বল্লভ বলল, ওর কিছু কিছু কুকীর্তির কথা আমার কানেও এসেছে। কিঞ্জলের সঙ্গে ওর সখ্য আছে। তবে ও নেকড়েবাহিনীর কেউ নয়।
কর্ণদেব বলল, জল্লাদ সাময়িকভাবে সমাজবিরোধী কয়েকটি দুৰ্বত্তের সাহায্য নিতে পারে বটে, কিন্তু বৃহৎ দল গঠন করে দস্যুবৃত্তি করা সম্ভব নয়।
-কেন?
-ওইরকম হিংস্র আর স্বার্থপর মানুষ বৃহৎ দল গঠন করতে পারে না। দলপতির চরিত্রে বহুবিধ গুণ থাকা প্রয়োজন। শুধু অসিচালনা করতে জানলে দলপতি হওয়া যায় না।
স্বীকার করছি, দস্যুদল এবং তাদের নায়ক সম্পর্কে আমার ধারণা নিতান্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই প্রসঙ্গ বন্ধ করে প্রয়োজনীয় কথা বলো- আমাকে তোমার প্রস্তাব জানাও।
-তাহলে ধরে নিতে পারি আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আর ইতিহাস আপনার মনে ঘৃণার উদ্রেক করেনি?
আদৌ নয়। এখন আমি তোমার প্রস্তাব শুনতে চাই।
–তবে শুনুন। এই রাজ্যের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত বনভূমির মধ্যে শল্য নামে এক দস্যু-দলপতিকে বন্দি করেছে তার দলভুক্ত কয়েকজন দস্যু। শল্য আমাদের দলপতি পরন্তপের মতো অমিতব্যয়ী নয়। সে প্রভূত ধনসম্পদ সঞ্চয় করে লুকিয়ে রেখেছে এই রাজ্যের উত্তরাংশে অবস্থিত পর্বতবেষ্টিত অরণ্যের কোনো এক গোপন স্থানে। তার দলের দস্যুরা ওই অর্থ আত্মসাৎ করতে চায়। পরন্তপ চাইছে শল্যকে উদ্ধার করতে। শলোর মুখ থেকে ওই ধন-সম্পদের সন্ধান সে নিশ্চয়ই পাবে। তখন…।
বাধা দিয়ে বল্লভ বলল, শল্য যে পরন্তপকে ওই অর্থের সন্ধান দেবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? সে তো দলের লোককেই গুপ্ত ধনভাণ্ডারের সন্ধান বলে দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারে।
কর্ণদেব হাসল, না। শল্য জানে তার দলের লোকেরা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন অর্থের সন্ধান পেলেও তাকে তারা জীবিত রাখবে না। কারণ, জীবিত থাকলে শল্য পরবর্তীকালে প্রতিহিংসা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু পরন্তপ যদি শল্যকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করতে পারে, তবে কৃতজ্ঞ শল্য তাকে সম্পদের অর্ধেক দিতে আপত্তি করবে না।
–আমার ধারণা অন্যরকম। শল্য জানে ধন-রত্নের সন্ধান পেলেই তার দলভুক্ত দস্যুরা তাকে হত্যা করবে। পরন্তপও যে তার গুপ্তধনের সন্ধান পেলে তাকে হত্যা করবে না একথা শল্য কেন বিশ্বাস করবে? আমি নিজেও মনে করি অর্থের সন্ধান পেলে পরন্তপ কে হত্যা করে সমস্ত অর্থ আত্মসাৎ করতে সচেষ্ট হবে।
আপনি সেকথা মনে করলেও শল্য নিশ্চয়ই পরন্তপের কথা বিশ্বাস করবে। দস্যুমহলে সকলেই জানে পরন্তপ কখনো বিশ্বাসভঙ্গ করে না। শল্য একসময়ে পরন্তপের অধীনে দস্যুবৃত্তি করেছে, অতএব পরন্তপের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ অবহিত। প্রাণরক্ষার প্রতিশ্রুতি পেলে শল্য নিশ্চয়ই পরন্তপকে সম্পদের অর্ধাংশ ছেড়ে দিতে সম্মত হবে। সর্বনাশ উপস্থিত হলে বুদ্ধিমান ব্যক্তি অর্ধাংশ ত্যাগ করে থাকেন। শল্য নির্বোধ নয়।
