জল্লাদ হিংস্রভাবে দন্তবিকাশ করে বলল, তোর এত স্পর্ধা! আমার গায়ে হাত! ওই হাত আমি তোর দেহ থেকে খুলে নেব।
তরবারি তুলে সে এগিয়ে এল, সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে বধূ তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, না, না, ওকে হত্যা করো না। যথাসর্বস্ব খুলে দিচ্ছি।
কর্কশ হাস্যে চারিদিক কাঁপয়ে জল্লাদ বলল, সুন্দরি! তোমার যথাসর্বস্ব তত আমরা গ্রহণ করবই। কিন্তু যে-হাত দিয়ে তোমার স্বামী আমাকে আঘাত করেছে, সেই হাতটিও যে আমার চাই।
বধূ আকুল স্বরে কেঁদে উঠে বলল, দয়া করো। ওগো, দয়া করো। ওকে হত্যা করো না।
নির্মম কণ্ঠে হেসে উঠে জল্লাদ বলল, না, না, ওকে আমি হত্যা করতে চাই না। হাতটিকে কেটে নিয়ে তোমার স্বামীকে আবার তোমার কাছেই ফিরিয়ে দেব।
রমণী উচ্ছ্বসিত ক্রন্দনে ফেটে পড়ল। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না, বলে উঠলাম, জল্লাদ! তুমি সার্থকনামা পুরুষ। কিন্তু আমি তোমাকে এদের উপর অত্যাচার করতে দেব না। লুষ্ঠিত দ্রব্য নিয়ে এখান থেকে প্রস্থান করে। পরে পূর্বনির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দলপতির অংশ আমি তোমার কাছ থেকে বুঝে নেব। এই নারীর অঙ্গে যে অলঙ্কার আছে তাতে হাত দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জল্লাদ বলল, বালক! দলপতির অংশ তুই বুঝে নিতে এসেছিস, সেটা তোকে বুঝিয়ে দেব। কিন্তু তুই অনধিকারর্চা করিস কেন? এই নারীর অলঙ্কার এখন দলের সম্পত্তি। আর ওই যে পুরুষ আমাকে অপমান করেছে, ওকে আমি উচিত শাস্তি দেব। অধিক বাক্যব্যয় করলে তুইও নিষ্কৃতি পাবি না।
দারুণ ক্রোধে আমার দেহের রক্ত মাথায় উঠে গেল, মনে হল আমার ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে যেন অজস্র অগ্নিশিখা নৃত্য করছে দ্রুতপদে এগিয়ে এসে জল্লাদের মুখে সজোরে মুষ্টাঘাত করলাম।
রক্তাক্ত মুখে সে ছিটকে পড়ল মাটির উপর। ক্ষণমধ্যে আত্মসংবরণ করে উঠে দাঁড়াল। তারপরই ভীষণ চিৎকার করে তরবারি হাতে আমাকে আক্রমণ করল। আমি প্রস্তুত ছিলাম। চকিতে অসি কোষমুক্ত করে তাকে বাধা দিলাম। দস্যুরা সরে দাঁড়িয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য রণাঙ্গন প্রশস্ত করে দিল।
পরন্তপের কাছে দীর্ঘকাল অনুশীলনের ফলে অসি চালনায় আমি সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিলাম। জল্লাদের আঘাত কয়েকবার প্রতিহত করে আমি বিদ্যুৎবেগে প্রতি-আক্রমণ করলাম। কোনোরকমে সরে গিয়ে সে প্রাণ বাঁচাল বটে কিন্তু আমার অসির অগ্রভাগ তার একটি চক্ষুকে মুখের উপর থেকে লুপ্ত করে দিল। আর্তনাদ করে সে মাটির উপর বসে পড়ল। ইচ্ছা করলে সেই মুহূর্তে তাকে বধ করতে পারতাম। কিন্তু অসহায় শত্রুকে হত্যা করতে প্রবৃত্তি হল না। যে-কোনো সাধারণ মানুষ ওই অবস্থায় পড়লে অচেতন হয়ে পড়ত- তবে জল্লাদের কথা স্বতন্ত্র, সে হচ্ছে অমানুষিক মানুষ কয়েক মুহূর্ত পরে তরবারি তুলে নিয়ে সে আবার আমাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হল।
আমিও তখন তাকে বধ করতে কৃতসঙ্কল্প, তরবারি আন্দোলিত করে চরম আঘাত হানতে যাব সহসা আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল পরিচিত কণ্ঠস্বর, ক্ষান্ত হও! এসব কি হচ্ছে?
