কক্ষের মধ্যস্থলে অবস্থিত দীপাধারে রক্ষিত দীপে অগ্নিসংযোগ করে বিশাল অট্টালিকার গর্ভে হারিয়ে গেল বল্লভ। দ্বারের বাইরে চর্মপাদুকা রেখে বল্লভের পরামর্শ অনুসারে প্রক্ষালন-পর্ব শেষ করে কর্ণদেব আশ্রয় গ্রহণ করল পালঙ্কের উপর বিস্তৃত শয্যায়।
প্রচণ্ড দৈহিক পরিশ্রম আর মানসিক উত্তেজনার পর কিছুটা নিশ্চিন্ত বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে তার ক্লান্ত দেহ শয্যার উপর এলিয়ে পড়তে চাইছিল, কিন্তু সে আত্মসংবরণ করল। অতি অল্প বয়সেই বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে কিশোর কর্ণদেব! শ্বাপদের চেয়েও ভয়ংকর দ্বিপদ মানুষের পরিচয় সে পেয়েছে বারংবার। অতএব, শয্যায় শয়ন করার প্রলোভন সংযত করে সে সোজা হয়ে বসে থাকল, এমনকি কটিবন্ধে আবদ্ধ তরবারি ও ছুরিকা রইল যথাস্থানেই। বল্লভকে সে অবিশ্বাস করে নি, কিন্তু অপরিচিত স্থানে দেহ-সংলগ্ন অস্ত্র তার কাছে প্রিয়বন্ধুর সান্নিধ্যের মতোই আশ্বাসজনক- কোনো কারণেই আত্মরক্ষার উপকরণ সে দূরে রাখতে রাজি নয়।
…অকস্মাৎ তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করল শলাকাপক্ক মাংসের লোভনীয় গন্ধ! তৎক্ষণাৎ সে অনুভব করল তার দেহের মধ্যে উদর নামে যে স্থানটি রয়েছে, সেটি একেবারেই শূন্য! এতক্ষণ ক্ষুধাতৃষ্ণার কথা তার মনেই হয় নি, কিন্তু শুল্য মাংসের ঘ্রাণ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে হল উদরের শূন্যতাকে অবিলম্বে কিছু স্থূল বস্তুর সাহায্যে পরিপূর্ণ করার প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। সেই সঙ্গে তার রসনাও হয়ে উঠল রসসিক্ত!…।
কিছুক্ষণ পরেই সহাস্যবদনে দ্বারপথে আবির্ভূত হল বল্লভ। তার দুই হাতে দুটি বৃহৎ স্থালীতে অবস্থান করছে দুটি সুবৃহৎ পাত্র। পাত্র দুটি কক্ষতলে স্থাপন করে বল্লভ বলল, এসো। গৃহে রমণী থাকলে তারা জলসিক্ত বস্ত্র ও সম্মার্জনী সহযোগে এই মণিকুটিম বিশেষ ভাবে পরিষ্কার করে আহার্য পরিবেশন করত কিন্তু আমার গৃহে নারী নেই এবং আমারও বারংবার কক্ষতল পরিষ্কার করার ধৈর্য নেই। দ্বিপ্রহরে গৃহত্যাগ করার পূর্বে এই স্থান আমি জলসিক্ত করে সম্মার্জনী সহযোগে উত্তমরূপে পরিষ্কার করেছি। পুনরায় ওই গৃহকর্মের পুনরাবৃত্তি করতে আমি অনিচ্ছুক। অবশ্য তুমি যদি প্রয়োজন মনে করো–
না, না, কর্ণদেব প্রতিবাদ করল, আমি আদৌ প্রয়োজন বোধ করছি না।… কিন্তু এই কি আপনার সামান্য সামর্থ্যের উদাহরণ?
