বল্লভের ভ্রু কুঞ্চিত হল, হঠাৎ সম্বোধনের পরিবর্তন ঘটল কেন?
কর্ণদেব মাথা নত করল, ক্রোধের বশে তুমি বলে অন্যায় করেছিলাম। মার্জনা করবেন।
বল্লভের ওষ্ঠাধরে ক্ষীণ হাসির আভাস দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল, তোমার প্রস্তাবটা এবার শুনতে চাই। কিন্তু তার আগে জানতে চাই ব্রাহ্মণসন্তান কেমন করে দস্যুর বিশ্বস্ত অনুচরে পরিণত হল।
কর্ণদেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর মাথা তুলে বাতায়নপথে অন্ধকার আকাশের দিকে দুই চোখের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে গভীরস্বরে আত্মকাহিনি শুরু করল, মহারাজ রুদ্রদমনের রাজ্যে এক ক্ষুদ্র গ্রামে আমার পিতা অধ্যাপনার কার্যে ব্যাপৃত থাকতেন। আমার জননীও বিবিধ শাস্ত্রে পারদর্শিতা লাভ করে পিতার যোগ্য সহধর্মিণী হয়ে উঠেছিলেন। আমি ছিলাম তাদের একমাত্র সন্তান। সুতরাং পিতা ও মাতা উভয়েই আমার শিক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। আমি মেধাবী ছাত্র ছিলাম। মাত্র দশ বৎসর বয়সেই আমি বিভিন্ন শাস্ত্র ও গণিতবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলাম। পিতার আশা ছিল তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও শিক্ষাদানের মহৎ কার্যে ব্রতী হব। কিন্তু মাতার ইচ্ছা ছিল অন্যরকম– মহারাজ রুদ্রদমনের সভাপণ্ডিত হয়ে রাজসভা অলঙ্কৃত করব, এই ছিল তার বাসনা। আমার নিজস্ব মতামত তখনও গঠিত হয়নি। তবে বিদ্যার্জনের আগ্রহ প্রবল ছিল বলে আমি প্রাণপণে বিভিন্ন শাস্ত্র আয়ত্ত করতে সচেষ্ট ছিলাম। ওইভাবে চললে পরবর্তীকালে আমি পিতার আশা পূর্ণ করতাম, অথবা মাতার সন্তোষবিধানে সমর্থ হতাম বলা কঠিন, কিন্তু অকস্মাৎ এক দুর্ঘটনার ফলে আমরা জীবনের গতি পরিবর্তিত হল। মাত্র তিনদিনের জ্বরে আমার পিতৃদেব দেহত্যাগ করলেন। শিশুপুত্রকে নিয়ে আমার জননী অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়লেন। আশ্রয়গ্রহণ করা যায় এমন কোনো আত্মীয়স্বজন নিকটে ছিল না। আমার মাতুলালয় ছিল কৌশাম্বী রাজ্যে। তাদের সঙ্গে আমার পিতার সদ্ভাব না থাকায় মাতার সঙ্গেও তাঁর ভ্রাতা বা পিতা-মাতার যোগযোগ ছিল না। তথাপি নিরুপায় হয়েই আমাকে নিয়ে মাতা দূর কৌশাম্বী রাজ্যে মাতুলালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে মনস্থ করলেন। সেইসময় গ্রামের শ্রেষ্ঠী গণপৎ মাকে নিষেধ করে জানালেন, পিতার অবর্তমানে তিনিই আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। শ্ৰেষ্ঠী একসময়ে পিতার ছাত্র ছিলেন– গুরুপত্নী ও নাবালক গুরুপুত্রের যাবতীয় দায়দায়িত্ব তিনি স্বহস্তে গ্রহণ করলেন। পূর্বেই বলেছি আমার মাতা বিদুষী ছিলেন। পিতার অবর্তমানে মাতা স্বয়ং আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে প্রবৃত্ত হলেন। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম অতি অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষা সম্পূর্ণ করে রাজসভায় কার্যগ্রহণ করে মাতার দুঃখ দূর করব। কিন্তু বিধি প্রতিকুল— পিতৃবিয়োগের এক বৎসর পরেই অকস্মাৎ দারুণ বিসুচিকা রোগে আক্রান্ত হয়ে আমার জননী মৃত্যুবরণ করলেন। মাত্র দ্বাদশ বৎসর বয়সেই আমি পিতৃমাতৃহারা অনাথ বালকে পরিণত হলাম। গণপৎ নামে যে-শ্ৰেষ্ঠী আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তিনি আমাকে নানাভাবে প্রবোধ দিয়ে বললেন কর্তব্যে অবহেলা অনুচিত, অতএব আমি যেন বিদ্যাভ্যাসে বিরত না হই। আমি শোক সংবরণ করে পুনরায় অধ্যয়নে আত্মনিয়োগ করতে সচেষ্ট হলাম। নিকটবর্তী এক গ্রামের জনৈক আচার্য আমার প্রতি সহানুভূতি-পরবশ হয়ে আমাকে অধ্যয়নে সাহায্য করতে সম্মত হলেন। কিন্তু ভাগ্য যার প্রতিকূল তার পক্ষে নিশ্চিত জীবনযাপন সম্ভব নয়। হঠাৎ এক রাত্রে বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মতো শ্ৰেষ্ঠী গণপতের প্রাসাদে হানা দিল একদল দস্যু। বেতনভোগী প্রহরীদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে দস্যুদলের অভিযান সম্পূর্ণ সফল হল না, কিন্তু কিছু মূল্যবান রত্নালঙ্কার ও স্বর্ণ লণ্ঠন করে তারা পলায়ন করতে সমর্থ হল। সেই যুদ্ধে দুটি দস্য নিহত হয়েছিল। আমাদের পক্ষেও হতাহত হয়েছিল কয়েকজন প্রহরী। মঘবা নামে অষ্টাদশ বর্ষীয় কিশোর-প্রহরী সেই যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করে সকলকে চমৎকৃত করে দিয়েছিল। শ্ৰেষ্ঠী পত্নী সর্বসমক্ষেই বললেন, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের কি সার্থকতা আছে? গৃহকর্তার সর্বনাশ উপস্থিত হলেও যে-ব্যক্তি নিশ্চেষ্ট থাকে, তাকে গৃহ হতে দূর করে দেওয়াই কর্তব্য।
স্পষ্টভাবে আমার নাম উল্লেখ না করলেও সকলেই বুঝল আমাকে কটাক্ষ করেই শ্রেষ্ঠীপত্নী ওইকথা বলেছেন।
বিশেষত কিশোর মঘবা যখন আমার দিকে দৃষ্টিপাত করে সহাস্যে দন্তবিকাশ করল, তখন অতিশয় অপমানিত বোধ করলাম। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম শাস্ত্রের চাইতে শস্ত্রের ক্ষমতা অনেক বেশি। গৃহের দাসদাসী, গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ প্রভৃতি সকলেই মঘবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি বলে অনেকেই আমার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করল। শ্রেষ্ঠী অবশ্য আমাকে কিছু বলেননি, কিন্তু মঘবাকে তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা জানালেন এবং আমার প্রতি কটাক্ষ করে শ্রেষ্ঠীপত্নীর মন্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করলেন না।
পরের দিন প্রভাতেই আমি গৃহত্যাগ করলাম। কি করব, কোথায় যাব কিছুই স্থির করিনি— লোকালয় ছেড়ে বনপথে ভ্রমণ করতে করতে ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর হয়ে একসময়ে তৃণশয্যায় লুণ্ঠিত হয়ে পড়লাম। ক্রমশ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। বনে হিংস্র জন্তুর ভয় আছে মনে করে স্থির করলাম একটি বৃক্ষে আরোহণ করে রাত্রি যাপন করব। কিন্তু মনের ইচ্ছা কার্যে পরিণত করার আগেই সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের ন্যায় আমার সম্মুখে আবির্ভূত হল এক প্রকাণ্ড ব্যাঘ্র! আমি সভয়ে ইষ্টনাম জপ করতে শুরু করলাম। ব্যাঘ্র আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করল। অকস্মাৎ মনুষ্যকণ্ঠের এক তীব্র চিৎকার আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করল। তাকিয়ে দেখলাম এক দীর্ঘকায় অসিধারী পুরুষ বনপথের উপর দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে। হিংস্র শাপদ তৎক্ষণাৎ আমাকে ছেড়ে অসিধারী পুরুষের দিকে ঘুরে দাঁড়াল এবং ভীষণ গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তরবারির প্রচণ্ড আঘাতে তার গ্রীবা থেকে ছিটকে পড়ল তপ্ত রক্তের ধারা। মরণাহত পশু দারুণ আক্রোশে আবার ঝাঁপ দিল শত্রুর দিকে। আবার ব্যর্থ হল নখদন্তের নিশানা, কিন্তু শাণিত তরবার পুনরায় শ্বাপদের রক্তপান করল। উপর্যুপরি কয়েকবার আঘাতের পর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নরখাদকের মৃতদেহ। আমি সবিস্ময়ে দেখলাম অসিধারী পুরুষের অসি পর পর তিনবারই অব্যর্থ সন্ধানে স্কন্ধের দুইপাশে আঘাত করে ব্যাঘের মুণ্ডকে প্রায় দেহচ্যুত করে দিয়েছে।
