–আপনি কি মল্লযোদ্ধা?
–বাল্যকাল থেকেই আমি মল্লযুদ্ধের প্রতি আসক্ত। শক্তিচর্চার সঙ্গে বিদ্যাভ্যাসও করেছি নিয়মিত, তাই পিতা আমাকে শক্তিচর্চায় বাধা দেননি। আমি বলিষ্ঠ দেহ নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলাম। তার উপর ধনী পিতার অর্থে যাবতীয় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন মল্লবীরের আখড়ায় মৃত্তিকা মর্দন করে কয়েক বৎসরের মধ্যেই অমানুষিক শক্তির অধিকারী হলাম। পরে অবস্থা যখন মন্দ হল, তখন মল্লবিদ্যার সাহায্যেই গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ শুরু করলাম।
ও! আপনি এখন পেশাদার মল্লযোদ্ধা? অর্থের বিনিময়ে মল্লযুদ্ধের শিক্ষা দিয়ে থাকেন?
–না, না। আমি উচ্চবংশের সন্তান হয়ে মল্লযুদ্ধের মাটি থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারি। তাছাড়া ওইভাবে অর্থ উপার্জনে গুরুরও নিষেধ ছিল। আমি কয়েকটি বিশিষ্ট শিষ্যকে মল্লযুদ্ধ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে থাকি। শিষ্যরা আমাকে গুরুদক্ষিণাস্বরূপ তণ্ডুল, গোধুম, দুগ্ধ, মাংস প্রভৃতি সরবরাহ করে। শিষ্যদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আছে। কৃষিজীবী কৃষক, দুগ্ধ ব্যবসায়ী গোপ এবং মাংস ব্যবসায়ী ব্যাধ প্রভৃতি সকল শ্রেণির মানুষই আমার শিষ্যদের মধ্যে বর্তমান।
বল্লভ মুহূর্তের জন্য থামল, তারপর বিমর্ষভাবে বলল, না, ভুল বললাম। সকল শ্রেণির মানুষ আমার শিষ্য-সমাজে নেই। আজ পর্যন্ত কোনো ধীবর আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আসেনি। অথচ মৎস্য আমার অতিশয় প্রিয় খাদ্য। বললে বিশ্বাস করবে না বৎসরাধিকাল আমি মৎস্য থেকে বঞ্চিত। মৎস্যের স্বাদও বুঝি ভুলে গেছি।
কর্ণদেব গম্ভীর স্বরে বলল, আমার প্রস্তাবে সম্মত হলে আপনি প্রত্যহ প্রচুর পরিমাণে মৎস্য ভক্ষণ করতে পারবেন। মৎস্যের জন্য ধীবর শিষ্যের প্রয়োজন হয় না, নগদ অর্থের বিনিময়ে ধীবর পল্লির সর্বোৎকৃষ্ট মৎস্য আপনার রসনার তৃপ্তিসাধন করবে। কাল প্রভাতে আপনি ঋণমুক্ত হচ্ছেন, অতএব সে বিষয়েও আপনার দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই।
দুশ্চিন্তার অবকাশ অবশ্যই আছে, বল্লভ দৃঢ়স্বরে বলল, আমি কারও অনুগ্রহের দান গ্রহণ করিনি, করব না। এই বসতবাটি থেকে যদি ঋণের দায়ে বিতাড়িত হই, তাহলেও বিপুলা এই ধরণীতে আশ্রয়ের অভাব আমার হবে না। মল্লযুদ্ধের কল্যাণে অন্নজলের জন্য আমার দুর্ভাবনা নেই। কোনো কারণে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে বন থেকে আমি কুঠারের সাহায্যে কাষ্ঠ সংগ্রহ করি। আমি সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান, তাই বিপণিতে দাঁড়িয়ে সংগৃহীত কাষ্ঠ জনসমক্ষে বিক্রয় করতে পারি না। কাঠুরিয়াদের কাছে অপেক্ষাকৃত সুলভ মূল্যে ওই কাষ্ঠ বিক্রয় করে আমি প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করি। অতএব বুঝতেই পারছ গৃহহারা হওয়ার ভয়ে আমি ভীত নই। যে গৃহে আমার পিতা-মাতা দেহরক্ষা করেছেন, যে গৃহের সঙ্গে আমার স্নেহময়ী ভগ্নীর স্মৃতি জড়িত সেই গৃহ হস্তান্তরিত হয়ে অপরের বাসস্থান হবে এই চিন্তাই আমাকে কিঞ্চিৎ বিচলিত করে তুলেছে।
কর্ণদেব বলল, বিচলিত হলেই বা উপায় কি? যতদুর মনে হয় তিনসহস্র তো দূরের কথা তিনশত স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করাও আপনার সাধ্যাতীত। না হলে, ঋণশোধ করে বসতবাটী রক্ষার চেষ্টা কি আপনি করতেন না?
