এক নিষ্ঠুর জগতের কঠিন পাঠশালায় জীবনের পাঠ নিয়েছে কর্ণদেব মুহূর্তে সে বুঝে নিল কোনো কারণে পরিস্থিতি হঠাৎ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আর সেইজন্যই তার সঙ্গীর এই ভাবান্তর।
চারদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি সঞ্চালন করে কর্ণদেব দেখল একটু দূরে আবছা আলো-আঁধারির মধ্যে দেখা দিয়েছে কয়েকটা মনুষ্যমূর্তি। সন্ধ্যা তখন সবে উত্তীর্ণ, রাত্রি গভীর নয়– এসময়ে পথের উপর পথিকের আবির্ভাব নিতান্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বল্লভের ভাবভঙ্গিতে কর্ণদেব বুঝল অদূরে দৃশ্যমান ওই মানুষগুলোর সান্নিধ্যে সে নিরাপদ মনে করছে না। কর্ণদেব মুখে কোনো কথা বলল না, কিন্তু তার সর্বশরীর ধনুকের ছিলার মতো টান হয়ে গেল, বাঁ হাতের শক্ত মুঠিতে ধরা পড়ল তলোয়ারের খাপ, আর ডানহাতের আঙুলগুলো প্রসারিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে অস্ত্রকে কোষমুক্ত করার জন্য প্রস্তুত হল।
সঙ্গীর দিকে না তাকিয়ে বল্লভ বলল, কর্ণদেব! তোমার তরবারিকে ব্যস্ত করার প্রয়োজন হবে না।
তারপর কয়েক পা এগিয়ে তীব্রস্বরে হাঁক দিল, বন্ধুগণ! তোমরা আড়ালে দাঁড়িয়ে কেন? সামনে এসো। আমি গেরুয়াধারী বল্লভ– তোমাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করার জন্য উৎসুক।
কয়েকটি মুহূর্ত কাটল নিঃশব্দে। তারপরই পথের উপর জাগল ধাবমান পদশব্দ!… পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেল দ্রুতবেগে। কর্ণদেব তাকিয়ে দেখল পথের উপর দণ্ডায়মান মনুষ্য মূর্তিগুলো অন্তর্ধান করেছে।
সে বল্লভের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, কারা যেন দ্রুতবেগে পলায়ন করল। বল্লভ! আপনি ওদের জানেন?
উত্তর এল, জানি। ওরা স্থানীয় দুর্বৃত্ত। অন্ধকারে অসহায় পথিকের সর্বস্ব লুণ্ঠন করে। এদিকটা নির্জন। অন্ধকারে আমাকে চিনতে না পেরে ওরা আক্রমণের উদযোগ করছিল।
কর্ণদেব বলল, এই জাতীয় জীব আমার অপরিচিত নয়। কিন্তু সন্ন্যাসী না হয়েও যিনি গৈরিক ধারণ করেন এবং যার নাম শুনেই স্থানীয় দুর্বৃত্তগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করে আমি তার পরিচয় পেতে চাই।
বল্লভ বলল, ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়েও প্রবীণ ক্ষত্রিয়-যোদ্ধার ন্যায় যে অসি চালনা করে, অতি সাধারণ বেশে সজ্জিত হলেও যার কটিবন্ধে থাকে মহামূল্য বৈদুর্যমণি- সেই রহস্যময় কিশোরকে আমি জানতে চাই।
কিছুক্ষণ নীরবে পথ চলার পর কিশোর মুখ খুলল, বল্লভ! পরস্পরের পরিচয় জানতে আমরা দুজনেই উগ্রীব। কিন্তু পথে দাঁড়িয়ে বোধহয় বাক্যালাপ করা উচিত হবে না। আমার বক্তব্য অতিশয় গোপনীয়।
নিকটেই আমার গৃহ আর সামনে পড়ে আছে দীর্ঘরাত্রি। অতএব গোপনীয় বিষয় নিয়ে নির্জনে বাক্যালাপের বিশেষ অসুবিধা হবে না।… এই যে! এই কুটিরই হচ্ছে অধমের বাসস্থান।
সম্মুখে অবস্থিত প্রাসাদোপম অট্টালিকার দিকে তাকিয়ে কর্ণদেব সবিস্ময়ে বলল, এই অট্টালিকা আপনার বাসস্থান?
