পরন্তপের কাছে প্রায় তিন বৎসর শিক্ষাগ্রহণ করার পর আমি যখন অস্ত্রচালনায় বিশেষ করে তরবারি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠেছি, সেই সময় এক অলস মধ্যাহ্নে কিঞ্চিৎ মাধ্বীপানের উদ্দেশে নিকটবর্তী এক গ্রামের পানশালায় গমন করলাম। প্রসঙ্গত জানাচ্ছি, বনের মধ্যে পরন্তপের একটি স্থায়ী বাসগৃহ ছিল, কিন্তু আমি ছাড়া দলের কেউ ওই গৃহের সন্ধান জানত না। আমি ছিলাম তার সর্বপেক্ষা বিশ্বস্ত সহচর, একান্ত স্নেহের পাত্র। দলের কোনো কোনো ব্যক্তি আমাকে ঈর্ষা করত। কিন্তু প্রকাশ্য কলহে অবতীর্ণ হতে কেউ সাহস পেত না! কারণ, বন্ধুভাবে অসিক্রীড়া করার সময়েই তারা আমার ক্ষমতার পরিচয় পেয়েছিল একাধিকবার। তাছাড়া, পরন্তপ সম্পর্কে নিদারুণ ভীতি তাদের প্রকাশ্য শত্রুতা থেকে নিরস্ত করেছিল। পরন্তপ আমাকে ভালোবাসত তার সন্তানের মতো। দেশের মানুষ তাকে ঘৃণা করতে পারে, কিন্তু আমি তার যে পরিচয় পেয়েছি
বাধা দিয়ে বল্লভ বলল, অপ্রয়োজনীয় আলোচনার সময় নেই। তোমার কথা বলো। পরন্তপের কথা শুনতে চাই না।
-ঠিক! ঠিক! হঠাৎ ভাবপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। এই আকস্মিক দুর্বলতার জন্য ক্ষমা করবেন। যে দুস্য সমগ্র দেশে আতঙ্কের সঞ্চার করেছে, তার সম্পর্কে আপনার ন্যায় সৎ নাগরিকের অনীহা থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমি জানি পরন্তপ শুধু নরঘাতক দুস্য নয়, তার নিজস্ব জীবন-দর্শন আছে। নিজের আত্মার কাছে সে নিষ্কলুষ, ভাবের ঘরে চুরি সে কখনো করে না। যাই হোক তার প্রসঙ্গ ছেড়ে এবার আমার কথাই বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন।
পানশালায় গিয়ে দেখলাম কয়েকটি গ্রাম্য যুবক শীতল পানীয় ও খাদ্য সহযোগে অবসর বিনোদন করছে। আমি কারও দিকে দৃকপাত না করে এক পাত্র মাধ্বী ও কিছু শূল্য মাংস নিয়ে পানাহার শুরু করলাম। হঠাৎ সেইস্থানে এক দরিদ্র ব্যক্তি এসে বিপণির অধিকারীর কাছে কিছু খাদ্য ও পানীয় চাইল। অধিকারী জানাল এটা দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। অতএব উপযুক্ত মূল্য না পেলে সে খাদ্য বা পানীয় দিতে অপারগ। লোকটি সর্বস্ব গণনা করে দেখল তার কাছে মাত্র এক পাত্র মাধ্বীর মূল্য আছে। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে সে বলল, বহুদুর থেকে আসছি। আরও কয়েকটি গ্রামের পরে আমার মাতুলের গৃহ। সেখানে উপস্থিত হলে আমার কোনো অসুবিধা থাকবে না। কিন্তু এখন ক্ষুৎপিপাসায় আমি নিতান্ত কাতর, পথ চলার ক্ষমতা আর নেই! আচ্ছা, এই অর্থের বিনিময়ে এক পাত্র মাধ্বী দাও। আশা করি মাধ্বী পান করে কিছুটা সতেজ হব এবং বাকি পথ অতিক্রম করতে সমর্থ হব। তবে ঋণস্বরূপ যদি কিছু খাদ্য দাও, তবে ফেরার সময়ে আমি মূল্য শোধ করে দেব অঙ্গীকার করছি।
অধিকারী বলল, তুমি অপরিচিত। তোমার অঙ্গীকারের মূল্য কি?
