বল্লভ একবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল অতিথির মুখের দিকে। কম্পিত দীপশিখা আর নক্ষত্রের আলোতে সেই মুখ রহস্যময়। মুখ দেখে মুখের অধিকারীর মনোভাব অনুমান করা দুঃসাধ্য। কেবল মাঝে মাঝে ম্লান দীপালোকে মসৃণ ললাটপটে কুঞ্জনরেখার ক্ষণিক আবির্ভাব এবং ওষ্ঠাধরের মৃদু কম্পনে বোঝা যায় অতিথির দেহ স্থির থাকলেও মন অস্থির হয়ে বিচরণ করছে চিন্তার জগতে।
অকস্মাৎ স্তব্ধতা ভঙ্গ করল কর্ণদেব, আপনি আমার পরিচয় জানতে উৎসুক। আমিও পরিচয় দিতে চাই এবং আপনার সম্পূর্ণ পরিচয় পেতে চাই। তবে একটা কথা–
—বলো।
আমি কি আপনার গৃহে নিরাপদ?
-অবশ্যই। বল্লভের গৃহে তার অতিথি সর্বদাই নিরাপদ। হঠাৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন তোমার মনে এল কেন জানি না। যাই হোক, আমার মনেও কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে। ধীর ভাবে আমার কথা শুনে উত্তর দাও।
–বলুন।
-একটু আগেই তুমি উত্তানপাদকে বলেছ আগামী কাল প্রত্যূষেই আমি নাকি তিনশত স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে তার গৃহে উপস্থিত হচ্ছি এবং উক্ত অর্থের বিনিময়ে ফিরিয়ে আনছি বন্ধকি ভদ্রাসনের চুক্তিপত্র। বলাই বাহুল্য, আমরা দুজনেই ধরে নিয়েছি ওই অর্থ দিচ্ছ তুমি। আমি তোমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিনি, কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছি নিঃস্বার্থ ভাবে এত অর্থ কেউ অপরিচিত ব্যক্তিকে দান করে না। আমার কাছে তোমার কৃতজ্ঞ থাকার কিছু কারণ অবশ্য ঘটেছে। তবু বলব, তিনশত স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার স্বপক্ষে কারণটা যথেষ্ট নয়। ওই অর্থের বিনিময়ে তুমি আমার কাছে কিছু চাও। কিন্তু আমার মতো দরিদ্রের কাছে তুমি কি চাইতে পারো?… আচ্ছা, এবার তাহলে কার্যকারণ বিশ্লেষণ করা যাক– কোনো অজ্ঞাত কারণে জয়দ্রথের সঙ্গে তুমি ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিলে, পরে আমার দৈহিক শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে জয়দ্রথের সাহচর্য ত্যাগ করে তুমি আমার নিকটে এসে আমার বন্ধুত্ব অর্জনের চেষ্টা করছ। দৈহিক শক্তি ছাড়া জয়দ্রথের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই এবং পূর্বোক্ত মল্লযোদ্ধার চাইতে অধিকতর শক্তিমান বলেই আমি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি! অতএব অনুমান করছি এমন কোনো কঠিন কার্যসাধন করার জন্য তুমি আমার সাহায্য চাও, যে কাজে সাফল্য অর্জন করতে হলে অসামান্য দৈহিক শক্তির প্রয়োজন। আশা করি আমার বিশ্লেষণ ও অনুমান ভুল হয়নি?
সঠিক বিশ্লেষণ! নির্ভুল অনুমান!
-কিন্তু তোমার কার্য সাধনে আমি অসমর্থ হলে বা অনিচ্ছা প্রকাশ করলে নিশ্চয়ই ওই তিনশত স্বর্ণমুদ্রা তুমি আমাকে দিতে রাজি হবে না?
এইবার আপনার ভুল হল। প্রতিশ্রুত তিনশত স্বর্ণমদ্রার সঙ্গে আমার প্রস্তাবের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি উত্তানপাদকে কথা দিয়েছি। প্রতিশ্রুত অর্থ আপনার হাত থেকে কাল প্রভাতেই সে পাবে!