বল্লভ বিনীত কণ্ঠে বলল, এই কুটিরই আমার বাসস্থান।
.
০৮. ব্যাঘ্র ও হস্তী
অট্টালিকার দ্বার বাহির থেকে লৌহকীলকে আবদ্ধ ছিল। কাপড়ের ভিতর থেকে বিশেষভাবে নির্মিত একটি সুবৃহৎ লৌহশলাকা নিয়ে বল্লভ দ্বার অনর্গলমুক্ত করল, তারপর প্রবেশ করল ভিতরে।
অট্টালিকার অভ্যন্তরে ঘন অন্ধকারের গর্ভে অদৃশ্য বল্লভের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, কর্ণদেব! ক্ষণেক অপেক্ষা করো। আমি দীপ জ্বালছি।
একটু পরেই জ্বলন্ত মৃৎপ্রদীপ হস্তে দ্বারদেশে আত্মপ্রকাশ করল বল্লভ, কর্ণদেব! অনুগ্রহ করে ভিতরে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করলে সুখী হব। আমার সামর্থ্য অতি সামান্য। অতএব, অতিথি সৎকারের ত্রুটি মার্জনীয়। তবে আমার সাধ্য অনুযায়ী অতিথিকে সমাদর জানাতে চেষ্টা করব এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
কর্ণদেব দ্বারের ভিতর পদক্ষেপ করে হেসে উঠল, এই বিশাল অট্টালিকাকে যিনি কুটির বলে অভিহিত করেন, তার অতিথি সকারের সামান্য প্রয়াস যে অপরের কাছে অসামান্য বলে বিবেচিত হবে সে বিষয়েও আমার সন্দেহ নেই।
–ভিতরে এসো।
প্রদীপ হাতে এগিয়ে চলল বল্লভ। তাকে অনুসরণ করল কর্ণদেব। সঙ্কীর্ণ অলিন্দ এবং ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বহু কক্ষের মধ্যবর্তী পথ ধরে এগিয়ে যেতে যেতে কর্ণদেব বুঝল অতিশয় ধনবান না হলে এমন একটি অট্টালিকার অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। দীপের ম্লান আলোতেও সে বুঝতে পারল অত্যন্ত মূল্যবান প্রস্তর, কাষ্ঠ ও ইস্পাত সহযোগে নির্মিত হয়েছে এই বাসগৃহ। বল্লভের পিতা যে একসময় প্রচুর বিত্তের অধিকারী ছিলেন সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হল কর্ণদেব।
…বেশ কিছুক্ষণ পদচালনা করার পর বল্লভকে অনুসরণ করে কর্ণদেব এসে পড়ল একটি সুবৃহৎ কক্ষের অভ্যন্তরে। আসার পথে গৃহের মধ্যে বহু দুর্মূল্য তৈজসপত্র এবং স্ফটিক খচিত দীপাধার প্রদীপের আলোতে কর্ণদেবের দৃষ্টিগোচর হয়েছে কিন্তু এই ঘরটি সর্বপ্রকার বাহুল্য বর্জিত। ঘরের একপাশে একটি মূল্যবান পালঙ্ক রয়েছে। তবে তার উপর বিস্তৃত বস্ত্রটি খুব পরিষ্কার নয়। ঘরের মাঝখানে দারুনির্মিত দীপাধার। গৃহের অন্যান্য স্থানে প্রদীপের ম্লান আলোতেও ধুলোর আধিক্য কর্ণদেবের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, কিন্তু এই ঘরটি বেশ পরিচ্ছন্ন।
ঘরের সামনে একটি জলপূর্ণ পাত্র ছিল। সেইদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বল্লভ বলল, তুমি হাত-মুখ পরিষ্কার করে নাও, তারপর ওই শয্যায় বিশ্রাম গ্রহণ করো। আমি এখনই আসছি।
