আমার বিরুদ্ধে যারা কলহে প্রবৃত্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করল, ওর হাতে অস্ত্র ছিল যে!
আমি বক্তার দিকে তাকালাম– সে ওই তরুণদের দলপতি। তার কাঁধের উপর জড়ানো ছিল কাপড়ের আবরণ, কাপড়ে শুষ্ক রক্তের চিহ্ন।
সেই রক্তচিহ্নিত স্থান দেখিয়ে সে বলল, দেখুন, ও আমার স্কন্ধে ছুরিকাঘাত করেছে। আমরা নিরস্ত্র অবস্থায় কি করতে পারি?
মধ্যবয়স্ক পুরুষ আমার দিকে ফিরলেন, একথা সত্য?
বললাম, সম্পূর্ণ সত্য নয়। আমি একাকী ওদের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র অবস্থায় লড়াই করেছিলাম এবং ওদের বিধ্বস্ত করে পানাগারের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। ওদের মধ্যে কেউ তখন আমার সম্মুখে আসতে ভরসা পায়নি। হঠাৎ এই তরুণটি পানাগারের ভিতর থেকে একটি লৌহদণ্ড নিয়ে আমাকে আক্রমণ করল। বাধ্য হয়ে আমি তখন ছুরিকা ব্যবহার করেছি।
প্রশ্নকর্তা জ্বলন্ত নেত্রে তরুণের দিকে তাকালেন। সে মাথা নত করে মাটির দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করল। প্রশ্নকর্তা কাঠোর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি প্রথম থেকে সব শুনেছি। এই দুর্ঘটনার জন্য তোমরাই দায়ী।
কলহে জড়িত আরও চারটি তরুণ সেইখানেই দাঁড়িয়েছিল, তিনি এবার তাদের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন, ওকে ব্যঙ্গ করে তোমরাই প্রথম কলহ শুরু করেছ। তারপর দল বেঁধে ওকে আক্রমণ করলে। কিছুতেই যখন সুবিধা করতে পারলে না, তখন পাঁচ-পাঁচটি তরুণ বয়ঃকনিষ্ঠ এই কিশোরের হাতে মার খেয়ে লৌহদণ্ড নিয়ে তাকে আক্রমণ করলে। ও যদি আত্মরক্ষার জন্য ছুরিকা ব্যবহার করে থাকে তাতে দোষ কি? তোমরা অতিশয় নির্লজ্জ, ভীরু, কাপুরুষ। তোমরা দেশের তরুণ সমাজের কলঙ্ক।
এই প্রচণ্ড ভৎর্সনার প্রতিবাদে কেউ একটি কথাও বলল না। পঞ্চায়েতের বিচারকমণ্ডলী, জনতা এবং কলহে জড়িত পাঁচটি তরুণ সম্পূর্ণ নির্বাক।
মধ্যবয়স্ক পুরুষ এইবার গ্রাম-পঞ্চায়েতেকে সম্বোধন করে বললেন, ভদ্রমহোদয়গণ, আমি পঞ্চায়েতের কেউ নই। এখানে কথা বলার অধিকারও আমার নেই। কিন্তু আপনারা আমাকে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার অধিকার দিয়েছেন বলেই বলছি আমার বিচারে এই দুর্ঘটনার জন্য গ্রামের পাঁচটি তরুণ-ই দায়ী- এই কিশোরের অপরাধ বিশেষ গুরুতর নয়। পরকে শাসন করার আগে ঘরকে শাসন করলেই ভালো করবেন। আমার বক্তব্য আপনারা শুনলেন, এখন যথাকৰ্তব্য করুন।
পঞ্চায়েতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়স্ক মানুষটি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, নহুষ শর্মা। আপনি শ্রাবন্তী রাজ্যের রাজধানীতে প্রধান বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত। এই গ্রামে আপনার শ্বশুরালয়; সেই সুবাদে আপনি গ্রামের জামাতা। এই কিশোর এবং পাঁচটি তরুণের বিচার আপনি করুন। গ্রাম-পঞ্চায়েত আপনাকে সেই অধিকার দিচ্ছে। পঞ্চায়েতের মুখপাত্র হয়ে আমি বলছি আপনার বিচার বুদ্ধির উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।
নহুষ শর্মা মাথা নত করে পঞ্চায়েতকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, মহাশয় পুলোম যা বললেন আশা করি তাতে আপনাদের সম্মতি আছে।
জনতা সোৎসাহে জানাল নহুষ শর্মার উপর তাদের আস্থার অভাব নেই।
নহুষ শর্মা তখন বললেন, গ্রামবাসী এবং পঞ্চায়েতের আদেশ অনুসারে আমি কিশোর ও পাঁচটি তরুণের বিচারের ভার গ্রহণ করেছি। শোনো! তোমরা পাঁচটি তরুণই এই কিশোরের হাতে অল্পবিস্তর প্রহার লাভ করেছ, তাই তোমাদের আর শাস্তি দিতে চাই না। আশা করি এই শিক্ষা তোমাদের মনে থাকবে এবং ভবিষ্যতে দলে ভারি হয়ে কারও উপর অত্যাচার করতে যাবে না… আর কিশোর, তোমার অপরাধ তত গুরুতর নয়। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন আছে।
বললাম, বলুন। কি প্রশ্ন?
