ব্যাঘ্রের হন্তারক এগিয়ে এসে নিহত শ্বাপদের দেহে তরবারি ঘর্ষণ করে অস্ত্র থেকে শোণিতচিহ্ন লুপ্ত করে ফেলল। তারপর নিষ্কলঙ্ক অসি কোষবদ্ধ করে আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান হল।
কিছুক্ষণ আমাকে স্থিরদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে ওই ব্যক্তি বলল, বালক! এই অঞ্চলে কোনো মানুষ একাকী ভ্রমণ করে না। নরখাদক ব্যাঘ্ৰ অধ্যুষিত এই অরণ্যে তুমি সন্ধ্যাকালে কেন এসেছ? বোধহয় তোমার পথ ভুল হয়েছ। তুমি কোথায় যেতে চাও?
আগন্তুকের কণ্ঠস্বর গভীর, কিন্তু স্নেহের স্পর্শে কোমল। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম তার ঊর্ধ্ব-অঙ্গে পীতাভ আঙরাখা, নিম্ন-অঙ্গ আগুলফ আচ্ছাদিত যোদ্ধৃসুলভ শ্বেতবস্ত্রে। আবরণের ভিতর থেকেও তার স্কন্ধ ও বক্ষের স্ফীত মাংসপেশী চোখে পড়ে। আবরণ-মুক্ত দুই বাহু দৃঢ় পেশীবদ্ধ এবং শুষ্ক ক্ষত চিহ্নে চিহ্নিত। তীক্ষ্ণ নাসা, পরিপূর্ণ ওষ্ঠাধর, মাংসহীন কঠিন চোয়াল, আর কুঞ্চিত কেশদামের নীচে অপ্রশস্ত ললাটের উপর এক জোড়া রোম জ্বর তলায় জ্বলছে এক জোড়া প্রখর চক্ষু! সব মিলিয়ে মানুষটিকে সুপুরুষ হয়তো বলা যায় না, তবে তার চেহারার মধ্যে যে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোমলে কঠিনে মেশা সেই আশ্চর্য সৌন্দর্যকে অনুভব করা যায়, ভাষায় সাহায্যে ব্যক্ত করা যায় না।
আগন্তুক আবার কোমল-গম্ভীর স্বরে বলল, বালক, ভয় নেই। ব্যাঘ্র নিহত হয়েছে। বলল, তুমি কোথায় যাবে? আমি স্বয়ং তোমাকে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসব।
বললাম, জানি না। এই পৃথিবীতে আমার যাওয়ার কোনো স্থান নেই।
আগন্তুকের তীব্র দৃষ্টি তীব্রতর হল, সে প্রশ্ন করল, সে কি! তোমার কি কেউ নেই?
আমি তখন সংক্ষেপে আমার ইতিহাস ব্যক্ত করে বললাম, তুমি আমাকে আশ্রয় দাও! আমি ভোমার কাছে অস্ত্র চালনার শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই।
আগন্তুক সকৌতুকে বলল, বিনিময়ে তুমি আমাকে কি দেবে?
বললাম, আমার আনুগত্য।
মর্মভেদী দৃষ্টি মেলে আগন্তুক আমার চোখের দিকে চাইল। তারপর গভীর স্বরে বলল, বেশ। এই কথাই রইল। যদি শিখতে চাও তবে এমন করেই শেখাব যে, হাতের তরবারি তোমার ইচ্ছাপূরণ করবে আজ্ঞাবাহী ভৃত্যের মতো। কিন্তু প্রতিজ্ঞা করে বিনা প্রতিবাদে সর্বদা আমার আদেশ পালন করবে?
বললাম, না, এমন প্রতিজ্ঞা করতে পারব না। কিন্তু শপথ করে বলছি কখনো তোমার বিরুদ্ধাচরণ করব না।
আগন্তুক বলল, তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মুখের গঠনে বোঝা যায় তুমি উচ্চবংশের সন্তান। আশা করি প্রতিশ্রুতি তোমার মনে থাকবে?