হে, হে, বল্লভ বিনীত হাস্যে বিগলিত হল, এই যৎসামান্য উপকরণ দিয়েই তোমার দরিদ্র বন্ধু আজ অতিথি সৎকার করতে চাইছে। তুমি অনুগ্রহ করে খাদ্যগ্রহণ করলে আমি কৃতার্থ হব।
কর্ণদেব গম্ভীর স্বরে বলল, এই পর্বত প্রমাণ পিষ্টক, চাপটি আর ওই বৃহৎ পাত্রে অবস্থিত বিপুল পরিমাণ শূল্য মাংস দিয়ে তিন-চারটি বলিষ্ঠ পুরুষের ক্ষুধা-নিবারণ সম্ভব। আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত বটে, তবে ওই স্থালী ও পাত্রের যাবতীয় খাদ্য গ্রহণ করলে উদর বিদীর্ণ হয়ে আমার মৃত্যু সুনিশ্চিত।
বল্লভের মতামতের জন্য অপেক্ষা না করে কর্ণদেব একটি স্থালী ও পাত্র থেকে বেশ কিছু খাদ্য নিয়ে অপর স্থালীতে রাখল, তারপর লঘভার স্থালী ও পাত্র সম্মখে স্থাপন করে বলল, বল্লভ! খাদ্য নিয়ে প্রহসন স্থগিত রাখুন! এমন রাজভোগ্য খাদ্য উপভোগ করার সুযোগ আমার জীবনে কমই হয়েছে। এবার শুরু করুন। সম্মুখে ষোড়শ-উপচারে ভোজ্য রেখে খাদ্য নিয়ে বিতর্ক বাঞ্ছনীয় নয়।
কর্ণদেবের ভোজন-পাত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করে বল্লভ ক্ষুব্ধস্বরে বলল, অসিযুদ্ধকে যারা জীবিকারূপে গ্রহণ করে, তারা স্বল্পভোজী হয় বটে। তবে তোমার বয়সে এত কম খাওয়া ভালো নয়। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে দৈহিক শক্তিরও প্রয়োজন আছে একথা কিশোর অসিযোদ্ধার মনে রাখা উচিত।
কর্ণদেব হাসল, ব্যাঘ্রের পক্ষে হস্তীর সমপরিমাণ আহার্য গলাধঃকরণ করা অসম্ভব। দেহের শক্তিতেও সে হস্তীর সমকক্ষ নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ গতিবেগ ও প্রখর নখদন্তের সহায়তায় সে কখনো কখনো তার চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী হস্তীকেও পরাস্ত করতে সমর্থ হয় একথা কি আপনি জানেন না?
বল্লভ সহাস্যে বলল, তোমার যুক্তি অকাট্য। কিন্তু শলাকাপক্ক মাংস শতীল হলে বিস্বাদ হয়। ভোজনপর্ব শেষ হলে ব্যাঘ্র ও হস্তীর চাইতে অধিকতর প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা আলোচনা করব। এখন বাক্যালাপ স্থগিত রেখে দক্ষিণ হস্তের সদ্ব্যবহার করা যাক কী বলে?
আমি আপনার সঙ্গে একমত। শুন্য উদরে কোনো প্রসঙ্গই ভালো লাগে না।
.
০৯. বিশ্বস্ত অনুচর
দীপাধারে জ্বলছে প্রদীপ। বাতায়ন পথে তারকাখচিত অন্ধকার আকাশে দৃষ্টি প্রসারিত করে পালঙ্কের উপর উপবিষ্ট বল্লভ ও কর্ণদেব সম্পূর্ণ নির্বাক। উচ্ছিষ্ট ভোজনপাত্রগুলি একটু আগেই স্থানান্তরে রেখে এসেছে বল্লভ। তার মনে প্রশ্নের ঝড় কিন্তু আহার্য দ্রব্যে অতিথির তৃপ্তি হয়েছে জেনেই সে নীরব হয়ে গেছে, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করেনি একবারও মনোগত ইচ্ছা- অতিথির দিক থেকেই যেন আলোচনার উত্থাপন হয়।
অপর পক্ষে কর্ণদেবও মৌন। বল্লভের প্রশ্নের উত্তরে সে জানিয়েছে, এমন সুস্বাদু খাদ্য আর এমন আকণ্ঠ ভোজনের অভিজ্ঞতা তার জীবনে খুবই কম- সেই সঙ্গে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতেও ভুল হয়নি কিন্তু তারপরই সে মৌনব্রত ধারণ করেছে।