–চেষ্টা করেছি বৈকি। প্রায় সফলও হয়েছিলাম। কিন্তু বিধি বাম, কি করব বল?
কর্ণদেব কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার ওষ্ঠাধরে যে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের হাসিটি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল সেটি বল্লভের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারল না।
বল্লভ উত্তেজিত স্বরে বলল, তুমি ভাবছ আমি মিথ্যা বাগাড়ম্বর করছি। তাই না?… না, না, প্রতিবাদ করে লাভ নেই। কর্ণদেব! আমাকে নিতান্ত নির্বোধ ভাবলে তুমি ভুল করবে। আমি নিশ্চেষ্ট পুরুষ নই। ঋণশোধের জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম।
কর্ণদেব বিনীত স্বরে বলল, মার্জনা করবেন। স্বীকার করছি আপনার কথা আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার বোঝা উচিত ছিল আপনার মত মানুষ মিথ্যা বাগাড়ম্বর বিস্তার করে না।
বল্লভ বলল, তবে শোনো, তোমাকে দুঃখের কাহিনি বলি। আমার পরিচিত জনৈক কাষ্ঠব্যবসায়ী আমাকে জানিয়েছে আগামী পক্ষকালের মধ্যেই মহারাজ রুদ্রদমনের এক মিত্ররাজ্যে কয়েকটি দুর্গকে দুর্ভেদ্য ও অলঙ্কৃত করার জন্য শ্রাবন্তী থেকে দুর্মূল্য প্রস্তর ও কাষ্ট প্রচুর পরিমাণে উক্ত রাজ্যে প্রেরিত হবে। ওই ব্যবসায়ী আমাকে আশ্বাসদান করে বলেছে, রাজদরবার যদি তাকে কাষ্ঠ সরবরাহের ভার দেয়, তাহলে প্রচুর পরিমাণে শাল সেগুন প্রভৃতি বৃক্ষের কাষ্ঠ সে আমার কাছেই ক্রয় করতে রাজি আছে। কিছু কিছু উৎকৃষ্ট কাষ্ঠ এর মধ্যেই আমি ওই ব্যবসায়ীকে দিচ্ছিলাম এবং মূল্য তার কাছেই জমা রাখছিলাম। তিনসহস্র স্বর্ণমুদ্রা অবশ্য সংগ্রহ করতে অনেক বিলম্ব ছিল। কারণ, দুর্গ বা প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণের উদ্যোগ খুব কমই হয়। আর ওই ধরনের বৃহৎ কার্য না হলে আমার পক্ষে কাষ্ঠ সংগ্রহ করে এককালীন অধিক অর্থের সংস্থান করা অসম্ভব। হঠাৎ মিত্ররাজ্যে কাষ্ঠ সরবরাহের সংবাদ শুনে উৎফুল্ল হয়েছিলাম। আশা ছিল ওই সরবরাহকার্যে যে অর্থ পাব, তার সঙ্গে পূর্বে অর্জিত অর্থ একত্র করে হয়তো আমি ঋণমুক্ত হতে পারব। কিন্তু দুরাত্মা উত্তানপাদ আমাকে সেটুকু সময় দিতে সম্মত হল না। কর্ণদেব! বুঝতেই পারছ, আমি নিতান্ত নিশ্চেষ্ট নই, অক্ষমও নই– ভাগ্যের পরিহাসে আজ সর্বস্ব হারাতে বসেছি। তবে দুর্নীতি অবলম্বন করে আমি বসতবাটী মুক্ত করতে চাই না। তোমার প্রস্তাবে যেন অন্যায়ের গন্ধ আছে বলে মনে হয়। সুতরাং দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই বললেই আমি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হব না। যদি তোমার প্রস্তাব ন্যায়সঙ্গত হয় তাহলে আমি নিশ্চয়ই সানন্দে সম্মত হব। আর যদি প্রস্তাব অসঙ্গত মনে করি, তাহলে তোমার কাছ থেকে তিনশত স্বর্ণমুদ্রা দূরের কথা এক কপর্দকও গ্রহণ করব না। তাতে যদি আমার গৃহ হস্তান্তরিত হয়, তবে তাই হোক। আমি চিরকাল ন্যায়পথে থেকেছি, থাকব। এখন বলো কর্ণদেব– কি তোমার প্রস্তাব?
