বললাম, মহাশয়! এক অসহায় কিশোরের নিষ্ফল ক্রোধের উক্তি কি আপনি ক্ষমা করতে পারেন না?
নহুষ শর্মা বললেন, পারি। কিন্তু তোমার কথার মধ্যে এমন এক ভয়ংকর সঙ্কল্পের আভাস ছিল, যাকে নিষ্ফল বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাই হোক, তোমার সুন্দর মুখশ্রী ও বাচনভঙ্গি আমার মনে স্নেহের উদ্রেক করেছে তোমার কার্যকলাপ সমর্থন করতে না পারলেও তোমার বীরত্ব ও তেজস্বিতা আমায় মুগ্ধ করেছে সেইজন্য এবং আমার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটবে বলে তোমার সম্পর্কে বিশেষ অনুসন্ধান না করেই তোমাকে আজ অব্যাহতি দিচ্ছি। কিন্তু মনে রেখো, ভবিষ্যতে যদি এই ধরনের কোনো ঘটনায় তোমাকে জড়িত দেখতে পাই, তাহলে তুমি সহজে নিষ্কৃতি পাবে না। এখন তুমি যেতে পারো।
বল্লভ! কাল অপরাহ্নে নহুষ শর্মার দরবারে রত্নাকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হলে আমার বিপদ হত। অনুসন্ধানের ফলে হয়তো পরন্তপের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গোপন থাকত না। আর কিছু না হোক– নহুষ শর্মা সন্দেহবশে বেশ কিছুদিন আমাকে বন্দি করে রাখতেন। এখন যদি সাতটা দিনও আমি বন্দি থাকি তাহলে আমরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব…।
বাধা দিয়ে বল্লভ বলল, তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? অর্থাৎ দস্যুদলের ক্ষতি হবে?
কর্ণদেব ক্ষুব্ধস্বরে বলল, আমি দস্যুদলের অন্তর্ভুক্ত নই। পূর্বেই বলেছি আমি পরন্তপের বিশ্বস্ত অনুচর। আমরা অর্থাৎ আমি আর পরন্তপ ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাছাড়া আমি যদি নিষ্ক্রিয়ভাবে কয়েকটা দিন বন্দিশালায় থাকি, তবে হয়তো আরও একটি মানুষের অপমৃত্যু ঘটতে পারে।
বটে! বটে! আমার কৌতূহল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই মানুষটি কে? কার অপমৃত্যুর সম্ভাবনায় তুমি উৎকণ্ঠিত?
–ধীরে, বল্লভ, ধীরে! সব কথাই যথাসময়ে বলব। এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কেন আমি নেকড়েবাহিনীর দুর্বৃত্তদের সম্মুখীন হয়েছিলাম? দুর্বৃত্তদের তরবারির চাইতে নহুষ শর্মা আমার পক্ষে অনেক বেশি বিপজ্জনক!
-বুঝলাম। কিন্তু জল্লাদের ব্যাপারটা পরিষ্কার হল না। তোমার সঙ্গে তার যে কথাবার্তা হয়েছিল তাতে বুঝেছিলাম পূর্বে তোমার সঙ্গে তার বিবাদ হয়েছিল। সেই বিবাদ শুধু বাকযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তোমার অস্ত্রাঘাতে সে একটি চক্ষুও হারিয়েছিল। সুযোগ বুঝে কাল সে নেকড়েবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তোমার সঙ্গে জল্লাদের শত্রুতা হল কেন?
–সেই কথাই তো বলতে চাইছি। আপনি আমাকে বলতে দিচ্ছেন কই?