গ্রাম্য যুবকদের মধ্যে একজন সহাস্যে মন্তব্য করল, এটা তোমার মাতুলালয় বা শ্বশুরালয় নয়। নগদ অর্থ দিতে না পারলে সোজা পথ দেখ।
খাদ্যসম্ভারের দিকে ক্ষুধার্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লোকটি বলল, তাহলে আমাকে একপাত্র মাধ্বীই দাও। সুরার প্রভাবে হয়তো ক্লান্তি দূর হতে পারে।
আমার কাছে প্রচুর অর্থ ছিল। দস্যুদের লুণ্ঠন-অভিযানে আমি যোগ দিতাম না বটে, কিন্তু অর্থাভাব আমার ছিল না। স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্রমুদ্রা মিলিয়ে বেশ কিছু অর্থ পরন্তপ আমার কাছে রেখে দিয়েছিল এবং সেই অর্থ প্রয়োজনবশে ব্যয় করার অনুমতিও আমার ছিল। অর্থব্যয় করার জন্য কোনো কৈফিয়ত আমি দিতাম না, বা সেও কৈফিয়ত চাইত না। সুতরাং আমার কাছে সর্বদাই কিছু না কিছু অর্থ তো থাকতই, এমনকি কখনো কখনো মূল্যবান রত্নাদিও থাকত। ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে তৃপ্ত করার জন্য সেই অর্থ থেকে কিছু ব্যয় করতে মনস্থ করলাম। অধিকারীর দিকে তাকিয়ে বললাম, ওর ইচ্ছামতো খাদ্য দাও। মূল্য আমি দেব।
আমার আদেশ পালিত হল। লোকটি আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দক্ষিণ হস্তের সদ্ব্যবহার শুরু করল। কিয়ৎকাল পরে তৃপ্ত হয়ে সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্থান করল। আমার এবং তার খাদ্য ও পানীয়ের মূল্য অধিকারীকে দিয়ে আমিও স্থানত্যাগ করতে উদ্যত হলাম। হঠাৎ উপবিষ্ট গ্রাম্য তরুণদের মধ্যে একজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, মহাশয়! আপনার ন্যায় দাতাকর্ণ এই দেশে বিরল। তা আমাদের প্রতি কিঞ্চিৎ কৃপা প্রদর্শন করুন। আমরাও ক্ষুৎপিপাসায় কাতর। অধিকারীকে বলে আমাদের ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণের ব্যবস্থা করুন।
ওই তরুণটি বোধহয় দলের নায়ক। তার কথা শুনে সকলের মুখেই ব্যঙ্গের চাপা হাসি ফুটল। আমি বুঝলাম আমকে নিয়ে তারা একটু মজা লুঠতে চায়। সম্ভবত তারা ভেবেছিল এক নিঃসঙ্গ কিশোর অপরিচিত পরিবেশের মধ্যে একদল তরুণের সঙ্গে কলহে প্রবৃত্ত হতে সাহসী হবে না। আমাকে তারা ইচ্ছামতো লাঞ্ছিত করতে পারবে। তাদের ভ্রম-সংশোধন করতে উদ্যোগী হলাম, বললাম, মহাশয়! পিতামাতা আমার নাম রেখেছিলেন কর্ণদেব। দাতাকর্ণ নামে আমাকে কেউ অভিহিত করে না। কিন্তু আপনার কথাবার্তার ধারা দেখে আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার কর্ণের সঙ্গে আমার হস্তের যোগাযোগ ঘটতে পারে যে কোনো মুহূর্তে।
ক্রুদ্ধ গর্জন করে তরুণটি কাষ্ঠাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার সঙ্গীদের মুখেও ফুটল ক্রোধের আভাস। আমি তাকিয়ে দেখলাম সবসুদ্ধ সেখানে রয়েছে পাঁচটি গ্রাম্য তরুণ। দ্রুত চিন্তা করে বুঝে নিলাম এই পাঁচজন যদি একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলেও তাদের হতাহত করে আমি বেরিয়ে যেতে পারব। অধিকাংশ মানুষই তখন গ্রামের বাইরে, যারা গ্রামে আছে তারাও দিবানিদ্রায় মগ্ন গোলমাল শুনে সকলে সমবেত হওয়ার আগেই এই পাঁচটি তরুণকে ধৃষ্টতার দণ্ড দিয়ে গ্রামত্যাগ করতে আমার অসুবিধা হবে না।
