একটু থেমে উত্তেজিত কণ্ঠকে সংযত করে কর্ণদেব আবার বলতে লাগল, নিরাপত্তার প্রশ্নে তুমি উত্তেজিত হলে কেন? আমি তোমার কাছ থেকে আক্রমণের আশঙ্কা করিনি, তবে অবাঞ্ছনীয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম বটে। প্রকৃতপক্ষে আমি বলতে চেয়েছিলাম আমার গোপন কথা তোমাকে জানানোর পর কোনো কারণে যদি তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট হও, তাহলে ওই গোপন কথা কি গোপনই থাকবে? যদি নিশীথে রাজপথে বিচরণরত প্রহরীদের কাছে তুমি চিৎকার করে আমার পরিচয় ঘোষণা করে দাও, তাহলে আমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি তাই তোমার কাছে আশ্বাস চেয়েছিলাম। আমার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলেও আমার পরিচয় তুমি জনারণ্যে প্রকাশ করবে না; ঘৃণার উদ্রেক হলে বাক্যালাপ বন্ধ করবে, কিন্তু রাজপুরুষের কাছে আমার পরিচয় দিয়ে আমাকে বিপন্ন করবে না এইটুকু আশ্বাস, এইটুকু অঙ্গীকার আমি শুনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সব কথা খুলে বলার আগেই তুমি আমাকে গৃহ হতে বহিষ্কার করতে উদ্যত হয়েছ।
বল্লভ নির্বাক। তার দৃষ্টি কক্ষতলে নিবদ্ধ। কর্ণদেবের কণ্ঠ আবার নিস্তব্ধ কক্ষে প্রতিধ্বনিত হল, আমি অস্ত্রত্যাগ করেছি। তোমার মতো মহাবলিষ্ঠ পুরুষের কাছে নিরস্ত্র অবস্থায় আমি নিতান্ত অসহায়। কিন্তু বেত্রাহত কুকুরের ন্যায় তোমার গৃহত্যাগ করতে রাজি নই, তোমার যা খুশি করতে পারো।
বল্লভ স্খলিত স্বরে বলল, আমি কোপনস্বভাব নই। কিন্তু উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আমি বিচলিত। আর তুমিও ভালোভাবে তোমার কথা বলতে পারোনি। যাই হোক, আমার দুর্ব্যবহারের জন্য আমি লজ্জিত। আশা করি আমার মানসিক অবস্থার কথা ভেবে আমায় ক্ষমা করবে।
কর্ণদেব কথা বলল না। তার মুখের কঠিন রেখাগুলো মিলিয়ে যেতে লাগল। সে আবার পালঙ্কের উপর উপবেশন করল।
বল্লভ কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলল, কর্ণদেব তুমি আমার কাছে কোনো প্রস্তাব করবে কি করবে না সেটা তোমার বিবেচ্য। কিন্তু আমি ভাবছি তোমার মতো সুদর্শন কিশোরের এমনকী গোপন কথা, এমনকী গোপন পরিচয় থাকতে পারে যে কথা রাজপুরুষের কানে এলে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে?
কর্ণদেব নীরব। কেবল তার ওষ্ঠাধরে অনুপস্থিত হাসির রেখা আবার ফিরে আসার উপক্রম করল!
