কর্ণদেব বলল, ন্যায়-অন্যায় নিতান্তই আপেক্ষিক শব্দ। একের কাছে যা ন্যায়, অপরের কাছে তা অন্যায় বলে বিবেচিত হতে পারে।
বল্লভ অধীর স্বরে বলল, আমি অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে আছি। এই মুহূর্তে তোমার তত্ত্বকথা আমি শুনতে চাই না, শুনতে চাই প্রস্তাব।
বল্লভের মুখের উপর কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল কিশোরের তীব্র দৃষ্টি, তারপর সে ধীরে ধীরে বলল, আমিও আমার স্বার্থচিন্তা করে অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছি। আপনার ইচ্ছা অনিচ্ছা বা বিবেচনার উপর একাধিক মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কিন্তু আমি ভাবছি কথাটা কিভাবে বলব–।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে কর্ণদেব শুস্বরে বলল, বল্লভ! অনিশ্চিত অবস্থায় আর কালক্ষেপ করা যায় না। তবে আপনাকে আমার প্রস্তাব জানানোর আগে আর একটা কথা বলতে চাই।
-বলো।
–একটু আগেই আপনার গৃহে আমার নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। আপনি হয়তো ভেবেছিলেন আমার কাছে মূল্যবান রত্ন ও প্রচুর অর্থ আছে, তাই তস্কর বা দস্যুর আকস্মিক আক্রমণের সম্ভাবনা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আপনি নিতান্ত লঘুভাবেই জানিয়েছিলেন, বল্লভের গৃহে তার অতিথি সর্বদাই নিরাপদ। কিন্তু আমি বহিরাগত দস্যু তস্করের ভয় করিনি। আপনার সান্নিধ্যে আমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে কিনা সেইটাই ছিল আমার প্রশ্ন। প্রশ্নের অর্থ আপনি সম্যক উপলব্ধি করতে পারেননি। আমি বলতে চাই
বাধা দিয়ে বল্লভ ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল, তুমি কি বলতে চাও আমি বুঝতে পেরেছি। আমার সান্নিধ্যে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে কিনা এইটাই যদি তোমার প্রশ্ন হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমার সততা সম্পর্কে তোমার সন্দেহ আছে। নির্বোধ কিশোর। আমার সততায় সন্দিহান হয়ে কোন সাহসে তুমি আমার অতিথি হলে? আমার শক্তির পরিচয় তুমি পেয়েছ। তুমি কি জানো না, ইচ্ছা করলে এক মুষ্ট্যাঘাতে তোমাকে বধ করে আমি তোমার ধনরত্ন লুণ্ঠন করতে পারি?
মুহূর্তের জন্য কর্ণদেবের চোখে-মুখে দেখা দিল আহত বিস্ময়ের চমক, পরক্ষণেই বিস্ময়ের অভিব্যক্তিকে গ্রাস করে উপস্থিত হল ক্রোধের করাল ছায়া
শ্লেষতিক্ত হাসির ফাঁকে জাগল বিদ্রূপশাণিত কণ্ঠস্বর, বল্লভ! বয়স অল্প হলেও মানব-চরিত্রে আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। অর্থের লোভে যে-মানুষ নির্বিকার চিত্তে নির্দোষ ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে, এমন এক বিবেকহীন হন্তারকের ভূমিকায় আপনাকে আমি একবারও কল্পনা করিনি। তবে মানুষের অবচেতন মনের অন্ধকারে যে হিংস্র পশু ঘুমিয়ে থাকে, রাতের অন্ধকারে তার হঠাৎ জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা আছে একথাও আমি অস্বীকার করি না। সেটুকু বিপদের ঝুঁকি আমি নিয়েছি বইকি। আপনি মহাশক্তিরধর বটে, কিন্তু আমিও নিতান্ত নিবীর্য নই। একটু আগেই ব্যাঘ্র ও হস্তীর তুলনামূলক আলোচনা আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই?…হ্যাঁ, হস্তীর পদতলে পিষ্ট ব্যাঘ্রের মৃত্যুবরণের সম্ভাবনা থাকে বটে, কিন্তু ক্ষিপ্রগামী ব্যাঘ্রের নখদন্তে বিদারিতকুম্ভ গজরাজের প্রাণত্যাগের ঘটনাও খুব বিরল নয়।
কর্ণদেবের অঙ্গুলিস্পর্শে কটিবন্ধের তরবারিতে জাগল মৃদু ঝনকার শব্দ!
তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়াল বল্লভ! প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্যামুক্ত তীরের মতো দণ্ডায়মান হল কর্ণদেব!
বল্লভের দুই চক্ষু দারুণ ক্রোধে জ্বলন্ত এবং দুই হস্ত মুষ্টিবদ্ধ!
কর্ণদেবের অধরে ক্লিষ্ট হাসির রেখা হাত কটিবন্ধের অস্ত্রে সংলগ্ন নয়, কিন্তু ডান হাতের পাঁচটি আঙুল বাজপাখির ছোঁ মামার ভঙ্গিতে স্থির হয়ে আছে তরবারির হাতল থেকে একটু দূরে!
বল্লভ সেদিকে দৃকপাত করল না, ক্রুদ্ধস্বরে গর্জন করে বলল, অতিথিকে আমাদের বংশে কেউ কোনোদিন অপমান করেনি, কিন্তু তোমার উপস্থিতি আমি সহ্য করতে পারছি না। অনুগ্রহ করে এই মুহূর্তে তুমি আমার গৃহত্যাগ করো। নচেৎ–
দারুণ ক্রোধে তার কণ্ঠরুদ্ধ হল।
কিছুক্ষণ বিমূঢ় অবস্থায় রইল কর্ণদেব, তার ওষ্ঠাধরে ক্লিষ্ট হাসির ক্ষীণ রেখাঁটি হঠাৎ উদার হাস্যে প্রশস্ত হল, পরক্ষণেই সে প্রচণ্ড অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল, আমি যাব না। সাধ্য থাকে, বলপ্রয়োগ করে অতিথিকে গৃহ থেকে দূর করে দাও।
ক্ষিপ্রহস্তে সে খুলে ফেলল কোমরের চর্মবন্ধনী- মণিকুট্টিমের উপর নিক্ষিপ্ত হল কটিবন্ধসমেত কোষবদ্ধ ছুরিকা ও তরবারি! পাষাণ ও ইস্পাতের সংঘাতে জাগল তীব্র ঝঞ্জনা-ধ্বনি!
বল্লভ হতবুদ্ধি হয়ে গেল! এমন অদ্ভুত আচরণ তার কল্পনাতীত!
দুই বাহু বক্ষে আবদ্ধ করে কর্ণদেব গর্বিত স্বরে বলল, তোমার সততা সম্পর্কে আমি সন্দেহ প্রকাশ করিনি। কিন্তু আমার বক্তব্য পরিষ্কার করে বলার সুযোগও তুমি আমাকে দাওনি। অর্ধসমাপ্ত বাক্যের বিকৃত ব্যাখ্যা করে তুমি আমাকে অপমান করেছ। দাম্ভিক মল্ল! শক্তির দম্ভে আত্মহারা হয়ে তুমি অসিযোদ্ধার মর্যাদায় আঘাত করেছিলে– তাই তোমাকে বুঝিয়ে দিলাম তরবারির সঙ্গে যে-মানুষ বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে, সে কখনো ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক শক্তির কথা ভেবে ভীত হয় না। ব্যাঘ্রের নখদন্ত যেমন তার ইচ্ছায় পরিচার্লিত হয়ে তার চেয়ে বহুগুণ বলশালী গজরাজের দেহ বিদীর্ণ করতে পারে নিপুণ অসিচালকের অসিও তেমনই আজ্ঞাবাহী সহচরের ন্যায় চালকের ইচ্ছানুযায়ী চার্লিত হয়ে মহাবলবান শত্রুকে ছিন্নভিন্ন করতে পারে।
