ঐ অনুচরদের মধ্যে সমস্ত সম্পদ বণ্টন করতে হবে। অতগুলি লোকের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হলে ব্যক্তিগত অর্থের পরিমাণ কমে যাবে। অল্প কয়েকজনের মধ্যে ভাগ হলে প্রত্যেকই অধিক পরিমাণে ধনরত্ন হস্তগত করতে পারবে। তাছাড়া, শল্যকে উদ্ধার করলেই সমস্যার শেষ হল না। আরও সমস্যা আছে। শল্যের ধনভাণ্ডার যেখানে লুকানো আছে, সেই স্থানটি ভীষ্মক নামক অনার্য জাতির রাজ্যের অন্তর্গত। ভীষ্মক জাতির রাজা মূলক আমাদের রাজা রুদ্রদমনের অন্তরঙ্গ বান্ধব। বল্লভ! তুমি জানো এই রাজ্যের সকল সীমানাতেই অবস্থান করছে দুর্ধর্য সীমান্তরক্ষীর দল। কিন্তু উত্তরের কোশাম্বী ও রুদ্রদমনের রাজ্য শ্রাবন্তীর মাঝখানে সীমান্তরক্ষীর অস্তিত্ব নেই। কারণ, অনার্যরাজ মূলকের অধীনে দুরন্ত ভীষ্মক জাতি ওই সীমান্ত অঞ্চল পাহারা দেয়। তাদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে দুই-চারজন সতর্ক মানুষ কোনোক্রমে ওই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করতে পারে; কিন্তু অধিকসংখ্যক মানুষের পক্ষে অনার্য প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে ওই এলাকায় চলাফেরা করা অসম্ভব। সেই জন্যই পরন্তপ চাইছে তিনটি দুর্ধর্ষ মানুষ যাদের বিশ্বাস করা যায়। আমাকে বাদ দিলে আরও দুটি মানুষের প্রয়োজন। অনেক চিন্তা করে পরন্তপ স্থির করেছে মল্লবীর জয়দ্রথ আর তীরন্দাজ শায়নই হবে আমাদের উপযুক্ত সঙ্গী। এরা দুজনেই শ্রাবন্তী রাজ্যে অল্পবিস্তর খ্যাতিলাভ করেছে। জয়দ্রথের দৈহিক শক্তি প্রচণ্ড; শায়ন অসি ও ধনুবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত। আপনি আমাদের সঙ্গে যোগ দিলে জয়দ্রথকে আর প্রয়োজন হবে না। বাকি রইল শায়ন। গতকাল শায়নের গৃহে তার দ্বার বাহির থেকে অর্গলবদ্ধ দেখে এসেছি। শুনেছি দূরে কোথাও গেলে তার গৃহদ্বারে লিখিত লিপি থেকে সন্ধান পাওয়া যায় কিন্তু শায়নের গৃহদ্বারে কাল কোনোও লিপি আমার চোখে পড়েনি। তাই রাত্রি প্রভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তার গৃহে গমন করব। আশা করছি—
-আশা করছ তাকে পাবে? হ্যাঁ, আমারও মনে হয় প্রত্যূষে গেলে তার সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। শায়নের খ্যাতি আমারও কানে এসেছে। নিকটে বা দুরে অরণ্যসন্নিহিত কোনো গ্রামে যদি নরখাদক শ্বাপদের আর্বিভাব হয়, অথবা মদমত্ত হস্তী বা বন্য মহিষ যদি উপদ্রব করতে থাকে– তবে সেই অঞ্চলের মানুষ অর্থের বিনিময়ে শায়নের সাহায্য নেয়। সে অত্যন্ত সাহসী ও অস্ত্রচালনায় নিপুণ। বিশেষত ধনুর্বাণে তার লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা নাকি বিস্ময়কর।… হ্যাঁ, এই অভিযানের পক্ষে শায়ন উপযুক্ত সঙ্গী বটে। কিন্তু সে কি দস্যুদের হাতে হাত মিলাতে রাজি হবে?