–দুঃখিত। এই আমি মৌনব্রত অবলম্বন করলাম। এবার জল্লাদের কাহিনি বলো।
কর্ণদেব আবার আত্মকাহিনি শুরু করল, আপনাকে বলেছি পরন্তপের অনুচর হলেও আমি সক্রিয়ভাবে কখনও হত্যা বা লুণ্ঠনকার্যে যোগ দিইনি–তবে কখনো কখনো দলপতির দেহরক্ষী হয়ে দস্যুদের সঙ্গে অকুস্থলে গিয়েছি বটে। ওই সময় জল্লাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তার স্বভাবচরিত্র আমার ভালো লাগেনি। সেও আমাকে পছন্দ করত না। কিন্তু দৈবক্রমে হঠাৎ একবার তার সঙ্গে যোগ দিয়ে দস্যুবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ঘটনাটা কি করে ঘটল সেই কথাই বলছি।
এক নির্ধারিত তারিখে সদ্যবিহাহিতা এক বন্ধু যখন স্বামীর সঙ্গে পতিগৃহে যাবে, সেই সময়ে পথিমধ্যে সেই দম্পতির উপর হানা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল পরন্তপ। কিন্তু সমবেত দস্যুদলের ভিতর থেকে একটি দুর্বিনীত দস্যু হঠাৎ কথায় কথায় পরন্তপকে অপমান করে। ক্রুদ্ধ পরন্তপ তৎক্ষণাৎ তাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানায়। যুদ্ধে সেই দস্যুর মৃত্যু ঘটে। পরন্তপও প্রতিদ্বন্দ্বীর অসিতে আহত হয়। আঘাত খুব মারাত্মক না হলেও আমি তাকে অভিযানে যোগ দিতে নিষেধ করি। সদ্যবিবাহিতা সালঙ্কারা বধূ ও তার স্বামীর সঙ্গে অস্ত্রধারী প্রহরীদের অবস্থান স্বাভাবিক- যদি যুদ্ধ বাধে এবং পরন্তপের আহত স্থানে যদি অস্ত্রাঘাত হয়, তাহলে রক্তপাতের ফলে তার প্রাণবিপন্ন হতে পারে মনে করেই আমি নিষেধ করেছিলাম। পরন্তপ প্রথমে আমার কথায় কান দেয়নি, কিন্তু আমি যখন ক্রোধপ্রকাশ করে জানালাম, আমার কথা না শুনলে তার সাহচর্য ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ যাত্রা করব, তখন সে ভীত হল। পরন্তপ জানত আমি বৃথা বাগাড়ম্বর করি না। আমাকে সে পুত্ৰাধিক স্নেহ করে, তাই আমার নিরুদ্দেশ যাত্রার সঙ্কল্প শুনে অভিযানে যোগ দেওয়ার অভিসন্ধি ত্যাগ করল। তখন জল্লাদের নেতৃত্বে সমবেত দস্যুদল নির্দিষ্ট স্থানে হানা দিতে প্রস্তুত হল। দলপতির প্রতিনিধি হয়ে আমিও দস্যুদের সঙ্গে যোগ দিলাম। কারণ, লুষ্ঠিত দ্রব্যে দলপতির প্রাপ্য অংশ বুঝে নেওয়ার মতো বিশ্বস্ত দ্বিতীয় কোনো অনুচর পরন্তপের ছিল না।
আমরা জানতাম সন্ধ্যার প্রাক্কালে বর তার নিজস্ব গ্রামে পৌঁছাবে। সেখানে গিয়ে তাদের আক্রমণ করা খুবই কঠিন। তাই প্রকাশ্য দিবালোকেই তাদের উপর চড়াও হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গ্রাম হতে গ্রামান্তরে যাওয়ার পথে প্রখর সূর্যালোকে দুস্যর আক্রমণের সম্ভাবনা কেউ চিন্তাই করতে পারেনি। তাই বনের ভিতর গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা যখন অতর্কিতে আক্রমণ করলাম, তখন দম্পতির সঙ্গে যে সশস্ত্র প্রহরীর দল ছিল, তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার আগেই অধিকাংশ প্রহরী দস্যুদের অস্ত্রাঘাতে হতাহত হয়ে ভূমিশয্যায় শায়িত হল, বাকি সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে বাঁচল। বর ও বধু পালাতে পারেনি। তাদের সঙ্গে যে পেটিকায় স্বর্ণলঙ্কার ও মণিমুক্তা ছিল, সেই পেটিকাটি অবিলম্বে অধিকার করল জল্লাদ। তারপর বধুর গায়ে হাত দিয়ে তার অলঙ্কার খুলে নিতে সচেষ্ট হল। স্বামী এতক্ষণ নিরুপায় হয়ে চুপ করে ছিল, কিন্তু সদ্যবিবাহিতা পত্নীর দেহে দস্যুর হাত পড়তেই সে আর আত্মসংবরণ করতে পারল না- সক্রোধে ধাক্কা দিয়ে জল্লাদকে সরিয়ে দিয়ে বলে উঠল, সাবধান! গায়ে হাত দিও না। অলঙ্কার আমি খুলে দিচ্ছি।