বল্লভের গলার ভিতর থেকে ঘুষ্কার-ধ্বনির ন্যায় অস্ফুট শব্দ নির্গত হল। সে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু অক্ষম বাগযন্ত্রে কোনো বাক্য উচ্চারিত হল না।
কর্ণদেব হাসল, আপনি বিস্মিত হয়েছেন। হওয়াই স্বাভাবিক। ব্যবসাতে অর্থ লগ্নি করার নিয়ম আছে। মনে করুন, এই তিনশত স্বর্ণমুদ্রা আমি লগ্নি করছি। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে অসম্মত হন তাহলে জানব ব্যবসাতে নেমে তিনশত স্বর্ণমুদ্রা আমি হারিয়েছি। ব্যবসাতে লাভ-ক্ষতি আছে, এইটুকু ক্ষতি আমি অনায়াসে সহ্য করতে পারব। আর যদি আমার প্রস্তাবে সম্মতি দেন, তাহলে আমরা যা লাভ করব, সেই লাভের অঙ্ক আপনার কল্পনাতীত।
বল্লভের ভ্রূ কুঞ্চিত হল, আমরা? অর্থাৎ তুমি আর আমি?… অবশ্য কাজটা যদি অন্যায় না হয়, তাহলে দুঃসাধ্য হলেও আমি তা করতে রাজি আছি। বলো– কাজটা কি?
বলব বলেই তো আজ রাত্রে আপনার গৃহে অতিথি হয়েছি। তবে তার আগে আপনার বিষয় আপনার মুখ থেকেই কয়েকটা কথা জানতে চাই। আপনার পূর্ব-ইতিহাস বা দুর্দৈব সম্পর্কে আমি এখন অবহিত, কিন্তু বর্তমান সম্পর্কে বিশেষ সচেতন নই। বিশেষত আপনার চালচলনও কিয়ৎ পরিমাণে রহস্যময়, সে বিষয়ে
বাধা দিয়ে বল্লভ বলে উঠল, আমার চালচলন রহস্যময়? কি বলছ তুমি?
-ঠিকই বলছি। আপনি সন্ন্যাসী নন, অথচ গৈরিকধারণ করেছেন এবং সন্ন্যাসী শ্রেণির ন্যায় মুস্তক মুণ্ডন করেছেন কিন্তু কেন? রাজপথে দাঁড়িয়ে লোকমুখে শুনলাম আপনার কিছু শিষ্য আছে। কুসীদজীবী উত্তানপাদের মুখেও শিষ্যদের প্রসঙ্গ শুনেছি। গৈরিকধারী গৃহীর কাছে ওই শিষ্যরা কোন ধর্মচারণের দীক্ষা গ্রহণ করতে আসে?
সশব্দ হাস্যে ফেটে পড়ল বল্লভ, হো! হো! হো! এই কথা!… হা! হা!… গৈরিকধারণের সঙ্গে সন্ন্যাস গ্রহণের সম্পর্ক থাকতেই হবে এমন কথা তোমাকে শিখিয়েছে কোন বলীর্বদ?.. আরে, শ্বেতবস্ত্র অতি শীঘ্রই মলিন হয়ে দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে, তাই ঘন ঘন বস্ত্র ধৌত করার প্রয়োজন হয়। অনর্থক পরিশ্রম আমি পছন্দ করি না, রজকের শরণাপন্ন হলেও অর্থব্যয় অনিবার্য অতএব শ্বেতবস্ত্রের পরিবর্তে আমি গৈরিকধারণ করেছি। লাল, নীল, সবুজ প্রভৃতি রংও সহজে মলিন হয় না। কিন্তু ওইসব রং তরলমতি তরুণ-তরুণীরা পছন্দ করে বলে উজ্জ্বল বর্ণ বর্জন করে আমি গেরুয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছি। এতে রহস্যের কি আছে বাপু?… আর শিষ্যদের কথা জিজ্ঞাসা করছ? হ্যাঁ, আমার কিছু শিষ্য আছে বটে। তারা আমার কাছে ধর্মাচরণের দীক্ষা নিতে আসে না;- আসে, মল্লযুদ্ধ শিক্ষা করতে। মল্লযুদ্ধে সুবিধা হয় বলেই আমি মস্তক মুণ্ডন করেছি। মল্লবীরদের মধ্যে কোনো কোনো ব্যক্তি যে মস্তক মুণ্ডন করে থাকে, সে কথা নিশ্চয়ই তোমার অজ্ঞাত নয়?