বল্লভ বলল, যাই হোক, আমি শপথ করে বলছি তোমার গোপন কথা আমার গোচরে এলে সেই কথা কোনোক্রমেই তৃতীয় ব্যক্তির শ্রুতিগোচর হবে না।
-এইটুকুই শুনতে চেয়েছিলাম। এবার আমি নিশ্চিন্ত হলাম… আচ্ছা! যে প্রস্তাব করার জন্য আমি উগ্রীব আর যে প্রস্তাব শোনার জন্য তুমি উৎকণ্ঠিত– এখন সেই প্রস্তাব তোমার সম্মুখে উপস্থিত করছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জানতে পারব মৃত্যুভয়াল এক বন্ধুর পথে আমরা পরস্পরের বন্ধু হব না, চিরকালের মতো বিচ্ছিন্ন হব।.. হ্যাঁ, আমার বক্তব্য শুনলেই তুমি বুঝবে আমার প্রস্তাবে সম্মতি না দিলে আমাদের বিচ্ছেদ অনিবার্য। এমনকী, সুদূর ভবিষ্যতে আমাদের সাক্ষাৎকার ঘটলে আমরা পরস্পরের সঙ্গে অপরিচিতের মতো ব্যবহার করব।
কর্ণদেব! বল্লভ বলল, তোমার প্রস্তাবে যদি সম্মত না হই, তাহলে আমরা পরিচয় অস্বীকার করব কেন?
–কারণ, আমার প্রস্তাবে অসম্মত হলে বুঝতে হবে আমাকে তুমি ঘৃণা করছ।
–তবে তোমার প্রস্তাব ঘৃণ্য?
–না। কিন্তু এই প্রস্তাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। সেই পরিচয় ব্যক্তিবিশেষের কাছে ঘৃণ্য বলে পরিগণিত হতে পারে।
কর্ণদেব! মানুষের মুখ দর্পণের মতো। তোমার মুখশ্রী সুন্দর; বাচনভঙ্গি মার্জিত; তোমার কার্যকলাপ উচ্চবংশজাত আর্যযোদ্ধার পরিচয় বহন করছে। কোনো ভদ্ৰব্যক্তির পক্ষে তোমাকে ঘৃণা করার সঙ্গত কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয় না।
-যদি বলি আমি এক দুস্যুর অনুচর? তাহলেও কি তুমি আমাকে ঘৃণা করবে না?
-তুমি দস্যুর অনুচর? … অসম্ভব! তোমার মুখ চোখ, তোমার ব্যবহার উচ্চবংশজাত আর্যপুরুষের পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছে…
– বল্লভ! আমিও তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি উচ্চবংশজাত কোনো আর্যপুরুষের পক্ষে দস্যু পরন্তপের দলে যোগ দিতে বাধা নেই।
–দস্যু পরন্তপ!
–হ্যাঁ। আমি পরন্তপের বিশেষ স্নেহের পাত্র। সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত অনুচর!
১০. কর্ণদেবের কাহিনি
অনেকক্ষণ পরে স্তব্ধতা ভাঙল বল্লভ, কুসীদজীবী উত্তানপাদের হঠাৎ সুমতি হওয়ার কারণটা এতক্ষণে বুঝালাম।
কর্ণদেব নীরব।
বল্লভ আবার বলল, কিন্তু তোমার সত্য পরিচয় উত্তানপাদকে জানিয়ে ভালো করনি। রাজপুরুষের কাছে সে যদি সব কথা বলে দেয় তবে তুমি বিপদে পড়বে। কর্ণদেব! আজ রাত্রেই যদি সে কভবর্মার কাছে গিয়ে তোমার সত্য পরিচয় জানিয়ে দেয়, তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ষীদল এসে তোমাকে বন্দি করবে।
কর্ণদেব হাসল, বল্লভ! পরন্তপের ন্যায় দুর্দান্ত দস্যুর সঙ্গে যে ব্যক্তি দিনের পর দিন অতিবাহিত করে তার প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছে, তাকে নির্বোধ ভাবা উচিত নয়। মনুষ্যচরিত্রে আমার অভিজ্ঞতা আছে। উত্তানপাদ আমার নামে অভিযোগ করতে সাহস পাবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করলে পরন্তপের প্রতিহিংসা থেকে রাজশক্তি যে তাকে রক্ষা করতে পারবে না, সেকথা আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি। তাছাড়া আপনার গৃহে আমি যে রাত্রিযাপন করছি সেই সংবাদও তার জানা নেই। অতএব উত্তানপাদ সম্পর্কে আপনার ভীতি অমূলক।