-কর্ণদেব! পরন্তপ সম্পর্কে তোমার উচ্চ ধারণা থাকতে পারে, কিন্তু আমি বলব এই দস্যু অতিশয় অর্থলোলুপ। সে বহুকাল ধরে দস্যুবৃত্তি করছে। তার কাছে নিশ্চয়ই যথেষ্ট ধনরত্ন সঞ্চিত আছে। তার মাথার উপর এখন বিপদের খঙ্গ রাজদরবার থেকে তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। এখন যে কোনো দিনই দেবরাজ বাসবের রোষে ললাটে বা বক্ষে শায়কচিহ্ন নিয়ে তার মৃত্যু ঘটতে পারে। রুদ্রদমনের রাজ্যে এই ঘটনাই ঘটেছে বারংবার। এমন অবস্থায় তার যথাসম্ভব শীঘ্র এই রাজ্য ত্যাগ করা উচিত। তা না করে সে আরও অর্থ সংগ্রহ করতে সচেষ্ট। এই ব্যক্তিকে অতিশয় অর্থগৃধু মনে করাই স্বাভাবিক নয় কি?
-না। পরন্তপ কখনো সঞ্চয় করে না। হাতে বেশ কিছু অর্থ এলেই সে কৌশাম্বী, উজ্জয়িনী, কৌশল প্রভৃতি রাজ্যে গিয়ে বিলাস ব্যসনে দিন অতিবাহিত করে। সে অতিশয় মূল্যবান বসনভূষণ ব্যবহার করতে ভালোবাসে। কিন্তু এই রাজ্যে মহার্ঘ্য বসন-ভূষণে সজ্জিত হলে গুপ্তচরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে বলে সে শ্রাবন্তী রাজ্যে খুব সাধারণ অবস্থায় দিন যাপন করে। অন্য রাজ্যে ইচ্ছামতো অর্থব্যয় করে বিলাসী ব্যক্তির ন্যায় দিন যাপন করলেও পরদেশী ধনীর প্রতি কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে না। সঞ্চিত সম্পদ যখন শেষ হয়ে আসে, তখনই সে আবার দস্যুবৃত্তি করতে উদ্যোগী হয়। এখন যে তার জীবন বিপন্ন, সে বিষয়ে সে সম্পূর্ণ সচেতন। তাই শল্যের ধনভাণ্ডার থেকে বেশ কিছু ধনরত্ন হস্তগত করে সে দেশত্যাগের সঙ্কল্প করেছে। আমাকে সে যথেষ্ট অর্থ দিয়ে যাবে। ওই অর্থ পেলে নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে আমি বাকি জীবনটা সৎভাবে কাটিয়ে দিতে পারব। আমি পরন্তপের সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইনি, কিন্তু সে বলেছে তার সাহচর্য আর আমার পক্ষে নিরাপদ নয়। তার সনির্বন্ধ অনুরোধে আমি সাময়িকভাবে তার সাহচর্য ত্যাগ করে এই রাজ্যে বসবাস করতে সম্মত হয়েছি। পরন্তপ একথাও জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে সে দুস্যবৃত্তি ত্যাগ করে ভালোভাবে জীবন যাপন করতে চায়। গুপ্তধনের কিয়দংশ তার হস্তগত হলে সে ভিন্ন রাজ্যে গিয়ে ওই অর্থ দিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করবে। কিংবা হয়তো অপর রাজ্যে রাজসেনা দলে যোগ দিতে পারে। যে-কোনো রাজ্যের সেনাবাহিনী তার মতো নিপুণ শস্ত্রবিদকে সাদরে গ্রহণ করবে। তবে আমার মনে হয় পরন্তপের ন্যায় স্বাধীনচেতা ব্যক্তির পক্ষে সৈন্যদলের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। বোধহয় শেষ পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্যেই সে আত্মনিয়াগ করবে।