বললাম, যদি তোমার কাছে অস্ত্রশিক্ষায় সুযোগ পাই, তবে আমরণ কৃতজ্ঞ থাকব।
আগন্তুক বলল, আমি দীর্ঘকাল অস্ত্র চালনা করেছি। মানুষের শরীর দেখে তার সম্ভাবনা বুঝতে পারি। তোমার দেহের গঠন দেখে বুঝতে পারছি নিয়মিত অনুশীলন করলে তুমি নিপুণ যোদ্ধা হতে পারবে। আমি তোমাকে সযত্নে সর্বপ্রকার রণবিদ্যায় শিক্ষিত করব। এখন বলো, তোমার নাম কি?
নাম জানিয়ে আমি আমার প্রাণদাতার পরিচয় জানতে চাইলাম। আগন্তুক মৃদু হেসে বলল, আমার নাম পরন্তপ।
আমি সচমকে বললাম, দস্যু পরন্তপ!
আগন্তুক স্মিতমুখে বলল, লোকে আমার নামের আগে ওই বিশেষণটি প্রয়োগ করে বটে। বালক! তুমি কি ভয় পাচ্ছ?
বললাম, না, তুমি আমার প্রাণদাতা, তোমাকে ভয় করব কেন? তাছাড়া শুনেছি পরন্তপ অকারণে নরহত্যা করে না।
আগন্তুক বলল, ঠিক শুনেছ। শোনো বালক, তোমাকে দেখে আমার হৃদয়ে স্নেহের সঞ্চার হয়েছে। আমি স্বহস্তে কোনো ব্যক্তিকে অস্ত্রশিক্ষা দিই না। প্রয়োজনে অস্ত্রবিদ মানুষের সাহায্য নিয়ে থাকি, প্রয়োজন শেষ হলেই ওই সকল মানুষের সাহচর্য ত্যাগ করি। কিন্তু তোমাকে আমি মনের মতন করে শিক্ষা দেব। বালক! তুমি হবে আমার বিশ্বস্ত অনুচর।
বললাম, আমি চিরকাল তোমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকব। তোমার পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্রধারণ করব। কিন্তু নিতান্ত প্রয়োজন না হলে দুস্যদলের অভিযানে যোগ দেব না।
পরন্ত সহাস্যে বলল, তথাস্তু।
তারপর কেটে গেল কয়েকটি বৎসর। অস্ত্র চালনায় আমি অতিশয় নিপুণ হয়ে উঠলাম। বিশেষ করে তরবারি চালনায় আমার গুরুকেও ছাড়িয়ে গেলাম। কিন্তু একটি বিষয়ে আমি কিছুতেই তার সমকক্ষ হতে পারিনি।
কর্ণদেব একটু থামতেই বল্লভ প্রশ্ন করল, কোন্ বিষয়ে তুমি তার সমকক্ষ নও?
-বহুদূর থেকে অব্যর্থ সন্ধানে ছুরিকা নিক্ষেপ করে লক্ষ্যভেদ করতে পারে পর্যুপ। দীর্ঘকাল অনুশীলন করেও ঐ বিদ্যাটি আমি আয়ত্ত করতে পারিনি! পরন্তপের কাছে শুনেছি শৈশব থেকেই ক্রমাগত অনুশীলননের ফলে সে ছুরিকা নিক্ষেপে সিদ্ধহস্ত।
এখন জানলাম ব্রাহ্মণ সন্তান কেমন করে দস্যুর অনুচরে পরিণত হল। এবার বলো কি তোমার প্রস্তাব?
বলছি। কিন্তু আত্মকাহিনি যখন শুরু করেছি, তখন আরও কয়েকটা কথা বলতে চাই। বিশেষ করে জল্লাদ নামে যে মানুষটি আজ আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল তার সম্পর্কেও কয়েকটা কথা আপনার জানা দরকার। ওই সঙ্গে আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করব। ঘটনাটি অতি তুচ্ছ হলেও পরবর্তীকালে ওই ঘটনার জন্যই আমার জীবন বিপন্ন হয়েছিল। প্রথমে ওই ঘটনার কথা বলছি, পরে জল্লাদের কথা বলব। পরস্পর বিচ্ছিন্ন ওই দুটি ঘটনার ফলেই আজ আমি প্রাণ হারাতে বসেছিলাম।