কর্ণদেব ঈষৎ চিন্তিতভাবে বলল, জানি না। তবে আমরা তো তাকে দুস্যবৃত্তি করতে বলছি না। এই ধরনের মানুষ তীব্র উত্তেজনার মধ্যে দিনযাপন করতে ভালোবাসে। তাই মনে হয় সে রাজি হতেও পারে। কিন্তু বল্লভ, আপনি কি আমাদের দলে যোগ দিতে সম্মত?
–হ্যাঁ। একটি মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করে যদি সারাজীবন নিশ্চিন্তে বসে থাকার মতো পর্যাপ্ত অর্থ পাই, তাহলে আপত্তি করব কেন? অর্থের পরিমাণ তো যথেষ্ট হবে বলেই মনে হয়।
–নিশ্চয়! সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। দস্যুদের অভিযানের ফলে যে অর্থ পাওয়া যায়, সেই লুণ্ঠিত সম্পদের অর্ধেক গ্রহণ করে পরন্তপ স্বয়ং, বাকি অর্ধেক সমভাবে বণ্টন করা হয় লুণ্ঠনে যোগদানকারী দুস্যদের মধ্যে। কিন্তু শল্যের ধনভাণ্ডার থেকে যে ধন আমদের হাতে আসবে, তা সমান চারভাগে বিভক্ত হবে। বলুন আপনার আর কিছু জানার আছে?
—আর একটি কথা জানতে চাই। কবে যাত্রা করতে হবে?
–দুই-চার দিনের মধ্যেই। শল্যের উপর বিদ্রোহী দুস্যরা অত্যাচার শুরু করেছে। অত্যাচারের মাত্রা বর্ধিত হলে হয় সে মারা পড়বে, নয়তো ধনভাণ্ডারের সন্ধান জানিয়ে দিতে বাধ্য হবে। অতএব যা কিছু করার তা সত্বর করতে হবে। তবে চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী আমি নই। আগামীকাল সন্ধ্যার প্রাক্কালে পরন্তপের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হবে; সেখানেই সে আপনার সম্বন্ধে তার মতামত আপনাকেই জানিয়ে দেবে।
বল্লভের ভ্রূকুঞ্চিত হল, ওঃ! তা কোথায় দেখা হবে? তুমি এসে আমাকে যথাস্থানে নিয়ে যাবে তো?
কর্ণদেব বলল, না। এই নগরীর উত্তরদিকে অরণ্য যেখানে শুরু হয়েছে, সেই অরণ্য ও জনপদের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি পুরাতন বটবৃক্ষ। জনশ্রুতি আছে, বিশাল ওই বৃক্ষের ছায়ায় নাকি পঞ্চপাণ্ডব অজ্ঞাতবাসের সময়ে কিয়ৎকাল বিশ্রাম করেছিলেন। সেই বট বক্ষের
বল্লভ বলে উঠল, জানি শ্রাবন্তীর রাজধানী ও নিকটবর্তী গ্রামের সকল বাসিন্দাই ওই বৃক্ষ সম্পর্কে অবহিত। ওই বটবৃক্ষের তলায় আগামী কাল সায়াহ্নে পরন্তপ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে?
-যদি আপনার আপত্তি না থাকে।
–তুমিও থাকবে তো?
নিশ্চয়ই। আপনারা পরস্পরের অপরিচিত, আমি না থাকলে চলবে কেন? বল্লভ! ওই দেখুন, বাতায়নপথে পূর্বাকাশে ঊষার আভাস দেখা যায়। আমি এখনই শায়নের গৃহ অভিমুখে যাত্রা করব। বিলম্ব হলে তাকে পাব না।… এটা ধরুন। এই অর্থ দিয়ে কুসীদজীবী উত্তানপাদের কবল থেকে আপনার বসতবাটী উদ্ধার করুন।