সচমকে মুখ তুলে দেখলাম অশ্বপৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়েছে পরন্তপ। তার মস্তক আবৃত করে অবস্থান করছে বিরাট উষ্ণীষ এবং উষ্ণীষ-সংলগ্ন বস্ত্রের তলায় অদৃশ্য হয়েছে মুখের নিম্নভাগ। সমস্ত মুখের মধ্যে দৃষ্টিগোচর হয় রোমশ জ্বর নীচে একজোড়া জ্বলন্ত চক্ষু!
পরন্তপ আবার হাঁক দিল, এসব কি কাণ্ড? নিজেদের মধ্যে হানাহানি কেন?
একজন দস্যু সংক্ষেপে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করল।
পরন্তপ জল্লাদের দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলল, তোমার নিষ্ঠুর স্বভাবের জন্য অনেকবার তোমাকে আমি তিরস্কার করেছি, সাবধান করে দিয়েছি। তোমার হাতে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারিনি, তাই ছুটে এসেছি। অনর্থক নিষ্ঠুরতা আর নির্যাতন বিশেষ করে নারী-নির্যাতন আমি পছন্দ করি না; আমার দলে এই ধরনের ঘটনা কখনই ঘটতে দেব না। জল্লাদ। তোমার মতো মানুষের স্থান আমার দলে হবে না- যাও! দূর হও!
আমার দিকে একটিমাত্র চক্ষের অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জল্লাদ বলল, কর্ণদেব! আজ তুমি বেঁচে গেলে! কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে। পরন্তপের অসি তোমাকে সর্বদা রক্ষা করতে পারবে না।
আমি অট্টহাস্য করে বললাম, অপরের অসির সাহায্যে যে আমার প্রয়োজন হয় না, একথা কি এখনও বুঝতে পারোনি? জল্লাদ! পুনরায় তোমার সাক্ষাৎলাভের জন্য আমিও উদগ্রীব হয়ে রইলাম।
বল্লভ! এই হল জল্লাদের সঙ্গে আমার কলহের পূর্ব-ইতিহাস! পাঁচটি গ্রাম্য তরুণের সঙ্গে আমার বিরোধের ঘটনা আপনাকে আগেই বলেছি। এখন জল্লাদের সঙ্গে আমার দ্বন্দ্বযুদ্ধের কাহিনিও শুনলেন। দুটি ঘটনা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে যোগসুত্র না থাকলেও ওই দুটি ঘটনার জন্যই আমার জীবন বিপন্ন হয়েছিল। প্রথম ঘটনার ফলে নহুষ শর্মার সঙ্গে আমার যে-ভাবে পরিচয় ঘটেছিল, তাতে পরবর্তীকালে সশস্ত্র সংঘর্ষে আমার অস্ত্রচালনায় দক্ষতার সংবাদ শুনলে তিনি আমার সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হয়ে উঠতেন। তার ভয়ে বিচারালয়ে না গিয়ে নেকড়েবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাপৃত হয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাইলাম এবং তার ফলে জল্লাদের কবলে পড়লাম। আপনি না থাকলে আমার আজ রক্ষা ছিল না। পাষণ্ড জল্লাদ যে রাজধানীতেই আশ্রয় গ্রহণ করেছে সে কথা আমি জানতাম না।