নহুষ শর্মার দুই চোখের দৃষ্টি আমার মুখের উপর পড়ল, একটু আগেই বিচারসভার সম্মুখে তুমি তোমার নাম জানিয়েছ। কর্ণদেব! তোমার দেব উপাধি থেকে বুঝতে পারছি তুমি ব্রাহ্মণ সন্তান। কিন্তু ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও তুমি মল্লযুদ্ধ ও মুষ্টিযুদ্ধে এমন দক্ষতা অর্জন করেছ যে, তোমার চাইতে বয়সে বড়ো পাঁচটি বলিষ্ঠ তরুণকে তুমি হাতাহাতি যুদ্ধে পরাস্ত করতে সমর্থ। ব্রাহ্মণ সন্তানের এমন ক্ষত্রিয়ের মতো আচরণ আমাকে আশ্চর্য করে দিয়েছে। তাছাড়া আরও একটা কথা- তোমার বস্ত্রের ভিতর লোকচক্ষুর অগোচরে তুমি শাণিত ছুরিকা বহন করেছিলে। তোমার আচরণ ব্রাহ্মণ জনোচিত নয়। তুমি কি সত্যই ব্রাহ্মণ সন্তান?
আমি আঙরাখার ভিতর থেকে উপবীত সূত্র দেখিয়ে বললাম, আমার বাক্যে যদি বিশ্বাস না হয় তবে এই সূত্র দেখুন। মল্লযুদ্ধ, অসিক্রীড়া প্রভৃতি পুরুষোচিত ক্রীড়াকলাপ আমার ভালো লাগে, তাই বাল্যকাল থেকেই অনুশীলন করে ওই সকল রণবিদ্যায় কিঞ্চিৎ পারদর্শিতা লাভ করেছি। সঙ্গে ছুরিকা রাখার কারণ আছে। আমার সঙ্গে কিছু অর্থ রয়েছে। স্ব-অপহারক দুস্যতস্কর কর্তৃক হঠাৎ আক্রান্ত হলে ধনপ্রাণ রক্ষার জন্য ছুরিকা বহন করছি। যতদূর জানি, দেশের আইনে ব্রাহ্মণ সন্তানের পক্ষে শাস্ত্রচর্চা বা অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ নয়। প্রবাদ আছে- যে ব্যক্তি রন্ধন করিতে পারে, সে কেশের পরিচর্যাতেও সমর্থ! অতএব শাস্ত্রচর্চার সঙ্গে শস্ত্রচর্চা করতেই বা বাধা কিসের?
নহুষ শর্মার মুখে হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল, কিশোর! তুমি বাপটু বটে। তোমার বাচনভঙ্গি থেকে বোঝা যায় তুমি শিক্ষিত এবং সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। শাস্ত্র ও শস্ত্র সম্পর্কে তোমার বক্তব্য মেনে নিলেও তোমার কৈফিয়ত সম্পূর্ণ সন্তোষজনক নয়। তুমি কোথায় থাকো? সঙ্গে অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে কোথায় গমন করেছিলে?… এইসব প্রশ্ন করলে তার উত্তর সন্তোষজনক হবে কি না জানি না তবে এই মুহূর্তে তোমাকে নিয়ে আমি মস্তিষ্ককে বিব্রত করতে ইচ্ছুক নই। রাজকার্য ছেড়ে কয়েকদিন বিশ্রামলাভের আশায় এখানে আমার শ্বশুরালয়ে এসেছি, তোমাকে নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে আমার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটবে। তবে তোমার সম্পর্কে আমার কৌতূহল রইল। ভবিষ্যতে যদি তোমাকে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িত দেখি, তাহলে হয়তো এত সহজে নিষ্কৃতি পাবে না। আরও একটা কথা বেত্রাঘাতের সম্ভাবনায় উত্তেজিত হয়ে তুমি যেভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের সঙ্কল্প ঘোষণা করেছিল, সেটাও খুব উদ্বেগজনক। আমি ওই ধরনের কথা পছন্দ করি না।
