কলহের জন্য প্রস্তুত হয়ে বললাম, আপনাদের আচরণে যদি আমি ধৈর্যচ্যুত হই, তাহলে সেটা আপনাদের পক্ষে নিতান্ত দুঃখের কারণ হবে। অতএব, অনুমতি করুন– আমি অন্যত্র গমন করি।
যে-তরুণটি আমাকে দাতাকর্ণ নামে বিদ্রূপ করেছিল, সে একলাফে আমার সামনে এসে ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ওরে বর্বর! এই গ্রাম থেকে অত সহজে তুই যেতে পারবি না। আমাদের গ্রামে এসে আমাদেরই বিদ্রূপ করিস তোর এত স্পর্ধা!
আমি সহজভাবে বললাম, স্পর্ধা তো আপনাদেরই দেখছি। পথ ছাড়ুন। নচেৎ শাস্তি পেতে হবে।
তরুণটি সহসা আমার মুখ লক্ষ্য করে মুষ্ঠাঘাত করল। প্রস্তুত ছিলাম, একহাতে আঘাত প্রতিহত করে অপর হাতে তার কর্ণমূলে সজোরে আঘাত করতেই সে সশব্দে ভূমিশয্যা গ্রহণ করল। পরন্তপের কাছে হাতাহাতি যুদ্ধের তালিম নেওয়ার পর এমনভাবে নিজের বিদ্যা ও শক্তিপরীক্ষার সুযোগ আগে কখনও ঘটেনি বিদ্যুৎবেগে হাত ও পায়ের সদ্ব্যবহার করতে করতে পিছু হটে আমি পানাগারের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। পাঁচটি তরুণই তখন অল্পবিস্তর আহত, দুজনের আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। হঠাৎ তাদের দলপতি ভূমিপৃষ্ঠ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুতবেগে বিপণির ভিতর একটি কক্ষে প্রবেশ করল মুহূর্তপরে সে যখন আবার ঘরের বাইরে আত্মপ্রকাশ করল, তখন তার হাতে রয়েছে একটি লৌহদণ্ড!
আমার বস্ত্রের অভ্যন্তরে ছিল সুদীর্ঘ ছুরিকা। বিপদ বুঝে আমি গোপন স্থান থেকে ছুরিকা টেনে নিয়ে রুখে দাঁড়ালাম। বল্লভ! আপনি দেখেছেন অসিধারী কিঞ্জলকে আমি ছুরিকার সাহায্যে পরাস্ত করেছি- রণবিদ্যায় অনভিজ্ঞ গ্রাম্য তরুণ লৌহদণ্ড নিয়ে আমার কি করতে পারে? কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাকে ছুরিকাহত করে আমি তার হাত থেকে লৌহদণ্ড ছিনিয়ে নিলাম। আঘাত মারাত্মক হয়নি, কিন্তু আহত তরুণ রক্তাক্ত স্কন্ধদেশ চেপে ধরে ছটফট করতে লাগল– তার চারটি সঙ্গী ও পানাগারের অধিকারী সভয়ে চিৎকার করে গ্রামবাসীদের সাহায্য চাইতে শুরু করল। একহাতে লৌহদণ্ড আর অন্যহাতে ছুরিকা তুলে গ্রামের পথে ছুটতে ছুটতে তারস্বরে ঘোষণা করলাম, আমার সম্মুখে যে আসবে, তাকেই আমি হত্যা করব।
আমি নিশ্চয়ই সেদিন নিরাপদে গ্রামের সীমানা অতিক্রম করতে পারতাম, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য– হঠাৎ সেইসময় গ্রামের ভিতর উপস্থিত হল একদল অশ্বারোহী সীমান্তরক্ষী। আমি বন্দি হলাম। দেশের আইন-অনুসারে আমার বিচার হল গ্রাম-পঞ্চায়েতের সভায়। সব শুনে গ্রাম-পঞ্চায়েতের মাতব্বররা স্থির করলেন আমার বয়স কম, অতএব বেত্রাঘাত করে আমাকে রেহাই দেওয়া যেতে পারে।
ক্রোধে আমার রক্ত ফুটতে লাগল– প্রকাশ্য সভায় বেত্রাঘাত! এই অপমান অসহ্য।
সভামধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে আমি বললাম, এই কি পঞ্চায়েতের বিচার? আমি ভিন্ গাঁয়ের মানুষ; এই গ্রামের তরুণরা আমাকে অপমান করেছে। আমি তার প্রতিবাদ করেছিলাম সেই অপরাধে তারা দলবেঁধে আমাকে আক্রমণ করল! আমি নিরুপায় হয়ে ছুরিকার সাহায্যে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছি সেইজন্য প্রকাশ্য সভায় বেত্রাঘাত? আমিও জানিয়ে দিচ্ছি আমার দেহে যে ব্যক্তি বেত্রাঘাত করবে, তাকে আমি হত্যা করব। আজ আমি বেত্ৰাহত হয়ে ফিরে যাব বটে, কিন্তু একদিন ফিরে আসব সেদিন আঘাতকারীকে তো হত্যা করবই, গ্রাম-পঞ্চায়েতের মাতব্বর ব্যক্তিরাও আমার কবল থেকে নিস্তার পাবেন না। আমার মনের দর্পণে আপনাদের সকলের প্রতিকৃতি স্থায়ীভাবে অঙ্কিত হয়ে গেছে কারুকেই আমি ভুলব না।
সেই মুহূর্তে পরন্তপ এবং কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সত্যই সেই গ্রামে হানা দেওয়ার সঙ্কল্প করেছিলাম। নিঃসঙ্গ এক কিশোরের স্পর্ধিত বাক্যে সমবেত গ্রামবাসী স্তম্ভিত হয়ে গেল, তারপরই জনতার ভিতর জাগল ক্রুদ্ধ কোলাহল।
পক্ককেশ গ্রামপ্রধান উঠে বললেন, বালক! তোমার স্পর্ধা অসহ্য। এখনই তোমাকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করা হবে।
আমি হেসে উঠে বললাম, পরিণাম স্মরণ রাখবেন। ডাকুন, দেখি কে আমার দেহে কশাঘাত করে?… মনে রেখো ভাই যে-ব্যক্তি আমার দেহে বেত্রাঘাত করবে, আজ থেকে দ্বাদশ দিবসের মধ্যেই আমার তরবারি তার বক্ষে বিদ্ধ হবে।
গ্রাম-প্রধানের আহ্বানে এক বলিষ্ঠ পুরুষ কশাহস্তে এগিয়ে এল, কিন্তু আমার কথা শুনে আর আমর চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে আতঙ্কের সঞ্চার হল সে ইতস্তত করতে লাগল।
সহসা জনতার ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ, বিনীতভাবে পঞ্চায়েতকে অভিবাদন জানিয়ে তিনি বললেন, এখানে অবশ্য আমার কিছু বলার অধিকার নেই। আমি এই গ্রামে এসেছি আমার আত্মীয়ের গৃহে অবসর যাপন করতে। তবে আপনারা যদি অধিকার দেন তাহলে আমি কয়েকটি কথা বলতে পারি।
জনতার ভিতর জাগল গুঞ্জনধ্বনি। গ্রাম-পঞ্চায়েতের বিচারকরা উপবিষ্ট অবস্থা থেকে হঠাৎ দণ্ডায়মান হয়ে শশব্যস্তে বলে উঠলেন, বিলক্ষণ! বিলক্ষণ! আপনি গ্রামের মানুষ না হলেও আপনার পদধূলি পেয়ে গ্রামবাসী কৃতার্থ। বলুন, আপনার কি বক্তব্য?
মানুষটি এগিয়ে এসে সভার মধ্যস্থলে দাঁড়ালেন, তারপর গম্ভীরস্বরে বললেন, আমি সমস্ত ঘটনাই শুনেছি। একটিমাত্র কিশোরের বিরুদ্ধে যে পাঁচটি তরুণ সমবেতভাবে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাদেরই আগে শাস্তি হওয়া উচিত। আরও লজ্জার কথা সকলে মিলেও এই কিশোরটিকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং তার হাতে মার খেয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেছে। সীমান্তরক্ষীর দল হঠাৎ অকুস্থলে উপস্থিত না হলে এই কিশোর ওদের লাঞ্ছিত করে পলায়ন করতে সমর্থ হতো। কী লজ্জা!
